ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২০ম পর্ব

সন্দেহের ছায়াঃ


মানুষ যখন কাউকে নিঃশর্ত বিশ্বাস করে, তখন তার সবচেয়ে বড় ভয় হয়— সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরবে না তো?

ভালোবাসা কখনো কখনো সন্দেহ থেকে নয়,

ভয় থেকে জন্ম নেয়।

হারিয়ে ফেলার ভয়।

প্রিয় মানুষটিকে অন্য কারও পাশে দেখার ভয়।

সেই ভয়ই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর প্রথম দিন তেমন কোনো কথা হয়নি।

সে ভেবেছিল—

অনুষ্ঠানের ব্যস্ততা আছে।

অনেক আত্মীয়-স্বজন।

তাই হয়তো সময় পাচ্ছে না।

সে নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছিল।

রাতে শুধু একটি ছোট্ট বার্তা এসেছিল।

"ভালো আছি।"

সে উত্তর দিয়েছিল,

"আল্লাহ হেফাজত করুন।"

পরদিন সকালেও কোনো কথা হলো না।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল।

বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা।

মোবাইলের স্ক্রিনে বারবার চোখ যাচ্ছিল।

কোনো কল নেই।

কোনো বার্তা নেই।

সে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছিল।

একটি নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে হিসাব লিখছিল।

কাগজে সংখ্যা লিখছিল।

আবার মুছে ফেলছিল।

মনে কিছুই বসছিল না।

সন্ধ্যার পর হঠাৎ তার মনে পড়ল—

মেয়েটির একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে তখনও তার প্রবেশাধিকার ছিল।

অনেক আগেই বিশ্বাস করে সে নিজেই দিয়েছিল।

কখনো সে সেই সুযোগের অপব্যবহার করেনি।

সেদিনও উদ্দেশ্য ছিল না কোনো কিছু খোঁজার।

শুধু দেখতে চেয়েছিল—

সে ভালো আছে কি না।

অ্যাকাউন্ট খুলতেই প্রথমে কিছুই চোখে পড়ল না।

তারপর হঠাৎ একটি ছবি সামনে চলে এল।

একটি পার্লারের ভেতর।

বিয়ের সাজে মেয়েটি।

তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক।

ছবিটি দেখে তার বুকের ভেতর যেন কেউ বরফ ঢেলে দিল।

সে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।

বারবার নিজের মনকে বলল,

"হয়তো আত্মীয় হবে।"

কিন্তু পরের মুহূর্তেই আরেকটি প্রশ্ন মাথায় এল—

"তাহলে আমাকে বলেনি কেন?"

এই একটি প্রশ্নই তার ভেতরের শান্ত মানুষটিকে ভেঙে দিতে শুরু করল।

সে ফোন করল।

ফোন বন্ধ।

আবার করল।

কোনো উত্তর নেই।

তার মাথার ভেতর অদ্ভুত সব চিন্তা ঘুরতে লাগল।

মানুষ যখন কষ্ট পায়,

তখন বাস্তবের চেয়ে কল্পনাই তাকে বেশি আঘাত করে।

সেও তার ব্যতিক্রম ছিল না।

অসংখ্য প্রশ্ন নিজের মনেই তৈরি করছিল।

নিজেই উত্তর দিচ্ছিল।

একসময় রাগ যুক্তিকে হারিয়ে দিল।

অভিমান বিবেককে ঢেকে দিল।

রাগের মাথায় সে সেই ফোনটির সব তথ্য মুছে দিল।

কয়েক মিনিট পরই নিজের ভুলটা বুঝতে পারল।

ভাবল—

"আমি কী করে ফেললাম?"

সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।

রাত অনেক পরে ফোন এল।

মেয়েটির কণ্ঠে উদ্বেগ।

"ফোনে কিছু হয়েছে?"

সে ধীরে বলল,

"পাসওয়ার্ড লাগবে?"

"হ্যাঁ।"

সে কোনো প্রশ্ন করল না।

শুধু পাসওয়ার্ড বলে দিল।

মেয়েটিও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

সেদিনের কথোপকথন ছিল খুব ছোট।

খুব ঠান্ডা।

দুজনেই যেন কিছু লুকিয়ে রাখছিল।

রাত গভীর হওয়ার পরও তার ঘুম এল না।

বারবার সেই ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।

সে নিজেকে বোঝাচ্ছিল—

"আমি ওকে বিশ্বাস করি।"

কিন্তু মন উত্তর দিচ্ছিল—

"তাহলে এত কষ্ট হচ্ছে কেন?"

পরদিন সকালেই সে মেয়েটির মায়ের নম্বরে ফোন করল।

অনেকক্ষণ কথা হলো।

তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন,

"ছেলেটা আমাদের আত্মীয়।"

তিনি পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা দিলেন।

কে ছিল।

কেন ছিল।

কীভাবে ছবিটি তোলা হয়েছিল।

সব।

সে চুপচাপ শুনছিল।

মনে হচ্ছিল—

ব্যাখ্যাগুলো সত্যও হতে পারে।

আবার তার আহত মন সেগুলো মানতেও চাইছিল না।

ফোন রাখার পর সে অনেকক্ষণ একা বসে রইল।

তারপর সিদ্ধান্ত নিল—

সে নিজেকে একটু সময় দেবে।

সেদিন বিকেলে সে একা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

গ্রামের পাশের ছোট পাহাড়ি টিলায় গিয়ে বসে রইল।

চারপাশে নীরবতা।

দূরে পাখির ডাক।

হালকা বাতাস।

কিন্তু তার ভেতরে যেন ঝড় বইছিল।

ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।

ওপাশে সেই পরিচিত কণ্ঠ।

"কোথায় আছো?"

সে বলল,

"একটু দূরে।"

"রাগ করেছ?"

সে উত্তর দিল না।

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

নীরবতারও একটা ভাষা আছে।

সেদিন সেই ভাষাই সবচেয়ে বেশি কথা বলছিল।

কথা বলতে বলতে হঠাৎ তার চোখ পড়ল—

মেয়েটির নম্বরে সংরক্ষিত একটি নামের দিকে।

ইংরেজি দুটি অক্ষর।

N.F

সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

"এন মানে কে?"

মেয়েটি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর বিষয় বদলে দিল।

অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে লাগল।

সে আবারও জিজ্ঞেস করল।

উত্তর এল না।

এই নীরবতাই তার ভেতরের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিল।

যদিও সে তখনও জানত না—

একটি নামের রহস্যের চেয়ে বড় ঝড় তার জন্য অপেক্ষা করছে।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে অনেকক্ষণ মায়ের পাশে বসে ছিল।

মা বুঝতে পারছিলেন—

ছেলের ভেতরে কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে।

কিন্তু কী?

সেটা তিনি জানতেন না।

আর ছেলেটিও বলতে পারছিল না।

কারণ সে তখনও বিশ্বাস করত—

সব ভুল বোঝাবুঝি একদিন ঠিক হয়ে যাবে।

সে বুঝতে পারেনি—

এটি শুধু একটি ভুল বোঝাবুঝির শুরু নয়।

এটি ছিল তার মানসিক ভাঙনের দরজা খুলে যাওয়ার প্রথম শব্দ।

একটি ছোট সন্দেহ...

একটি অসমাপ্ত উত্তর...

আর একটি অদৃশ্য ভয়—

ধীরে ধীরে তার পুরো পৃথিবীকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে শুরু করেছিল।
18 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব