ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২৬তম পর্ব

সত্যের মুখোমুখিঃ


আল্লাহ যখন কোনো সত্য প্রকাশ করতে চান,

তখন সেই সত্য লুকিয়ে রাখার ক্ষমতা কারও থাকে না।

মানুষ অনেক কিছু আড়াল করতে পারে।

কিন্তু সময়—

সময় কখনো সত্যের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় না।

সেদিন দুপুরে ছেলেটি নিজের ঘরে বসে ছিল।

অনেক দিন পর সে একটি নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা লিখতে বসেছিল।

কাগজে কয়েকটি হিসাব লিখল।

আবার কেটে দিল।

মন বসছিল না।

ঠিক তখনই তার ফোনে একটি বার্তা এল।

একজন পুরোনো বন্ধু।

অনেক দিন কথা হয়নি।

বার্তার সঙ্গে ছিল কয়েকটি ছবি এবং একটি দীর্ঘ ভয়েস মেসেজ।

সে প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি।

ভাবল, হয়তো সাধারণ কোনো বিষয়।

কিন্তু ভয়েস মেসেজটি চালু করতেই তার মুখের রঙ বদলে গেল।

কথাগুলো শুনে সে হতবাক হয়ে গেল।

সে বুঝতে পারছিল—

তার সম্পর্কে এমন কিছু অভিযোগ করা হয়েছে,

যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।

সে নাকি জোর করে বিয়ে করতে চেয়েছে।

সে নাকি ভয় দেখিয়েছে।

সে নাকি নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।

ছেলেটি অনেকক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইল।

তার নিজের কাছেই যেন সবকিছু অবিশ্বাস্য লাগছিল।

যে মানুষটি নিজের ভালোবাসার মানুষকে একদিন পালিয়ে যেতে পর্যন্ত রাজি হয়নি,

সে কীভাবে জোর করার মানুষ হতে পারে?

তার মা বিষয়টি জানতে পেরে শান্তভাবে বললেন,

"রাগ করিস না।

আগে সত্যটা জেনে নে।"

পরদিন সেই পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা হলো।

দীর্ঘ সময়।

অনেক প্রশ্ন।

অনেক উত্তর।

কথা বলতে বলতে দুজনেই বুঝতে পারল—

তাদের দুজনের কাছেই ভিন্ন ভিন্ন গল্প বলা হয়েছে।

একজনকে আরেকজন সম্পর্কে এমনভাবে বোঝানো হয়েছে,

যেন দুজনই একে অপরের শত্রু।

ছেলেটি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

"আমি কাউকে ছোট করতে চাই না।

আমি শুধু সত্যটা জানতে চাই।"

ওপাশ থেকেও একই উত্তর এল।

"আমিও তাই চাই।"

এরপর দুই পরিবারের মায়েদের মধ্যেও কথা হলো।

দীর্ঘ আলোচনা।

অনেক পুরোনো ঘটনার মিল খুঁজে দেখা হলো।

একসময় এমন কিছু তথ্য সামনে এলো,

যা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

অনেক ভুল বোঝাবুঝির পেছনে ছিল ভিন্ন ভিন্ন গল্প।

একই ঘটনার একাধিক সংস্করণ।

একেকজনের কাছে একেক রকম কথা।

ছেলেটি সেদিন প্রথমবার উপলব্ধি করল,

সে শুধু একটি সম্পর্ক হারায়নি—

সে এমন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে,

যেখানে বিশ্বাস ভেঙে গেলে মানুষ নিজের প্রতিচ্ছবিকেও চিনতে পারে না।

তার বুকের ভেতর কষ্ট তখনও ছিল।

কিন্তু সেই কষ্টের রূপ বদলে গিয়েছিল।

এখন আর প্রশ্ন ছিল না—

"কেন আমাকে ছেড়ে গেলে?"

বরং প্রশ্ন ছিল—

"আমি কি এমন একজন মানুষকে আঁকড়ে ধরে ছিলাম,

যাকে আমি কখনো সত্যিই চিনতেই পারিনি?"

সেদিন রাতে সে ওজু করে নামাজে দাঁড়াল।

সিজদায় গিয়ে অনেকক্ষণ নীরব থাকল।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

"হে আল্লাহ...

আমি অনেক কিছু বুঝিনি।

মানুষকে দেখে বিশ্বাস করেছি।

কিন্তু আপনি আমার জন্য যা গোপন রেখেছিলেন,

আজ তার কিছুটা দেখালেন।

আলহামদুলিল্লাহ।

আপনি আমাকে এমন একটি পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন,

যার শেষ হয়তো আরও অন্ধকার ছিল।"

সেই রাতে তার চোখে আবারও পানি এসেছিল।

তবে সেই কান্না আগের মতো অসহায়তার ছিল না।

সেটি ছিল কৃতজ্ঞতার কান্না।

কারণ সে বুঝতে শুরু করেছিল—

কখনো কখনো আল্লাহ মানুষের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটি কেড়ে নেন,

শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়,

বরং আরও বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য।

তবুও...

হৃদয় তো যুক্তির নিয়ম মানে না।

সব সত্য জেনে যাওয়ার পরও,

রাতের নীরবতায় সেই মানুষটির স্মৃতি এখনও ফিরে আসত।

কোনো পুরোনো ছবি...

কোনো পরিচিত গান...

কোনো নির্জন রাস্তা...

হঠাৎ করেই তাকে আবার অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেত।

সে তখন শুধু চোখ বন্ধ করে একটি কথাই বলত—

"হে আল্লাহ...

আমার হৃদয়কে আপনার দিকে ফিরিয়ে দিন।

মানুষের দিকে নয়।"
25 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব