শৈশবের স্বপ্নঃ
মানুষ জন্মের সময় কোনো পরিচয় নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। তার পরিচয় তৈরি হয় সময়ের সঙ্গে, শিক্ষা দিয়ে, পরিবেশ দিয়ে, আর সবচেয়ে বেশি—তার নিজের সিদ্ধান্ত দিয়ে।
গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটিও জন্মের সময় জানত না, একদিন তাকে নিয়ে এত মানুষের এত আশা তৈরি হবে। জানত না, খুব অল্প বয়সেই তাকে এমন সব সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যেগুলো নিতে অনেক মানুষ পুরো জীবন পার করে দেয়।
ছোটবেলা থেকেই সে অন্যরকম ছিল।
খেলাধুলা করত, দুষ্টুমিও করত। কিন্তু কারও কান্না সে সহ্য করতে পারত না। পাড়ার কোনো বৃদ্ধ রাস্তা পার হতে না পারলে সে দৌড়ে গিয়ে হাত ধরে পার করিয়ে দিত। কারও ঘরে খাবার নেই শুনলে নিজের কাছে কিছু না থাকলেও অন্তত পাশে গিয়ে বসে থাকত। সে বিশ্বাস করত, সব সাহায্য টাকা দিয়ে হয় না; অনেক সময় একজন মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবচেয়ে বড় সাহায্য।
তার বাবা ছিলেন কঠোর, কিন্তু হৃদয়বান মানুষ। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বছরের পর বছর প্রবাসে কাটিয়েছেন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। আর মা ছিলেন সংসারের ছায়া। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের সব কষ্ট লুকিয়ে রাখতেন।
ছেলেটি খুব ভালো করেই জানত—তার বাবা তাকে অনেক বড় মানুষ হিসেবে দেখতে চান।
কিন্তু "বড় মানুষ" বলতে সে কখনো বড় পদ বা বড় গাড়ি বুঝত না।
সে বুঝত—যার জন্য মানুষ দোয়া করে, সেই-ই বড় মানুষ।
স্কুলজীবনে পড়াশোনায় সে মাঝারি মানের ছিল। বইয়ের বাইরে পৃথিবী তাকে বেশি টানত। গ্রামের মানুষের জীবন, তাদের কষ্ট, তাদের সমস্যা—এসবই যেন তার অদৃশ্য পাঠ্যবই।
অনেকেই তাকে বলত,
"নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাব।"
সে শুধু হাসত।
তার মনে হতো, মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে না ভাবলে নিজের ভবিষ্যৎ দিয়েই বা কী হবে?
কৈশোরে পৌঁছানোর আগেই সে বুঝে গেল, সমাজে শুধু অভিযোগ করে কোনো পরিবর্তন আনা যায় না। পরিবর্তন আনতে হলে মানুষের ভেতরে যেতে হয়। তাদের কথা শুনতে হয়। তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়।
সেখান থেকেই শুরু।
কোনো পদ ছিল না।
কোনো পরিচয় ছিল না।
শুধু ছিল মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছা।
ধীরে ধীরে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কাজে তাকে দেখা যেতে লাগল। কেউ অসুস্থ হলে রক্তদাতার খোঁজ করা, কারও চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া, দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, বৃদ্ধদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে সহযোগিতা করা—এসব কাজ করতে করতে সে অজান্তেই মানুষের আপনজন হয়ে উঠল।
অদ্ভুত একটা বিষয় ছিল তার মধ্যে।
সে কখনো কারও রাজনৈতিক পরিচয় জিজ্ঞেস করত না।
কেউ কোন দলের, কোন মতের, কোন ধর্মের—এসব তার কাছে গুরুত্ব পেত না।
সে শুধু একটি প্রশ্ন করত—
"সমস্যাটা কী?"
এই একটি প্রশ্নই তাকে সবার কাছের মানুষ বানিয়ে দিয়েছিল।
অনেক সময় দেখা যেত, যে দুইজন মানুষ রাজনৈতিকভাবে একে অপরের কঠিন প্রতিপক্ষ, তারা দুজনই আলাদা সময়ে এসে একই ছেলেটির কাছে সাহায্য চাইছে।
আর সে?
দুজনেরই কাজ করার চেষ্টা করত।
কারণ সে বিশ্বাস করত—
রাজনীতি যদি মানুষকে আলাদা করে দেয়, তবে সেই রাজনীতির চেয়ে মানুষের সম্পর্ক অনেক বড়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচিতির পরিধি বাড়তে লাগল।
স্থানীয় মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে দোকানদার, কৃষক, দিনমজুর, শিক্ষক, ছাত্র, এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও তাকে চিনতে শুরু করলেন।
তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—সে কারও বিরুদ্ধে কথা বলত না।
কোনো বৈঠকে দুই পক্ষের ঝগড়া হলে, সে চেষ্টা করত সমাধান বের করতে।
সে জানত, মানুষকে জিতিয়ে দিয়ে নেতা হওয়া যায় না; মানুষকে একসঙ্গে নিয়ে চলতে পারলেই নেতৃত্বের যোগ্যতা তৈরি হয়।
এদিকে বাড়ির মানুষ কিছুই বুঝতে পারছিল না।
তারা ভাবতেন, ছেলেটা হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়।
কেউ জানতেন না, দিনের পর দিন সে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে, অসুস্থ মানুষের খবর নিচ্ছে, কারও কাগজপত্র ঠিক করে দিচ্ছে, কারও সমস্যার সমাধানের জন্য অফিসের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।
তার নিজের পকেটে অনেক সময় ভাড়া পর্যন্ত থাকত না।
তবুও যদি কোনো অসহায় মানুষ সাহায্য চাইত, সে নিজের প্রয়োজন ভুলে যেত।
বন্ধুরা মাঝে মাঝে বলত,
"তুই এত কিছু করিস, তোর লাভ কী?"
সে মৃদু হেসে উত্তর দিত,
"সব লাভ টাকায় মাপা যায় না। কিছু লাভ শুধু আল্লাহর কাছে জমা থাকে।"
অল্প বয়সেই সে উপলব্ধি করেছিল—মানুষের ভালোবাসা কেনা যায় না, অর্জন করতে হয়।
আর সেই ভালোবাসা অর্জনের জন্য দরকার সততা, ধৈর্য আর নিঃস্বার্থ মন।
সেই কারণেই হয়তো তার জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছিল।
বয়সে ছোট হলেও অনেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার মতামত জানতে চাইতেন।
কেউ কেউ মজা করে বলতেন,
"একদিন তুই অনেক দূর যাবি।"
সে তখন শুধু হাসত।
কারণ তার গন্তব্য কোনো চেয়ার ছিল না।
তার গন্তব্য ছিল মানুষের হৃদয়।
কিন্তু সে জানত না...
মানুষের হৃদয় জয় করা যত কঠিন, নিজের হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণে রাখা তার চেয়েও কঠিন।
আর খুব শিগগিরই তার জীবনে এমন একজন আসতে চলেছে, যার আগমনে বদলে যাবে তার সমস্ত হিসাব, সমস্ত স্বপ্ন, আর পুরো জীবন।
ভাঙা স্বপ্নের পরে
21
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই