ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১৫তম পর্ব

একশ এক টাকার স্বপ্নঃ


ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর সময় হয়তো সেই সময়, যখন ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত, কিন্তু বিশ্বাস অটুট থাকে।

সেই সময়টাতেই মানুষ সবচেয়ে বড় স্বপ্ন দেখে।

আর সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে।

সেদিন রাতেও তাদের কথা হচ্ছিল একেবারে সাধারণ কিছু বিষয় নিয়ে।

দিন কেমন গেল...

খাওয়া হয়েছে কি না...

ওষুধ ঠিকমতো খেয়েছে কি না...

নামাজ পড়েছে কি না...

এই ছোট ছোট কথাগুলোই ধীরে ধীরে তাদের প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে উঠেছিল।

অনেকক্ষণ কথা বলার পর হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও চোখে পড়ল।

ভিডিওটির বিষয় ছিল— মহরানা।

ভিডিওটি শেষ হতেই ছেলেটি হেসে বলল,

"একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"

মেয়েটি বলল,

"করো।"

"তুমি কত টাকা মহর চাও?"

প্রশ্নটা শুনে সে হেসে ফেলল।

"হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?"

"এমনিই জানতে ইচ্ছে করল।"

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

"তুমি যতটা পারবে।"

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

"না।

এভাবে হবে না।

একটা সংখ্যা বলো।"

আবার নীরবতা।

মনে হচ্ছিল, মেয়েটি যেন সত্যিই ভাবছে।

কিছুক্ষণ পরে খুব আস্তে বলল,

"একশ এক টাকা।"

ছেলেটি ভেবেছিল সে হয়তো মজা করছে।

সে হেসে বলল,

"এত কম?"

মেয়েটি গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল,

"হ্যাঁ।"

"কিন্তু কেন?"

"কারণ আমি টাকার জন্য তোমাকে চাই না।"

এই একটি বাক্য শুনে ছেলেটি অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।

তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নিল।

এমন উত্তর সে কল্পনাও করেনি।

সে বলল,

"আমি চাইলে তো আরও বেশি দিতে পারব।"

মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,

"তুমি যতই দাও, সেটা তোমার ইচ্ছা।

কিন্তু আমার চাওয়া একশ এক টাকা।"

"এত অল্প কেন?"

"কারণ আমার কাছে মহর বড় না।

মানুষটা বড়।"

ছেলেটি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

রাতের আকাশে অসংখ্য তারা।

তার মনে হচ্ছিল—

আজ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ সে-ই।

যার কাছে টাকা নেই।

বড় চাকরি নেই।

নিজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাও নেই।

তবু কেউ একজন তাকে শুধু মানুষ হিসেবে ভালোবেসেছে।

সে ধীরে ধীরে বলল,

"আমি তো এখনো কিছুই হতে পারিনি।"

মেয়েটি উত্তর দিল,

"একদিন হবে।"

"যদি না হই?"

"তবুও থাকবে।"

"যদি সারাজীবন কষ্ট করতে হয়?"

"করব।"

"যদি ছোট্ট একটা ভাড়া বাসায় থাকতে হয়?"

"থাকব।"

"যদি কোনো দিন শুধু ডাল-ভাত খেয়ে থাকতে হয়?"

মেয়েটি হেসে বলল,

"তাহলে ডাল-ভাতই খাব।"

সে আবার জিজ্ঞেস করল,

"তুমি কখনো আফসোস করবে না?"

মেয়েটির উত্তর ছিল খুব ছোট।

কিন্তু গভীর।

"তোমাকে পেলে কোনো দিন না।"

সেই উত্তর শুনে ছেলেটির চোখ ভিজে উঠেছিল।

সে দ্রুত বিষয়টা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল।

কারণ সে চাইছিল না—

মেয়েটি তার চোখের পানি বুঝে ফেলুক।

সেদিন রাতে তারা অনেকক্ষণ ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছিল।

ছেলেটি বলেছিল,

"আমি বিদেশে যেতে চাই না।

আমি এই দেশেই থাকতে চাই।

এখানেই ব্যবসা করব।

যদি সফল হই, মানুষের জন্য আরও বেশি কাজ করতে পারব।"

মেয়েটি বলেছিল,

"আমি তোমার সব সিদ্ধান্তে পাশে থাকব।"

"ব্যবসা শুরু করলে যদি প্রথম কয়েক বছর লোকসান হয়?"

"তাহলে আবার নতুন করে শুরু করব।"

"যদি সবাই বলে আমি ব্যর্থ?"

"তাহলে আমি বলব—

তুমি চেষ্টা করছ।"

সে হাসল।

"তুমি এত বিশ্বাস করো কীভাবে?"

মেয়েটি বলল,

"কারণ আমি তোমার স্বপ্ন দেখেছি।

যে মানুষ নিজের জন্য নয়, মানুষের জন্য বাঁচতে চায়—

আল্লাহ তাকে একদিন না একদিন সফল করেই দেন।"

সেই কথাগুলো তার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে বসেছিল।

সে ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি করত ক্ষমতার জন্য নয়।

মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

তার নিজের কাছে টাকা ছিল না।

অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও কারও চিকিৎসা করাতে পারত না।

কারও পড়াশোনার খরচ দিতে পারত না।

তবু মানুষের সমস্যা শুনে খালি হাতে ফিরে আসতে তার কষ্ট হতো।

সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল—

একদিন ব্যবসায় সফল হবে।

নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

মেয়েটি সেই স্বপ্নের কথা জানত।

আর প্রতিবারই বলত,

"তুমি পারবে।"

সেদিনের রাতটা ছিল খুব শান্ত।

কোনো ঝগড়া ছিল না।

কোনো ভুল বোঝাবুঝি ছিল না।

ছিল শুধু বিশ্বাস।

অগাধ বিশ্বাস।

একজন আরেকজনের ওপর।

জীবনের ওপর।

আর ভবিষ্যতের ওপর।

ছেলেটি ঘুমানোর আগে ডায়েরিতে একটি লাইন লিখেছিল—

"মানুষ যদি টাকার জন্য ভালোবাসে, সে একদিন টাকা বেছে নেবে। কিন্তু মানুষ যদি মানুষকে ভালোবাসে, তাহলে পৃথিবীর কোনো সম্পদ সেই ভালোবাসাকে হারাতে পারবে না।"

সেদিন সে জানত না—

একদিন ঠিক এই বিশ্বাসটাই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।

একদিন...

এই একশ এক টাকার স্বপ্ন আর বাস্তবের দাবির মাঝে দাঁড়িয়ে তাকে এমন এক সত্যের মুখোমুখি হতে হবে,

যা তার জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দেবে।
23 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব