প্রথম পরিচয়, প্রথম গ্রহণঃ
ভালোবাসা কখনো শুধু দুটি মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
একটা সময় আসে, যখন সেই ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে যায় পরিবার।
সেই মুহূর্ত থেকেই সম্পর্কের গুরুত্ব বদলে যায়।
সেদিন সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।
ছেলেটি মায়ের সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছিল।
কিছু ব্যক্তিগত কাজ ছিল।
কাজ শেষ করে দুজনেই ফিরছিল।
পথে হঠাৎ তার মনে একটি চিন্তা এলো।
মেয়েটির ফুফুর বাসা খুব দূরে নয়।
সে কিছুক্ষণ দ্বিধায় রইল।
তারপর সাহস করে মাকে বলল,
"একটা জায়গায় যাবে?"
মা অবাক হয়ে তাকালেন।
"কোথায়?"
সে একটু সংকোচ নিয়ে বলল,
"একজনকে তোমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।"
মা মৃদু হেসে বললেন,
"কে?"
সে সরাসরি উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ আগে পর্যন্তও সে নিজে জানত না যে এমন সিদ্ধান্ত নেবে।
আসলে আগের দিন রাতে মায়ের সঙ্গে তার অনেক কথা হয়েছিল।
সে একজন অসুস্থ মেয়ের কথা বলেছিল।
কীভাবে চিকিৎসা করাতে সমস্যা হয়েছে।
কীভাবে পরিবারের অবহেলায় মেয়েটি কষ্ট পাচ্ছে।
সব শুনে মা মজা করে বলেছিলেন,
"তাহলে বউ করে নিয়ে আয়।"
সে সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলেছিল,
"আরে না আম্মু! ও তো আমার বোনের মতো।"
মা তখন আর কিছু বলেননি।
সেই কথাটাই আজ তার বারবার মনে পড়ছিল।
সে মেয়েটিকে ফোন করল।
বলল,
"একটু নিচে আসবে?"
মেয়েটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কেন?"
"একটা ছোট্ট চমক আছে।"
কিছুক্ষণ পর সে নিচে নেমে এল।
আজ তার মুখে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বস্তি।
শরীরও কিছুটা ভালো।
ছেলেটি মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এই হচ্ছে সেই মেয়ে, যার কথা তোমাকে বলেছিলাম।"
মেয়েটি লজ্জায় সালাম করল।
মা স্নেহভরা চোখে তার সালামের জবাব দিলেন।
কিছু সাধারণ কথা হলো।
কেমন আছে।
পড়াশোনা কেমন চলছে।
শরীর কেমন।
খুব সাধারণ কয়েকটি প্রশ্ন।
কিন্তু সেই সাধারণ কথার মাঝেই ছেলেটির বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি জন্ম নিল।
তার মনে হলো— জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইজন মানুষ আজ প্রথমবার একে অপরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তিনজন মিলে কাছের একটি দোকানে বসে হালকা নাস্তা করল।
কথাবার্তা খুব বেশি হয়নি।
তবু পুরো সময়টাতে পরিবেশটা ছিল অদ্ভুত স্বাভাবিক।
কোনো অস্বস্তি ছিল না।
বিদায় নেওয়ার আগে মা শুধু বললেন,
"শরীরের খেয়াল রেখো।"
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
"জি, আন্টি।"
ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আন্টি না… আম্মু বলো।"
কথাটা বলেই সে নিজেই একটু লজ্জা পেল।
মেয়েটিও মুচকি হেসে মাথা নিচু করল।
মা শুধু মৃদু হেসে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সেদিনের সেই ছোট্ট মুহূর্তটি তাদের কারও কাছেই খুব বড় কিছু মনে হয়নি।
কিন্তু পরে সেই স্মৃতিটাই বারবার ফিরে এসেছিল।
সেদিন রাতে দুজনের অনেক কথা হলো।
মেয়েটি বারবার জিজ্ঞেস করছিল,
"তোমার আম্মু কি আমাকে পছন্দ করেছেন?"
সে হাসতে হাসতে বলল,
"আমার আম্মু মানুষের চরিত্র দেখেন। তুমি যদি ভালো মানুষ হও, তাহলে সেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়।"
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
"আমি একদিন সত্যিই তোমার আম্মুকে 'আম্মু' বলে ডাকতে চাই।"
এই একটি বাক্য শুনে তার বুক ভরে উঠেছিল।
সেই রাতে সে অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারেনি।
তার মনে হচ্ছিল— জীবনের সবচেয়ে কঠিন পথগুলো বুঝি ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যাচ্ছে।
কিছুদিন পর আবার মেয়েটির ডাক্তার দেখানোর দিন এলো।
সে একা যেতে ভয় পাচ্ছিল।
ফোন করে বলল,
"পারলে আসবে?"
সে এক মুহূর্তও দেরি করল না।
হাসপাতালে পৌঁছে আগের মতোই সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল।
ডাক্তারের কক্ষে ঢোকার সময় মেয়েটি অজান্তেই তার হাত শক্ত করে ধরে ফেলল।
সে প্রথমে একটু চমকে উঠেছিল।
তারপর আস্তে করে বলল,
"ভয় পেও না। আমি আছি।"
মেয়েটি কিছু বলল না।
শুধু হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
ডাক্তারের সামনে তারা শুধু দুইজন সাধারণ মানুষ ছিল।
কেউ জানত না— এই নীরব হাত ধরা দুজন মানুষের ভেতরে কত গভীর বিশ্বাস তৈরি করে দিচ্ছে।
পরীক্ষা শেষ হতে অনেক সময় লাগবে।
তারা হাসপাতালের পাশের একটি ছোট্ট পার্কে গিয়ে বসল।
গাছের ছায়ায় বসে দুজন নাস্তা করল।
অনেক গল্প করল।
ছোট ছোট স্বপ্নের কথা বলল।
ভবিষ্যতের কথা বলল।
হাসতে হাসতে কখন যে দুই ঘণ্টা কেটে গেল, কেউ বুঝতেই পারল না।
রিপোর্ট হাতে নিয়ে আবার ডাক্তারের কাছে গেল।
সবকিছু স্বাভাবিক শুনে দুজনেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
ফিরে আসার পথে ছেলেটির মনে হচ্ছিল— হয়তো জীবনের সব ঝড় শেষ হয়ে গেছে।
এখন শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা।
কিন্তু মানুষ ভবিষ্যৎ দেখতে পারে না।
তাই সে জানত না— এই সুন্দর দিনগুলোর স্মৃতিই একদিন তার বুকের সবচেয়ে গভীর ব্যথা হয়ে ফিরে আসবে।
কারণ জীবন অনেক সময় সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোই আগে উপহার দেয়… যাতে হারানোর কষ্ট আরও গভীর হয়।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১০ম পর্ব
20
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই