যে রাতে সব ভেঙে গেলঃ
কিছু রাত মানুষের জীবন বদলে দেয়।
আবার কিছু রাত—
মানুষকে নতুন করে জন্ম দেয়।
সেদিনের রাতটি ছিল ঠিক তেমনই একটি রাত।
পাহাড় থেকে ফিরে আসার পরও তার মন শান্ত হলো না।
বারবার একই প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরছিল।
"সবকিছু কি সত্যিই আগের মতো আছে?"
"নাকি আমি শুধু নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছি?"
মেয়েটির সঙ্গে ফোনে কথা হচ্ছিল।
কথা হচ্ছিল, কিন্তু মন থেকে নয়।
দুজনের মাঝখানে যেন অদৃশ্য একটি দেয়াল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
সে উত্তর খুঁজছিল।
আর মেয়েটি বারবার অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই সময় পাশের ঘর থেকে একটি কান্নার শব্দ ভেসে এল।
সে চমকে উঠল।
এটা তার মায়ের কান্না।
ফোন কানে রেখেই সে দ্রুত উঠে গেল।
মাকে জিজ্ঞেস করল,
"কী হয়েছে?"
মা মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
কোনো উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
সেই দৃষ্টির ভেতরে ছিল অসহায়ত্ব।
ভয়।
আর অজানা এক আতঙ্ক।
হয়তো তিনি কয়েক দিন ধরেই বুঝতে পারছিলেন—
তার ছেলে আর আগের মতো নেই।
তার হাসি নেই।
তার স্বপ্ন নেই।
তার চোখে আলো নেই।
ছেলেটি নিজেও আর নিজেকে চিনতে পারছিল না।
মনে হচ্ছিল—
সবকিছু একসঙ্গে ভেঙে পড়ছে।
ভালোবাসা...
স্বপ্ন...
ভবিষ্যৎ...
নিজের ওপর বিশ্বাস...
সব।
হঠাৎ সে নিজের রাগ আর কষ্টকে আর ধরে রাখতে পারল না।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তার আচরণ সম্পূর্ণ বদলে গেল।
সে নিজের ঘরের জিনিসপত্র ভাঙতে শুরু করল।
যেগুলো একদিন নিজের স্বপ্ন দিয়ে গড়েছিল,
সেগুলোই নিজের হাতে ভেঙে ফেলছিল।
মা তাকে থামানোর চেষ্টা করছিলেন।
কিন্তু তখন সে যেন নিজের ভেতরেই হারিয়ে গিয়েছিল।
কেউ তাকে পৌঁছাতে পারছিল না।
এরপর কী ঘটেছিল,
তার সবটুকু স্মৃতি আজও তার মনে নেই।
শুধু মনে আছে—
প্রচণ্ড অন্ধকার।
অসহায় কান্না।
আর সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে— এমন একটি অনুভূতি।
তারপর...
দীর্ঘ নীরবতা।
যখন তার জ্ঞান ফিরল,
তখন পরের দিনের বিকেল।
সে দেখল—
নিজের বাড়িতে নয়।
নানাবাড়ির একটি ঘরে শুয়ে আছে।
চারপাশে পরিচিত মুখ।
কিন্তু কারও চোখে হাসি নেই।
সবাই অদ্ভুত নীরব।
সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
"আমি এখানে কেন?"
কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
পরে জানতে পারল—
সেদিন তার অবস্থার খবর বিদেশে থাকা বাবার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল।
সংবাদটি শোনার পর বাবা আর এক মুহূর্ত দেরি করেননি।
তিনি পরিবারের লোকজনকে খবর দেন।
তার মামা ছুটে আসেন।
তাকে নিরাপদে নিয়ে যান।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বাবার সঙ্গে ফোনে কথা হয়।
সেদিন জীবনে প্রথমবার—
সে নিজের ভেতরের সব কথা খুলে বলেছিল।
একটিও কথা লুকায়নি।
নিজের ব্যর্থতা।
নিজের কষ্ট।
নিজের ভালোবাসা।
নিজের ভাঙন।
সব।
ওপাশে বাবা নীরবে শুনছিলেন।
একসময় ছেলের কান্নার সঙ্গে বাবার কান্নাও মিশে গেল।
একজন বাবা,
যিনি সবসময় ছেলের শক্ত মুখটাই দেখেছেন,
সেদিন প্রথমবার বুঝলেন—
তার ছেলেটা ভেতর থেকে কতটা ভেঙে গেছে।
পরে আত্মীয়দের কাছ থেকে সে জানতে পারল,
সেদিন তার আচরণে সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল।
সে কী বলেছে,
কী করেছে—
সবকিছু তার নিজের মনে নেই।
স্মৃতির অনেক অংশ যেন মুছে গেছে।
পরদিন তাকে একজন ধর্মীয় ব্যক্তির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তিনি নানা ধরনের উপায়ের কথা বলছিলেন।
কিন্তু তার মন সেগুলো গ্রহণ করতে পারেনি।
সে শুধু চেয়েছিল—
একটু শান্তি।
একটু স্বস্তি।
একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ।
সন্ধ্যার পর থেকে ধীরে ধীরে তার মন কিছুটা শান্ত হতে শুরু করল।
কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিস্ময় তখনও সামনে অপেক্ষা করছিল।
সে তখনও জানত না—
হাজার মাইল দূরে থাকা তার বাবা আর বিদেশে নেই।
সবকিছু ফেলে...
নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েও...
তিনি দেশে ফিরে এসেছেন।
শুধু একটি কারণে।
নিজের ছেলেকে আবার বাঁচিয়ে তোলার জন্য।
সেই রাতটি তার জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল।
কিন্তু একই সঙ্গে তাকে একটি সত্যও শিখিয়েছিল—
একজন মানুষ পৃথিবীর সবার কাছে হারতে পারে।
কিন্তু পরিবারের ভালোবাসার কাছে কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
আর একজন বাবার বুক—
সন্তানের ভাঙা পৃথিবীর শেষ আশ্রয়।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২১তম পর্ব
23
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই