ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২২তম পর্ব

বাবার ফিরে আসাঃ


পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন—

যাদের ভালোবাসা আমরা তখনই বুঝি,

যখন আমরা নিজেরাই ভেঙে পড়ি।

ছেলেটির জীবনে সেই মানুষটি ছিলেন তার বাবা।

তিনি খুব বেশি কথা বলতেন না।

ভালোবাসাও প্রকাশ করতেন না।

কিন্তু সেই নীরব মানুষটিই একদিন প্রমাণ করেছিলেন—

একজন বাবার ভালোবাসার গভীরতা শব্দ দিয়ে মাপা যায় না।

পরদিন সকাল।

নানাবাড়ির ঘরে ঘুম ভাঙতেই ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে ভেসে উঠল বাবার নাম।

ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠে একটি প্রশ্ন।

"কোথায় আছিস?"

"নানাবাড়িতে।"

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর শুধু একটি বাক্য।

"বাড়িতে চলে আয়।"

কণ্ঠটা খুব স্বাভাবিক ছিল।

কিন্তু কোথায় যেন অদ্ভুত এক ক্লান্তি লুকিয়ে ছিল।

ফোন রেখে সে ভাবল—

বাবা নিশ্চয়ই বিদেশ থেকেই কথা বলছেন।

তার ধারণাই ছিল না,

সবকিছু বদলে গেছে।

কিছুক্ষণ পর মামা ধীরে ধীরে বললেন,

"তোর বাবা দেশে চলে এসেছে।"

সে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না।

"কখন?"

"গতকাল।"

"এত তাড়াতাড়ি?"

মামা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"তোর খবর শোনার পর আর থাকতে পারেনি।"

ছেলেটি নিশ্চুপ হয়ে গেল।

মনে পড়ল—

বাবার হার্টে একাধিকবার বড় চিকিৎসা হয়েছে।

ডাক্তার তাকে বিশ্রামে থাকতে বলেছিলেন।

তবু সেই মানুষটাই সবকিছু ফেলে ছুটে এসেছেন।

কার জন্য?

একজন ছেলের জন্য—

যে নিজের কষ্টে অন্ধ হয়ে বুঝতেই পারেনি,

তার ভাঙনের চেয়েও বড় কষ্ট নিয়ে একজন বাবা বেঁচে আছেন।

বিকেলের দিকে সে বাড়ি ফিরল।

বাড়ির উঠানে পা রাখতেই বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।

সবকিছু চেনা।

তবুও সবকিছু অচেনা লাগছিল।

ঘরের ভেতরে ঢুকে শুনল—

বাবা ঘুমাচ্ছেন।

সে দরজার সামনে চুপচাপ বসে রইল।

কিছুক্ষণ পর বাবা ঘুম থেকে উঠলেন।

ধীরে ধীরে বাইরে এলেন।

মুখে ক্লান্তির ছাপ।

চোখের নিচে গভীর কালি।

মনে হচ্ছিল,

কয়েক দিনের মধ্যে মানুষটি যেন অনেক বছর বুড়ো হয়ে গেছেন।

ছেলেটি উঠে দাঁড়াল।

ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সালাম করল।

বাবা মাথায় হাত রাখলেন।

একটি শব্দও বললেন না।

ঠিক সেই মুহূর্তেই সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

হঠাৎ বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

তারপর শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করল।

অনেক দিন ধরে জমে থাকা কান্না যেন একসঙ্গে বেরিয়ে এল।

সে শুধু বলছিল,

"আব্বু...

আমি পারিনি...

আমি সব নষ্ট করে ফেলেছি..."

বাবা কিছু বলছিলেন না।

শুধু ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।

তার নিজের চোখও ভিজে উঠেছিল।

একজন বাবা হয়তো সন্তানের সব ব্যথা দূর করতে পারেন না।

কিন্তু তিনি এমন একটি কাঁধ দিতে পারেন,

যেখানে মাথা রাখলে মানুষ আবার বাঁচতে ইচ্ছে করে।

সেদিন রাতে বাবা ছেলেকে নিজের পাশে বসালেন।

অনেকক্ষণ নীরবে বসে থাকার পর বললেন,

"একটা মেয়ের জন্য জীবন থেমে থাকে না।"

ছেলেটি মাথা নিচু করে রইল।

বাবা আবার বললেন,

"তুই এখন কিছুই ভাববি না।

আগে নিজেকে সামলাস।"

ছেলেটি ধীরে বলল,

"আমি ওকে ছাড়া পারব না।"

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তারপর খুব শান্তভাবে বললেন,

"আমি চেষ্টা করব।

যদি আল্লাহ চায়, সব ঠিক হবে।

কিন্তু যদি না হয়...

তাহলে একটা কথা মনে রাখবি।"

ছেলেটি তাকাল।

"মানুষকে হারিয়ে জীবন শেষ হয় না।

জীবন শেষ হয়, যখন মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে।"

কথাগুলো তার হৃদয়ে গিয়ে লাগল।

তবুও সে তখনও ছাড়তে পারেনি।

কারণ ভালোবাসা কখনো যুক্তির ভাষা বোঝে না।

পরদিন সকালে বাবা আবার তাকে ডাকলেন।

দুজন বারান্দায় বসে ছিলেন।

সকালের রোদ উঠেছে।

পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে।

বাবা বললেন,

"আমি কথা দিয়েছি, আমি চেষ্টা করব।

তোর জন্য যতটুকু করা সম্ভব, করব।"

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন,

"কিন্তু যদি সব চেষ্টা করার পরও কিছু না হয়...

তাহলে আর পিছনে তাকাবি না।

নিজের জীবন নতুন করে শুরু করবি।"

এই কথাগুলো বলার সময় বাবার কণ্ঠ কেঁপে উঠেছিল।

কারণ তিনি জানতেন,

এই কথাগুলো বলা যত সহজ,

মেনে নেওয়া ততটা সহজ নয়।

সেদিন প্রথমবার ছেলেটি বুঝতে পারল—

তার ভাঙনের কারণে শুধু সে একা কষ্ট পায়নি।

তার মা কেঁদেছেন।

তার পরিবার রাত জেগেছে।

আর একজন অসুস্থ বাবা,

নিজের সব দায়িত্ব ফেলে,

শুধু ছেলেকে বাঁচানোর জন্য হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে দেশে ফিরেছেন।

সেদিন রাতে সে দীর্ঘ সময় সিজদায় ছিল।

কোনো অভিযোগ করেনি।

কোনো দাবি করেনি।

শুধু একটি দোয়া করেছিল—

"হে আল্লাহ...

যদি এই সম্পর্ক আমার জন্য কল্যাণের হয়,

তাহলে সহজ করে দিন।

আর যদি না হয়,

তাহলে আমাকে তা মেনে নেওয়ার শক্তি দিন।"

সে জানত না,

এই দোয়ার উত্তর খুব শিগগিরই সে পেতে চলেছে।

কিন্তু সেই উত্তর—

তার কল্পনার চেয়েও কঠিন হবে।
23 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব