ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১৭তম পর্ব

শেষ দেখা নয়, শেষের শুরুঃ


মানুষ যখন খুব বেশি সুখী থাকে, তখন সে বুঝতে পারে না— দুঃখ ঠিক কতটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

সেই সময়টায় তাদের জীবনও বাইরে থেকে স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল।

কথা হচ্ছিল।

ভালোবাসা ছিল।

বিশ্বাস ছিল।

কিন্তু অদৃশ্যভাবে তাদের চারপাশে একটি বৃত্ত তৈরি হচ্ছিল।

যার ভেতরে ধীরে ধীরে আটকে যাচ্ছিল দুটি জীবন।

মেয়েটির পরিবার এখন আর তাকে একা কোথাও যেতে দিত না।

বাজারে গেলেও কেউ না কেউ সঙ্গে থাকত।

স্কুলে গেলেও নজর রাখা হতো।

ফোনও আগের মতো ব্যবহার করতে পারত না।

অনেক সময় রাতের পর রাত শুধু একটি ছোট্ট বার্তা পাঠানোর সুযোগ হতো।

"ভালো আছো?"

উত্তরে আসত—

"আলহামদুলিল্লাহ।"

এই দুটি শব্দেই তারা দিনের খবর বুঝে নিত।

একদিন বিকেলে হঠাৎ তার ফোন এল।

কণ্ঠে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।

"আজ দেখা করতে পারবে?"

সে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

"কোথায়?"

"বাজারে।

মাত্র দশ মিনিট।"

সে রাজি হলো।

সময়মতো বাজারে পৌঁছে দেখল—

মেয়েটি আগের মতো হাসছে না।

চোখের নিচে কালচে দাগ।

মুখে ক্লান্তি।

সে জিজ্ঞেস করল,

"শরীর খারাপ?"

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

"শরীর না...

মন।"

দুজনেই রাস্তার পাশের একটি ছোট দোকানে বসল।

এক কাপ চা।

এক প্লেট নাস্তা।

কিন্তু কারও খাওয়ার দিকে মন নেই।

মেয়েটি হঠাৎ বলল,

"তুমি কি কখনো আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?"

সে অবাক হয়ে তাকাল।

"এমন কথা কেন বলছ?"

"এমনিই জানতে ইচ্ছে করল।"

সে হাসল।

"তুমি যদি নিজে না যাও, আমি কোথাও যাব না।"

মেয়েটি নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

"প্রতিশ্রুতি?"

সে নিজের ডান হাত বাড়িয়ে দিল।

"প্রতিশ্রুতি।"

মেয়েটিও হাত বাড়িয়ে দিল।

দুটি হাত কয়েক মুহূর্তের জন্য এক হয়ে রইল।

চারপাশে অসংখ্য মানুষ চলাফেরা করছিল।

কেউ তাদের চিনল না।

কেউ বুঝল না—

এই ছোট্ট মুহূর্তটাই হয়তো একদিন স্মৃতির সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে থাকবে।

সেদিন বিদায় নেওয়ার আগে মেয়েটি একটি ছোট্ট প্যাকেট তার হাতে দিল।

"এটা কী?"

"বাসায় গিয়ে খুলবে।"

সে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।

বাড়ি ফিরে প্যাকেট খুলতেই দেখল—

দুটি ছোট পারফিউম।

সঙ্গে একটি কাগজ।

তাতে লেখা—

"তুমি যখনই এটা ব্যবহার করবে, মনে করবে আমি তোমার পাশেই আছি।"

সে অনেকক্ষণ কাগজটার দিকে তাকিয়ে ছিল।

তারপর খুব যত্ন করে সেটি ডায়েরির ভেতর রেখে দিল।

এরপর থেকে তাদের দেখা আরও কমে গেল।

কখনো এক সপ্তাহ।

কখনো দশ দিন।

কখনো তারও বেশি।

তবু ভালোবাসা কমেনি।

বরং অপেক্ষা বেড়েছে।

এই সময়টায় ছেলেটি নিজের ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে আবার কাজ শুরু করার চেষ্টা করছিল।

খাতা খুলে হিসাব লিখত।

কিছু পরিকল্পনা করত।

আবার হঠাৎ থেমে যেত।

কারণ কিছুক্ষণ পরই ফোন বেজে উঠত।

ওপাশে সেই পরিচিত কণ্ঠ।

"আজ খুব মন খারাপ।"

তখন সব কাজ ফেলে সে শুধু শুনত।

মাঝে মাঝে কোনো সমাধান থাকত না।

তবু সে শুনত।

কারণ অনেক সময় মানুষ সমাধান চায় না।

চায় শুধু একজন মানুষ, যে বিচার না করে তার কথা শুনবে।

একদিন রাতে মেয়েটি হঠাৎ বলল,

"যদি কোনো দিন সবাই আমাকে তোমার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়?"

সে বিন্দুমাত্র দেরি না করে বলল,

"আমি বিশ্বাস করব না।"

"যদি আমি নিজেই কিছু বলি?"

সে হেসে উত্তর দিল,

"তবুও বিশ্বাস করব না।

কারণ আমি তোমাকে চিনি।"

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর খুব ধীরে একটি বাক্য ভেসে এল—

"সব সময় এমনই থেকো।"

সে জানত না—

জীবন কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে শক্ত বিশ্বাসকেও পরীক্ষা করে।

আর সেই পরীক্ষায় অনেক উত্তর মুখস্থ থাকলেও,

বাস্তবের প্রশ্নপত্র সম্পূর্ণ আলাদা হয়।

সেদিনের সেই ছোট্ট দেখা,

দুটি পারফিউম,

আর হাতের ওপর রাখা সেই প্রতিশ্রুতি—

পরে বহু রাত তার ঘুম কেড়ে নেবে।

কারণ মানুষ যখন চলে যায়,

সে শুধু নিজের উপস্থিতিই নিয়ে যায় না—

ফেলে যায় কিছু গন্ধ,

কিছু শব্দ,

কিছু অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি,

যেগুলো বছরের পর বছর ধরে একজন মানুষকে একা কাঁদাতে পারে।

আর তাদের গল্পেও...

শেষ দেখা তখনও হয়নি।

কিন্তু শেষের শুরু হয়ে গিয়েছিল।

অদৃশ্যভাবে।

নিঃশব্দে।

ঠিক যেমন দূরের আকাশে জমতে থাকা কালো মেঘ—

যার শব্দ শোনা যায় না,

কিন্তু একসময় পুরো পৃথিবীকে ভিজিয়ে দেয়।
21 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব