ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২৪তম পর্ব

শেষ কথার ওপারেঃ


কখনো কখনো একটি ফোনকলই মানুষের পুরো জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়।

এক ভাগে থাকে স্বপ্ন।

অন্য ভাগে থাকে বাস্তবতা।

সেদিনের ফোনকলও ঠিক তেমনই ছিল।

ওপাশে ছিল সেই পরিচিত কণ্ঠ।

একসময় যে কণ্ঠ শুনে তার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যেত।

আজ সেই কণ্ঠই অচেনা লাগছিল।

ছেলেটি কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ধীরে বলল,

"আমি শুধু একটা সত্য জানতে চাই।"

ওপাশ থেকেও কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

দুজনেই যেন শব্দ খুঁজছিল।

অনেক দিনের জমে থাকা নীরবতা ভাঙা এত সহজ ছিল না।

সে আবার বলল,

"সবাই অনেক কিছু বলছে।

আমি কাউকে বিশ্বাস করতে চাই না।

আমি শুধু তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।

তোমার সিদ্ধান্ত কী?"

মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর খুব শান্ত গলায় বলল,

"আমি আর তোমাকে বিয়ে করব না।"

এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা যেন থেমে গেল।

ছেলেটির মনে হলো—

সে ঠিক শুনতে পারেনি।

সে আবার জিজ্ঞেস করল,

"কী বললে?"

একই উত্তর।

আরও স্পষ্টভাবে।

"আমি তোমাকে বিয়ে করব না।"

তার গলায় কোনো রাগ ছিল না।

কোনো কান্নাও ছিল না।

ছিল শুধু অদ্ভুত এক দূরত্ব।

ছেলেটি অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারল না।

তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল অসংখ্য স্মৃতি।

প্রথম পরিচয়।

হাসপাতালের সেই দিন।

সারারাত জেগে থাকা।

পার্কে বসে গল্প করা।

হাতে হাত রাখা।

রিসোর্টের সেই বিকেল।

১০১ টাকা মহরের কথা।

এক কাপড়ে থাকার প্রতিশ্রুতি।

সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়ছিল।

সে কাঁপা গলায় বলল,

"তুমি কি নিজের ইচ্ছায় বলছ?"

"হ্যাঁ।"

"তোমাকে কেউ চাপ দিচ্ছে না তো?"

"না।"

"তুমি কি সব ভুলে গেছ?"

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর উত্তর এল,

"তুমি আমার আম্মুর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছ।

আমি এটা মেনে নিতে পারিনি।"

এই উত্তর শুনে সে চোখ বন্ধ করল।

তার নিজের সেই কঠিন কথাটি মনে পড়ে গেল।

যে কথাটি সে রাগের মাথায় বলেছিল।

আজও সে জানত—

সেই কথাটি বলা তার উচিত হয়নি।

সে ধীরে বলল,

"আমি ভুল করেছি।

আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।

তোমার আম্মুর কাছেও ক্ষমা চাইব।

কিন্তু একটা ভুলের জন্য কি সব শেষ হয়ে যাবে?"

মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না।

সে আবার বলল,

"আমি তো তোমার জন্যই সব সহ্য করেছি।

নিজের পরিবারকে রাজি করিয়েছি।

নিজেকে বদলেছি।

আজ তুমি শুধু একবার বলো—

তুমি সত্যিই আর আমাকে চাও না?"

অনেকক্ষণ পর মেয়েটি বলল,

"একটা শর্ত আছে।"

ছেলেটি যেন নতুন করে আশার আলো দেখল।

সে তাড়াতাড়ি বলল,

"কী শর্ত?"

ওপাশ থেকে ধীরে ধীরে কথাগুলো ভেসে এল।

"মহরানা হবে পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকা।"

সে চুপ করে রইল।

মেয়েটি আবার বলল,

"দশ তোলা স্বর্ণ দিতে হবে।"

আরও একটি বিরতি।

"সবকিছু কাগজে লিখে দিতে হবে।

তারপর...

দুই বছর পরে বিয়ে হবে।"

ছেলেটি যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না।

কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটি বলেছিল—

"আমি বিয়ে করব না।"

সেই মানুষই এখন এমন সব শর্ত দিচ্ছে,

যার সঙ্গে তার পরিচিত মানুষটার কোনো মিল নেই।

তার মনে পড়ে গেল—

একদিন এই মেয়েটিই হেসে বলেছিল,

"আমার ১০১ টাকা মহর হলেই হবে।"

আরও বলেছিল,

"তোমার যদি কিছুই না থাকে,

তবুও আমি থাকব।"

আজ সেই মানুষটির মুখেই কোটি টাকার স্বপ্নের মতো শর্ত।

সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

"এগুলো কি তোমার নিজের কথা?"

মেয়েটি বলল,

"এটাই আমার সিদ্ধান্ত।"

এই উত্তর শোনার পর তার বুকের ভেতরের শেষ আশাটুকুও যেন নিভে গেল।

অনেক দিন আগে এলাকার কয়েকজন মানুষ কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

তখন সে বিশ্বাস করেনি।

কারণ ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়।

আজ সে আর তর্ক করল না।

শুধু শান্ত গলায় বলল,

"আমি তোমাকে অন্যরকম মানুষ ভেবেছিলাম।

হয়তো ভুল ভেবেছিলাম।"

ওপাশে নীরবতা।

তারপর কথার ভেতর তিক্ততা ঢুকে পড়ল।

দুজনেই আবেগের বশে এমন কিছু কথা বলল,

যা হয়তো না বললেও চলত।

শেষ পর্যন্ত মেয়েটির মা ফোনটি হাতে নিলেন।

তার কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল।

তিনি বললেন,

"যা হয়েছে, হয়েছে।

তোমার যদি কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে,

আমরা তা পূরণ করার চেষ্টা করব।"

ছেলেটি উত্তর দিল না।

তার ভেতরে তখন আর কোনো অভিযোগও ছিল না।

শুধু গভীর এক শূন্যতা।

ফোন কেটে গেল।

সে অনেকক্ষণ একই জায়গায় বসে রইল।

চারপাশে মানুষ চলাফেরা করছে।

গাড়ির শব্দ।

আজানের ধ্বনি।

সবকিছু স্বাভাবিক।

কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছিল—

পৃথিবীটা যেন হঠাৎ থেমে গেছে।

সেদিন প্রথমবার সে বুঝল,

কখনো কখনো একটি সম্পর্ক শেষ হয় বিচ্ছেদ দিয়ে নয়।

শেষ হয়—

যখন মানুষটি আর সেই মানুষটি থাকে না,

যাকে একদিন ভালোবেসেছিল।

আর সেই দিন থেকেই তার ভেতরে একটি নতুন যুদ্ধ শুরু হলো।

ভালোবাসার জন্য নয়।

নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়ার জন্য।
26 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব