ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১২ম পর্ব

দীর্ঘ পথের একটি দিনঃ

কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না।

বছরের পর বছর কেটে যায়, তবুও চোখ বন্ধ করলেই সেই দিনটি স্পষ্ট ভেসে ওঠে।

তাদের জীবনেও এমন একটি দিন ছিল।

সেদিন সকালে মেয়েটি হঠাৎ বলল,

"আমরা কি কোথাও একটু দূরে যেতে পারি?"

সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

"কোথায়?"

"অনেক দূরে না। এমন কোথাও, যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না। একটা দিন শুধু গল্প করব।"

সে প্রথমে রাজি হয়নি।

তার স্বভাবই ছিল সাবধানী।

সে জানত, সমাজ মানুষের ভালো কাজ যত কম দেখে, ভুল তত দ্রুত দেখে।

তাই সে বলল,

"দূরে যাওয়াটা ঠিক হবে?"

মেয়েটি একটু অভিমান করল।

"তুমি সবকিছুতেই এত ভয় পাও কেন?"

সে শান্তভাবে উত্তর দিল,

"ভয় পাই না। শুধু চাই না, এমন কিছু হোক, যার জন্য পরে আফসোস করতে হয়।"

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

"ঠিক আছে। তোমার যেটা ভালো মনে হয়।"

কিন্তু কয়েক দিন পর আবার একই কথা উঠল।

এবার সে অনেক অনুরোধ করল।

বলল,

"হয়তো ভবিষ্যতে এমন সুযোগ আর আসবে না। চলো, একটা সুন্দর স্মৃতি তৈরি করি।"

শেষ পর্যন্ত ছেলেটি রাজি হলো।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা একটি নিরিবিলি রিসোর্ট বেছে নিল।

প্রকৃতির মাঝে।

সবুজে ঘেরা।

শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে।

যেদিন তারা রওনা দিল, আকাশটা ছিল পরিষ্কার।

রাস্তাজুড়ে সবুজ গাছ।

দূরে দূরে পাহাড়ের রেখা।

গাড়ির জানালায় মুখ রেখে মেয়েটি বাইরের দৃশ্য দেখছিল।

মাঝেমধ্যে ছোট ছোট শিশুর মতো আনন্দে বলে উঠছিল,

"দেখো, কত সুন্দর!"

সে মুচকি হেসে শুধু তাকিয়ে থাকছিল।

তার কাছে প্রকৃতির চেয়েও সুন্দর লাগছিল সেই হাসিটা।

রিসোর্টে পৌঁছে দুজনেই অনেকক্ষণ হাঁটল।

চারপাশে শুধু গাছ।

পাখির ডাক।

নরম বাতাস।

কোলাহলহীন এক পৃথিবী।

যারা তাদের দেখছিল, তারা সহজেই ধরে নিচ্ছিল— তারা হয়তো নতুন বিয়ে করা স্বামী-স্ত্রী।

এই ভুল ধারণা তারা কাউকেই ভাঙায়নি।

কারণ তারা কারও সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথাও বলেনি।

সারাদিন তারা গল্প করল।

ছবি তুলল।

ভবিষ্যতের কথা বলল।

একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেল।

ছোট ছোট বিষয় নিয়েও হাসাহাসি করল।

অনেক দিন পর ছেলেটিকে এতটা নির্ভার লাগছিল।

সেই দিনটিতে যেন জীবনের সব দুশ্চিন্তা কয়েক ঘণ্টার জন্য হারিয়ে গিয়েছিল।

বিকেলের দিকে তারা সুইমিং পুলের পাশে গিয়ে বসল।

মেয়েটি বলল,

"চলো, পানিতে নামি।"

সে মাথা নাড়ল।

"আমি নামব না।"

"কেন?"

"ইচ্ছে করছে না।"

মেয়েটি অনেক বুঝিয়েও তাকে রাজি করাতে পারল না।

শেষ পর্যন্ত সে একাই পানিতে নেমে গেল।

বারবার ডাকছিল,

"এসো না!"

সে শুধু হাসছিল।

কিন্তু পানিতে নামল না।

কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল— মেয়েটি চুপ হয়ে গেছে।

পানি থেকে উঠে এসে এক কোণে বসে আছে।

চোখ দুটো লাল।

সে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,

"কী হয়েছে?"

মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে নিল।

"কিছু না।"

"কিছু তো হয়েছে।"

অনেকক্ষণ পরে খুব আস্তে বলল,

"আজকের দিনটা আমি সারাজীবন মনে রাখতে চেয়েছিলাম। তুমি যদি আমার সঙ্গে পানিতে নামতে… তাহলে আরও সুন্দর হতো।"

এই কথাটা শুনে তার বুকটা কেঁপে উঠল।

সে বুঝতে পারেনি— এত ছোট একটি বিষয়ও কারও কাছে এত বড় হতে পারে।

সে মেয়েটির সামনে বসে বলল,

"ক্ষমা করে দাও। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি।"

মেয়েটি কিছু বলল না।

চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আস্তে করে মুছে ফেলল।

তারপর মৃদু হেসে বলল,

"আচ্ছা, আর রাগ করলাম না।"

সেই হাসিটা যেন আবার পুরো পরিবেশ বদলে দিল।

সন্ধ্যা নামতে শুরু করল।

আকাশ ধীরে ধীরে কমলা রঙে রঙিন হয়ে উঠল।

তারা শেষবারের মতো রিসোর্টের চারপাশে হাঁটল।

অনেক ছবি তুলল।

ছেলেটি মনে মনে ভাবছিল— এই দিনটি হয়তো তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলোর একটি হয়ে থাকবে।

ফেরার সময় গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে মেয়েটি খুব আস্তে বলল,

"একদিন যদি সত্যিই আমাদের বিয়ে হয়… আমরা আবার এখানে আসব?"

সে কোনো উত্তর দিতে পারল না।

শুধু মুচকি হেসে মাথা নাড়ল।

কারণ তারও একই স্বপ্ন ছিল।

রাত হয়ে গিয়েছিল।

ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হলো।

পথজুড়ে তারা খুব কম কথা বলল।

দুজনেই যেন দিনের স্মৃতিগুলো নিজের ভেতরে গুছিয়ে রাখছিল।

বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে মেয়েটি বলল,

"আজকের দিনটার জন্য ধন্যবাদ।"

সে শান্ত গলায় বলল,

"ধন্যবাদ আমাকে নয়। আল্লাহকে দিও। তিনি চাইলে তবেই এমন একটি দিন পাওয়া যায়।"

মেয়েটি মুচকি হেসে বলল,

"তবুও… আজ আমি খুব সুখী।"

সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে ছেলেটি অনেকক্ষণ ছবিগুলো দেখছিল।

প্রতিটি ছবির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি করে হাসি।

একটি করে স্বপ্ন।

একটি করে ভবিষ্যতের কল্পনা।

সে জানত না— এই ছবিগুলোর একটি ছবি একদিন তাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে।

একটি মাত্র ছবি… যা শুধু একটি মুহূর্তকে নয়, দুটি পরিবারের সম্পর্ক, দুটি মানুষের ভবিষ্যৎ, আর একটি স্বপ্নের পুরো পৃথিবীকে বদলে দেবে।

সেদিনের সুখী সন্ধ্যাই ছিল— আসন্ন ঝড়ের আগের শেষ শান্ত আকাশ।
27 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব