ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২৮তম পর্ব

ভাঙা স্বপ্নের পরেঃ


সব গল্পের শেষ সুখের হয় না।

আবার সব অসমাপ্ত গল্পও ব্যর্থতার গল্প নয়।

কিছু গল্প শেষ হয় মানুষকে নতুন করে বাঁচতে শেখানোর জন্য।

ছেলেটির জীবনও তেমনই একটি গল্প।

এক সময় যে ছেলেটি মানুষের ভিড়ে সবচেয়ে বেশি স্বস্তি খুঁজে পেত,

আজ সে অনেকটাই নীরব।

আগের মতো আর কারও ডাকে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যায় না।

কারও সমস্যা শুনে রাত জেগে পরিকল্পনা করে না।

অনেকেই বলে,

"তুই আগের মতো নেই।"

সে শুধু মুচকি হেসে বলে,

"মানুষ বদলে যায়।"

কিন্তু সে জানে—

সে বদলায়নি।

তাকে বদলে দিয়েছে সময়।

ভালোবাসা।

আর বিশ্বাস ভাঙার যন্ত্রণা।

সে আবার ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করেছিল।

একটি পরিকল্পনা।

তারপর আরেকটি।

নতুন স্বপ্ন।

নতুন হিসাব।

কিন্তু প্রতিবারই কোথাও না কোথাও থেমে গেছে।

সমস্যা ছিল শুধু অর্থের নয়।

সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল মন।

কোনো কাজে পুরো মন দিতে পারত না।

একটু কাজ করলেই হঠাৎ কোনো পুরোনো স্মৃতি সামনে এসে দাঁড়াত।

কোনো রাস্তা।

কোনো দোকান।

কোনো হাসপাতাল।

কোনো পার্ক।

কোনো গান।

কোনো ছবি।

সবকিছু যেন তাকে বারবার অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেত।

সে চেষ্টা করত ভুলে যেতে।

কিন্তু ভুলে যাওয়া কি মানুষের হাতে থাকে?

অনেক রাত ঘুম ভেঙে যেত।

মনে হতো—

ফোনটা বেজে উঠেছে।

কেউ হয়তো বলছে,

"কেমন আছো?"

ঘুম ভাঙার পর বুঝতে পারত—

সবই কল্পনা।

বাস্তবতা অনেক আগেই বদলে গেছে।

কখনো সে নিজের ডায়েরি খুলে বসত।

পুরোনো কিছু লেখা পড়ত।

আবার বন্ধ করে দিত।

কারণ প্রতিটি পাতায় ছিল একটি করে স্মৃতি।

আর প্রতিটি স্মৃতির শেষে ছিল নীরবতা।

তবুও সে একটি জিনিস ছাড়েনি।

আল্লাহর ওপর ভরসা।

আজও সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে।

আজও সিজদায় গিয়ে নিজের জন্য দোয়া করে।

কিন্তু আগের মতো আর একটি মানুষকে চায় না।

এখন সে শুধু বলে—

"হে আল্লাহ...

আপনি আমার জন্য যা উত্তম,

সেটিই আমার ভাগ্যে লিখে দিন।"

সে বুঝে গেছে,

জোর করে কিছু ধরে রাখা যায় না।

যে চলে যাওয়ার,

সে একদিন চলে যাবেই।

আর যাকে আল্লাহ লিখে রেখেছেন,

তাকে পৃথিবীর কেউ দূরে সরাতে পারবে না।

অনেকেই তাকে আবার রাজনীতিতে ফিরতে বলেছেন।

আবার মানুষের পাশে দাঁড়াতে বলেছেন।

সে কাউকে না বলেনি।

আবার হ্যাঁ-ও বলেনি।

কারণ সে জানে,

মানুষের পাশে দাঁড়াতে হলে আগে নিজের ভেতরের মানুষটাকে দাঁড় করাতে হয়।

সে এখনও সেই লড়াইটাই লড়ছে।

আজও তার বাবা মাঝে মাঝে বলেন,

"জীবন শেষ হয়ে যায়নি।"

মা বলেন,

"আল্লাহ দেরি করেন।

অন্যায় করেন না।"

সে চুপচাপ শুনে।

তারপর মৃদু হাসে।

কারণ এখন সে জানে—

কিছু উত্তর সময়ের কাছেই থাকে।

আজ তার হাতে বড় কোনো পদ নেই।

সফল ব্যবসাও নেই।

স্বপ্নের মানুষও নেই।

কিন্তু একটি জিনিস আছে।

অভিজ্ঞতা।

যে অভিজ্ঞতা তাকে অল্প বয়সেই শিখিয়ে দিয়েছে—

ভালোবাসা অন্ধ হতে পারে।

কিন্তু বিশ্বাস কখনো অন্ধ হওয়া উচিত নয়।

মানুষ প্রতিশ্রুতি দিতে পারে।

মানুষ প্রতিশ্রুতি ভাঙতেও পারে।

কিন্তু আল্লাহ তাঁর কোনো ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।

আজও যখন সে একা কোথাও হাঁটে,

হঠাৎ কোনো পুরোনো স্মৃতি এসে বুকের ভেতর নাড়া দিয়ে যায়।

চোখের কোণে অজান্তেই পানি চলে আসে।

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু বলে—

"হে আল্লাহ...

আমি এখনও পুরোপুরি ভুলতে পারিনি।

কিন্তু আমি মেনে নিতে শিখছি।"

হয়তো একদিন সে আবার নতুন করে ব্যবসা শুরু করবে।

হয়তো আবার মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

হয়তো আবার মানুষের ভালোবাসা অর্জন করবে।

হয়তো আবার কোনো দিন,

কোনো এক ভোরে,

তার জীবনেও নতুন সূর্য উঠবে।

কিন্তু সেই দিনের অপেক্ষায় বসে না থেকে,

সে আজ একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সে আবার শুরু করবে।

শূন্য থেকে।

কারণ ভেঙে পড়া মানুষও আবার দাঁড়াতে পারে।

যদি তার পাশে মানুষ না-ও থাকে,

আল্লাহ থাকেন।

আর আল্লাহ থাকলে,

কোনো মানুষ কখনো একা নয়।

এভাবেই শেষ হয় একটি ভালোবাসার গল্প।

কিন্তু শেষ হয় না একটি মানুষের জীবন।

কারণ...

ভাঙা স্বপ্নের পরেও জীবন থেমে থাকে না।

জীবন আবার শুরু হয়।

শুধু মানুষটা আগের মতো থাকে না।
31 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব