ভাঙা স্বপ্নের পরে — ৩য় পর্ব

একটি অপ্রত্যাশিত পরিচয়ঃ


মানুষের জীবনে কিছু কিছু মানুষ আসে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই।

না তাদের জন্য অপেক্ষা থাকে, না তাদের জন্য কোনো পরিকল্পনা।

তবু একদিন হঠাৎ করেই তারা জীবনের এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়, যেখান থেকে ফিরে আসা আর সহজ থাকে না।

তখনও সে জানত না, তার জীবন এমন একটি মোড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

সেই সময়টায় তার দিনগুলো ছিল খুব ব্যস্ত।

সকালে মানুষের কাজ, দুপুরে ছোটখাটো ব্যবসার পরিকল্পনা, বিকেলে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড, আর রাতে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ চিন্তা।

তার কাছে প্রেম তখন বিলাসিতা।

সে বিশ্বাস করত, একজন পুরুষের প্রথম দায়িত্ব নিজের অবস্থান তৈরি করা।

যার নিজের ভিত্তি শক্ত নয়, সে অন্য একজন মানুষের জীবনের দায়িত্ব কীভাবে নেবে?

তাই যখন বন্ধুরা প্রেমের গল্প করত, সে শুধু শুনত।

হাসত।

তারপর বিষয় বদলে দিত।

মেয়েদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা তার স্বভাব ছিল না।

কোনো মেয়ে প্রয়োজনে যোগাযোগ করলে সম্মান দিয়ে কথা বলত, কিন্তু কখনো সীমা অতিক্রম করত না।

সে ছোটবেলা থেকেই নিজের জন্য একটি নিয়ম বানিয়েছিল—

"যে মেয়ে আমার স্ত্রী নয়, তাকে আমি সর্বোচ্চ একজন বোনের সম্মানই দেব।"

এই নিয়ম সে কখনো ভাঙেনি।

সম্ভবত এই কারণেই এলাকার অনেক পরিবারও তাকে বিশ্বাস করত।

ঠিক সেই সময় তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিদেশে থাকত।

দুজনের মধ্যে প্রায়ই হাসি-ঠাট্টা চলত।

একদিন কথার ফাঁকে সে মজা করে বলেছিল,

— "শোন, আমার জন্য একটা ভালো মেয়ে দেখে রাখিস।"

বন্ধুটি হেসে উঠেছিল।

এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন মেয়ের ছবি পাঠাত।

সে ছবিগুলো দেখত, আবার ভুলেও যেত।

কাউকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার মতো সময় বা ইচ্ছা—কোনোটাই ছিল না।

তার কাছে এগুলো ছিল নিছক বন্ধুর সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা।

কয়েক দিন পর এক রাতে সেই বন্ধু আবার ফোন করল।

কথার এক পর্যায়ে বলল,

— "একজন আছে। খুব ভালো মেয়ে। আমার পরিচিত মানুষের খুব কাছের।"

সে আগের মতোই হেসে বিষয়টা উড়িয়ে দিল।

পরদিন আবার খবর এল।

বন্ধুটি জানাল, মেয়েটি নাকি তাদের খুব পরিচিত।

চাইলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

সে খুব একটা গুরুত্ব দিল না।

তবু ভদ্রতার খাতিরে বলল,

— "আচ্ছা, পরিচয় হলে সমস্যা কী?"

সেখান থেকেই শুরু।

প্রথমে শুধু নাম জানা।

তারপর একদিন একটি ছোট্ট বার্তা।

তারপর প্রয়োজনের সময় দু-একটি কথা।

এর বেশি কিছু নয়।

তাদের মধ্যে কোনো বিশেষ সম্পর্ক ছিল না।

বরং সে শুরু থেকেই একটা দূরত্ব বজায় রেখেছিল।

কারণ তার মনে সবসময় একটি কথাই ঘুরত—

"অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা একদিন ভুল বোঝাবুঝির কারণ হয়।"

তাই কথা হলেও সীমার মধ্যে থাকত।

এদিকে এক বিকেলে হঠাৎ একটি ফোন এল।

নম্বরটি তার পরিচিত ছিল না।

ফোন ধরতেই একটি মেয়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

সে বিনয়ের সঙ্গে বলল,

"ভাইয়া, একটু সাহায্য দরকার।"

সে মন দিয়ে শুনল।

পরদিন ছিল তার বিদেশে থাকা বন্ধুর জন্মদিন।

তারা গোপনে একটি ছোট্ট আয়োজন করতে চায়।

কিন্তু লোকবল কম।

একজনের সাহায্য দরকার।

সে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

"আচ্ছা, আমি আসছি।"

তার কাছে সাহায্য মানেই সাহায্য।

সেখানে কে আছে, কে নেই—এসব নিয়ে সে খুব একটা ভাবত না।

নির্ধারিত সময়ে সে পৌঁছে গেল।

সঙ্গে ছিল তার এক আত্মীয়ও।

সবাই ব্যস্ত।

কেউ সাজাচ্ছে।

কেউ কেক আনছে।

কেউ ছবি তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সে শুধু যে কাজ বলা হচ্ছে, সেটাই করছিল।

ঠিক তখনই প্রথমবার সে তাকে দেখল।

খুব সাধারণ পোশাক।

মুখে কোনো বাড়তি সাজ ছিল না।

চোখেমুখে ছিল এক ধরনের শান্ত স্বভাব।

সে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল।

ইচ্ছা করেই আর তাকাল না।

কারণ সে নিজের সেই পুরোনো নিয়ম ভাঙতে চায়নি।

কোনো মেয়ের দিকে অকারণে তাকানো তার অভ্যাস ছিল না।

অনুষ্ঠান শেষ হলো।

সবাই যার যার মতো বিদায় নিতে শুরু করল।

সেও বেরিয়ে এল।

কিন্তু দরজার কাছাকাছি পৌঁছাতেই অদ্ভুত একটি ঘটনা ঘটল।

একজন মেয়ে এগিয়ে এসে তার হাতে একটি ফুল ধরিয়ে দিতে চাইল।

সে থমকে দাঁড়াল।

মেয়েটি কিছু বলতে চাইছিল।

সে কিছুই বলল না।

ফুলটিও নিল না।

আবার অপমানও করল না।

শুধু শান্তভাবে সেখান থেকে চলে এল।

তার মনে হচ্ছিল—

কাউকে কষ্ট দেওয়া ঠিক নয়।

আবার ভুল আশা দেওয়াও ঠিক নয়।

রাতে অনেক ভেবেচিন্তে সে একটি ছোট্ট বার্তা পাঠাল।

বার্তার ভাষা ছিল খুবই ভদ্র।

সে শুধু জানতে চেয়েছিল—

আজকের ঘটনাটির অর্থ কী?

আর যদি কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকে, তাহলে সেটি যেন এখানেই শেষ হয়ে যায়।

তার কাছে বিষয়টি সেখানেই শেষ।

কিন্তু জীবন তখন নীরবে আরেকটি গল্প লিখতে শুরু করেছে।

সে বুঝতেই পারেনি—

যে মানুষটির সঙ্গে আজ তার পরিচয় হলো, তাকে সে এখনও একজন সাধারণ পরিচিত মানুষ বলেই ভাবছে।

কিন্তু ভাগ্য তাকে অন্য পরিচয়ে চিনিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সামনের দিনগুলোতে তাদের কথাবার্তা বাড়বে।

তবে প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে নয়।

একজন ভাই...

আর একজন ছোট বোন হিসেবে।

আর সেই সম্পর্কই একদিন অদৃশ্যভাবে বদলে দেবে তাদের দুজনের পুরো পৃথিবী।
19 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব