ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১৩ তম পর্ব

একটি ছবি, হাজার ঝড়ঃ


অনেক সময় মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ কোনো বড় ভুল থেকে আসে না।

আসে একটি ছোট্ট অসাবধানতা থেকে।

একটি ছবি।

একটি মুহূর্ত।

একটি ক্লিক।

আর তারপর সবকিছু বদলে যায়।

রিসোর্ট থেকে ফিরে দুজনেই খুব ক্লান্ত ছিল।

সারাদিনের ঘোরাঘুরি, দীর্ঘ পথ, অগণিত গল্প—সব মিলিয়ে শরীর অবসন্ন হয়ে পড়েছিল।

রাতে কথা হয়েছিল খুব অল্প সময়।

মেয়েটি বলেছিল,

"আজকের দিনটা আমি কোনো দিন ভুলব না।"

সে উত্তর দিয়েছিল,

"আমিও না।"

তারপর দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

পরদিন তারা কেউ কোথাও বের হয়নি।

সে নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল।

ব্যবসার নতুন কিছু পরিকল্পনা লিখছিল।

কীভাবে অল্প পুঁজিতে শুরু করা যায়, সেই হিসাব করছিল।

রাজনীতির ব্যস্ততার মাঝেও সে ভবিষ্যতের জন্য কিছু একটা দাঁড় করাতে চাইছিল।

তার বিশ্বাস ছিল—

নিজের পায়ে না দাঁড়ালে মানুষের জন্যও বড় কিছু করা যায় না।

অন্যদিকে মেয়েটিও নিজের বাসায় ছিল।

সেদিন বিকেলের দিকে সে হঠাৎ একটি ছবি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ট্যাটাসে দিল।

ছবিটি খুব সাধারণ ছিল।

দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

কোনো আপত্তিকর ভঙ্গি নয়।

শুধু দুটি হাসিমুখ।

তাদের কাছে ছবিটি ছিল একটি সুন্দর স্মৃতি।

কিন্তু সমাজ সব ছবি একভাবে দেখে না।

স্ট্যাটাস দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ছবিটি একজন আত্মীয়ের চোখে পড়ে।

সে কিছু না বলে ছবিটির স্ক্রিনশট রেখে দেয়।

তারপর সেটি আরেকজনের কাছে যায়।

সেখান থেকে আরেকজনের কাছে।

একটি ছবি যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

প্রথমে কেউ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি।

জিজ্ঞেস করা হলে মেয়েটি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।

হেসে বলেছিল,

"ছবিটা আসল না।"

কিন্তু সত্য বেশিক্ষণ লুকিয়ে থাকে না।

পরদিন পরিবারের আরও কয়েকজন ছবিটি দেখে নিশ্চিত হয়ে গেল—

ছবির মানুষটি বাস্তব।

আর তাদের সম্পর্কও সাধারণ পরিচয়ের চেয়ে অনেক বেশি।

সেদিন দুপুরে ছেলেটির ফোন বেজে উঠল।

অচেনা একটি নম্বর।

ফোন ধরতেই ভদ্রমহিলার কণ্ঠ।

তিনি নিজেকে মেয়েটির ফুফু হিসেবে পরিচয় দিলেন।

কণ্ঠে রাগ ছিল না।

বরং ছিল উদ্বেগ।

তিনি শান্তভাবে বললেন,

"তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।"

সে বিনয়ের সঙ্গে বলল,

"জি, বলুন।"

তারপর দীর্ঘ সময় ধরে কথা হলো।

ভদ্রমহিলা জানতে চাইলেন—

সম্পর্কের শুরু কীভাবে?

উদ্দেশ্য কী?

ছেলেটি কোনো কিছু লুকাল না।

সে পরিষ্কারভাবে বলল,

"আমার উদ্দেশ্য খারাপ নয়।

আমি তাকে সম্মান করি।

আর যদি আল্লাহ চান, ভবিষ্যতে পরিবারের সম্মতিতেই সম্পর্ককে হালাল পথে নিয়ে যেতে চাই।"

ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।

তারপর বললেন,

"পরিস্থিতি এখন খুব কঠিন।

পরিবার সব জেনে গেছে।"

সে বুঝতে পারল—

আজ থেকে আর কিছুই আগের মতো থাকবে না।

সেদিন বিকেলে মেয়েটির সঙ্গে খুব অল্প সময় কথা হয়েছিল।

তার কণ্ঠ কাঁপছিল।

সে বলল,

"সবাই জেনে গেছে।"

ছেলেটি শান্ত থাকার চেষ্টা করল।

"ভয় পেও না।

মিথ্যা বলো না।

যা সত্য, সেটাই বলো।"

মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে বলল,

"আমার খুব ভয় করছে।"

সে শুধু বলল,

"আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।"

সেদিন রাতটা দুজনের কারও ভালো কাটেনি।

সে বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিল।

কোনো নতুন খবর আসে কি না।

কোনো সমস্যা হয়েছে কি না।

এদিকে মেয়েটির পরিবারেও আলোচনা চলছিল।

অনেক প্রশ্ন।

অনেক সন্দেহ।

অনেক রাগ।

আর সেই সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল দুটি তরুণ হৃদয়—

যারা শুধু একে অপরকে ভালোবেসেছিল।

কিন্তু সমাজ ভালোবাসার আগে পরিচয় জানতে চায়।

পরিবার জানতে চায়।

ভবিষ্যৎ জানতে চায়।

সেই রাতেই ছেলেটি প্রথমবার অনুভব করল—

ভালোবাসা শুধু দুটি মানুষের অনুভূতির নাম নয়।

এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের সিদ্ধান্ত।

অসংখ্য সম্পর্ক।

অসংখ্য বাস্তবতা।

পরদিন সকালে মেয়েটি জানাল—

তাকে আর আগের মতো বাইরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

ফোন ব্যবহারও সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।

বাড়ির সবাই তাকে নজরে রাখছে।

ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

"ধৈর্য ধরো।

যত দিন লাগে অপেক্ষা করব।"

সে তখনও জানত না—

এটি ছিল অপেক্ষার শুরু।

আর সেই অপেক্ষার পথ হবে দীর্ঘ...

ক্লান্তিকর...

আর অসংখ্য পরীক্ষায় ভরা।

একটি মাত্র ছবি তাদের সম্পর্ককে লুকিয়ে রাখার সব পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।

এখন থেকে তাদের ভালোবাসা আর শুধু ভালোবাসা নয়—

এটি হয়ে উঠল একটি সংগ্রাম।

একটি পরীক্ষার নাম।

আর সেই পরীক্ষার প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তখনও বাকি ছিল।
21 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব