ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২৩তম পর্ব

শেষ আশার অপেক্ষাঃ


মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় তখন,

যখন সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বুকের ভেতর একটি ছোট্ট আশা বেঁচে থাকে।

সে আশাটাই মানুষকে প্রতিদিন অপেক্ষা করায়।

প্রতিটি ফোনের শব্দে চমকে উঠতে শেখায়।

প্রতিটি অপরিচিত নম্বরে মনে করিয়ে দেয়—

"হয়তো এবার সব ঠিক হবে।"

ছেলেটির অবস্থাও ঠিক তেমনই ছিল।

বাবা দেশে ফেরার পর থেকে তিনি নিজের দেওয়া কথা রাখার চেষ্টা করছিলেন।

তিনি ছেলেকে শুধু সান্ত্বনা দেননি,

নিজেও বিষয়টি সমাধানের পথ খুঁজতে শুরু করেছিলেন।

মা-ও হাল ছাড়েননি।

একদিন তিনি আবার মেয়েটির মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

দীর্ঘ সময় কথা হলো।

অভিযোগও ছিল।

অভিমানও ছিল।

আবার একজন মায়ের অসহায়ত্বও ছিল।

দুইজনই নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলেন।

কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো গেল না।

এরপর কয়েক দিন কেটে গেল।

ছেলেটি প্রতিদিন একই প্রশ্ন করত।

"আজ কোনো খবর আছে?"

মা শুধু বলতেন,

"ধৈর্য ধরো।"

সে ধৈর্য ধরার চেষ্টা করত।

কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা কিছুতেই কমছিল না।

তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল একটি।

সে অন্য কারও মুখের কথা বিশ্বাস করতে চাইছিল না।

সে শুধু একটি সত্য শুনতে চেয়েছিল।

মেয়েটির নিজের মুখ থেকে।

একদিন সে মাকে বলল,

"যদি ও নিজে বলে, ও আর আমাকে চায় না...

আমি আর কখনো বিরক্ত করব না।"

মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

"ঠিক আছে।

আমরা চেষ্টা করব।"

এরপর শুরু হলো অপেক্ষা।

এক দিন।

দুই দিন।

তিন দিন।

সময় যেন এগোতেই চাইছিল না।

এর মধ্যে মাঝে মাঝে খবর আসত—

মেয়েটি নানাবাড়িতে আছে।

আবার কেউ বলত—

সে ভালো নেই।

কেউ বলত—

বাড়ির পরিবেশ এখনো অশান্ত।

এই খবরগুলো শুনে ছেলেটির বুক আরও ভারী হয়ে উঠত।

সে প্রতিদিন আল্লাহর কাছে একই দোয়া করত।

"হে আল্লাহ...

আমাকে সত্যটা জানিয়ে দিন।

মিথ্যা আশায় আর বাঁচিয়ে রাখবেন না।"

অবশেষে সেই দিনটি এলো।

শুক্রবার।

জুমার নামাজ শেষ করে সে বাড়ি ফিরছিল।

হাতে ছিল একটি সাধারণ বাটন ফোন।

নিজের পুরোনো স্মার্টফোন তখন আর ব্যবহার করছিল না।

সে অনেকক্ষণ দ্বিধায় ছিল।

ফোন করবে?

নাকি করবে না?

শেষ পর্যন্ত সাহস করে নম্বরটি ডায়াল করল।

ওপাশে মেয়েটির মা।

তিনি ফোন ধরলেন।

প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই কথা বললেন।

ছেলেটি খুব শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল,

"ও কেমন আছে?"

উত্তরে তিনি বললেন,

"ভালো আছে।"

ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

"আমি শুধু একবার ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই।

এর বেশি কিছু না।"

প্রথমে তিনি রাজি হলেন না।

বললেন,

"এতে কোনো লাভ হবে না।"

তবুও ছেলেটি অনুরোধ করতেই থাকল।

কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না।

শুধু ছিল একটি শেষ অনুরোধ।

অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন,

"দেখি।"

ফোন কেটে গেল।

সেই কয়েক মিনিট তার কাছে কয়েক ঘণ্টার মতো মনে হচ্ছিল।

সে বারবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছিল।

অবশেষে আবার ফোন এল।

স্ক্রিনে সেই একই নম্বর।

তার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

সে জানত না—

এই ফোন তার জীবন বদলে দেবে।

ওপাশে প্রথমে মেয়েটির মা কথা বললেন।

তার কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল।

কিছুটা কান্নাও ছিল।

তিনি বললেন,

"আমি ওকে ফোন দিচ্ছি।

তুমি যা বলার, শান্তভাবে বলো।"

ছেলেটির হাত কাঁপছিল।

এত দিন পর...

সে আবার সেই কণ্ঠ শুনবে।

যে কণ্ঠের জন্য অসংখ্য রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে।

যে কণ্ঠের জন্য নিজের সব স্বপ্ন বদলে ফেলেছিল।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর...

ওপাশে খুব পরিচিত একটি কণ্ঠ।

শান্ত।

নির্বিকার।

কিন্তু আগের মতো নয়।

ছেলেটি শুধু বলল,

"কেমন আছো?"

ওপাশ থেকে ছোট্ট উত্তর এল।

"ভালো।"

এই একটি শব্দেই সে বুঝে গেল—

অনেক কিছু বদলে গেছে।

তবুও সে নিজের মনকে শক্ত করল।

কারণ সে এখনো বিশ্বাস করছিল—

সত্য শুনতে যতই কষ্ট হোক,

মিথ্যা আশায় বেঁচে থাকার চেয়ে তা অনেক সহজ।

কিন্তু সে তখনও জানত না—

পরের কয়েকটি বাক্য শুধু একটি সম্পর্কের নয়,

তার পুরো জীবনের দিকটাই বদলে দেবে।
23 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব