নীরবতার দিনগুলোঃ
সেদিনের ঘটনার পর পৃথিবীটা যেন হঠাৎ বদলে গেল।
আগে তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত।
এখন কথা হতো— আদৌ কথা বলা যাবে কি না।
আগে একটি দিন কথা না হলে দুজনেরই অস্থির লাগত।
এখন একটি ফোনের অপেক্ষায় পুরো দিন কেটে যেত।
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে ছেলেটি অনেকক্ষণ নিজের ঘরে একা বসে ছিল।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল সেই দৃশ্য—
কাঁদতে কাঁদতে বলা একটি বাক্য।
"আমাকে নিয়ে চলে যাও..."
আর নিজের উত্তর।
"না। আমি তোমাকে নিয়ে পালাব না।"
তার বুকের ভেতর প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল।
তবুও তার মনে কোনো অনুশোচনা ছিল না।
কারণ সে বিশ্বাস করত—
যে ভালোবাসা আল্লাহর সন্তুষ্টির বাইরে গিয়ে শুরু হয়, সেই ভালোবাসার শেষও কখনো সুন্দর হয় না।
পরদিন দুপুরে হঠাৎ একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল।
ওপাশে মেয়েটির মা।
গতকালের তুলনায় তার কণ্ঠ অনেক শান্ত।
তিনি বললেন,
"আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
ছেলেটি চুপচাপ শুনছিল।
"কিছুদিন ওর মোবাইল থাকবে না।"
সে কিছু বলল না।
ভদ্রমহিলা আবার বললেন,
"তবে প্রতিদিন আমার ফোন থেকে দশ-পনেরো মিনিট কথা বলতে দেব।"
এই কথাটা শুনে তার বুক থেকে যেন একটা পাথর নেমে গেল।
কমপক্ষে সে জানবে—
মেয়েটি ভালো আছে।
সেদিন রাতেই প্রথম কথা হলো।
সময় খুব কম।
কথাও খুব সীমিত।
তবুও সেই কয়েক মিনিট যেন অনেক বড় আশীর্বাদ মনে হচ্ছিল।
মেয়েটি শুধু একটি কথাই বলল,
"আমি তোমাকে খুব মিস করি।"
সে মৃদু হেসে বলল,
"ধৈর্য ধরো।
সব ঠিক হবে, ইনশাআল্লাহ।"
কিন্তু কথার মাঝেই সে বুঝতে পারল—
মেয়েটির কণ্ঠে আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই।
মনে হচ্ছে, অনেক কেঁদেছে।
অনেক কিছু চেপে রেখেছে।
এভাবে কয়েক দিন কেটে গেল।
প্রতিদিন একই সময়।
একই ফোন।
একই অপেক্ষা।
আর প্রতিবার বিদায়ের আগে একই বাক্য।
"আল্লাহ হাফেজ।"
এই দুটি শব্দ বলার সময় দুজনেই জানত—
আসলে কেউই ফোন রাখতে চাইছে না।
কয়েক দিন পর মেয়েটি আবার নিজের মোবাইল ফিরে পেল।
তবে আগের মতো স্বাধীনতা আর ছিল না।
লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলতে হতো।
অনেক সময় মাঝপথেই ফোন কেটে দিতে হতো।
কখনো হঠাৎ অফলাইন হয়ে যেত।
তবুও তারা মানিয়ে নিয়েছিল।
কারণ ভালোবাসা মানুষকে অপেক্ষা করতে শেখায়।
এর মধ্যেই এসে গেল মেয়েটির জন্মদিন।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ছেলেটি অনেকক্ষণ ভাবছিল—
কী উপহার দেওয়া যায়?
তার নিজের অবস্থাও খুব ভালো ছিল না।
ব্যবসার পরিকল্পনা একের পর এক ভেঙে যাচ্ছে।
টাকা নেই।
তবুও মন চাইছিল—
আজকের দিনটা যেন অন্যরকম হয়।
কিন্তু বাস্তবতা সব ইচ্ছার পাশে দাঁড়ায় না।
সারাদিন তাদের তেমন কথা হলো না।
বিকেলের দিকে হঠাৎ ফোন এল।
মেয়েটির কণ্ঠে একটু হাসি।
"আজ আমার জন্মদিন।"
সে হেসে বলল,
"আমি ভুলিনি।"
"জানি।"
"কী করলে আজ?"
"মামা কেক পাঠিয়েছেন।
ফুলও দিয়েছেন।"
ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার ইচ্ছে হচ্ছিল—
আজ সে-ই ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।
নিজ হাতে শুভেচ্ছা জানাবে।
কিন্তু সে অনেক দূরে।
শুধু নীরব শুভকামনাই পাঠাতে পারল।
রাতে দীর্ঘক্ষণ কথা হলো।
মেয়েটি বলল,
"কাল আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে বিয়ে আছে।"
তার কণ্ঠে অদ্ভুত এক দ্বিধা ছিল।
সে জিজ্ঞেস করল,
"যেতে ইচ্ছে করছে?"
মেয়েটি ধীরে বলল,
"না।"
"তাহলে?"
"মা যেতে বলছে।"
সে কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল,
"সিদ্ধান্ত তোমার।
যদি মনে হয় নিরাপদ থাকবে, যাও।
আর যদি মনে হয় অস্বস্তি হবে—
তাহলে কোনো অজুহাতে থেকে যাও।"
মেয়েটি শুধু বলল,
"দেখি কী হয়।"
পরদিন সকালটা অদ্ভুত নীরব ছিল।
তাদের তেমন কথা হয়নি।
সে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছিল।
কিছু কাগজপত্র গুছাচ্ছিল।
নতুন ব্যবসার পরিকল্পনা লিখছিল।
কিন্তু বারবার মন চলে যাচ্ছিল ফোনের দিকে।
বিকেলের পর একটি ছোট্ট বার্তা এল।
"আমরা রওনা দিয়েছি।"
সে শুধু লিখল,
"সাবধানে থেকো।"
তারপর...
নীরবতা।
এক দিনের।
দুই দিনের।
তারপর আরও কিছু সময়।
এই নীরবতার ভেতরেই অদৃশ্যভাবে বদলে যেতে শুরু করছিল অনেক কিছু।
যা তখনও কেউ বুঝতে পারেনি।
ছেলেটি শুধু অপেক্ষা করছিল—
যেমন সে সব সময় করত।
কিন্তু সে জানত না,
এই অপেক্ষার শেষে যে মানুষটির কণ্ঠ শুনবে,
সেই কণ্ঠে আগের মতো ভালোবাসা থাকবে না।
থাকবে প্রশ্ন।
থাকবে সন্দেহ।
আর থাকবে এমন কিছু সত্য,
যা তার পুরো জীবনকে আবারও একবার ভেঙে দেবে।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১৯তম পর্ব
19
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই