ছোট ছোট স্বপ্নের দিনগুলোঃ
জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো মানুষ তখনই কাটায়, যখন সে জানেই না—এই মুহূর্তগুলো একদিন শুধু স্মৃতি হয়ে যাবে।
তাদের জীবনেও এমনই একটি সময় এসেছিল।
না কোনো বড় আয়োজন ছিল।
না দামি উপহার।
না বিলাসী কোনো জীবন।
তবুও সেই দিনগুলো ছিল অদ্ভুত শান্ত।
মেয়েটির শারীরিক অবস্থা ধীরে ধীরে ভালো হয়ে উঠছিল।
আগের মতো আর প্রতিদিন চিকিৎসকের কাছে যেতে হতো না।
তবে ছেলেটি এখনো নিয়ম করে খোঁজ নিত।
সময়মতো ওষুধ খেয়েছে কি না।
খাবার খেয়েছে কি না।
কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না।
মেয়েটি মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলত,
"তুমি না থাকলে আমি হয়তো ওষুধ খেতেই ভুলে যেতাম।"
সে হেসে উত্তর দিত,
"তাহলে আমাকে ভুলতে পারবে না।"
মেয়েটি হাসত।
সেই হাসির শব্দ তার পুরো দিনটাকে ভালো করে দিত।
এখন তারা মাঝেমধ্যে দেখা করত।
কখনো শহরের কোনো নিরিবিলি চায়ের দোকানে।
কখনো ছোট্ট কোনো পার্কে।
কখনো আবার শুধু কয়েক মিনিটের জন্য।
দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার সুযোগ খুব কমই হতো।
কারণ দুজনেই জানত—
তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ খুব সতর্ক হতে হবে।
তবুও অল্প সময়ের সেই দেখা তাদের কাছে অনেক বড় আনন্দ ছিল।
একদিন তারা রাস্তার পাশে বসে ফুচকা খাচ্ছিল।
মেয়েটি হঠাৎ বলল,
"তুমি এত চুপচাপ কেন?"
সে হেসে বলল,
"আমি কথা কম বলি।"
"না। আমার মনে হয়, তুমি অনেক কথা মনে রাখো।"
সে একটু অবাক হয়েছিল।
মেয়েটি ঠিকই ধরেছিল।
সে সত্যিই নিজের কষ্ট খুব কম মানুষকে বলত।
বরং অন্যের কথা শুনতেই বেশি ভালোবাসত।
একদিন হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটি বলল,
"তোমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?"
সে এক মুহূর্তও না ভেবে বলল,
"দেশ ছেড়ে কোথাও যেতে চাই না।
আমি এখানেই থাকতে চাই।
এখানেই কিছু করতে চাই।
নিজের একটা ব্যবসা দাঁড় করাতে চাই।
আর মানুষের পাশে থাকতে চাই।"
মেয়েটি মন দিয়ে শুনছিল।
সে আবার বলল,
"অনেকে ভাবে রাজনীতি মানেই ক্ষমতা।
কিন্তু আমি চাই, মানুষ যেন আমার নাম শুনে ভয় না পায়।
বরং মনে করে—সমস্যা হলে এই ছেলেটার কাছে যাওয়া যায়।"
মেয়েটি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"তুমি জানো? এই কারণেই তোমাকে আলাদা লাগে।"
সে হেসে বিষয়টা এড়িয়ে গেল।
তার কাছে এগুলো প্রশংসার কথা ছিল না।
এগুলো ছিল তার বিশ্বাস।
সেই সময়ে সে ব্যবসা নিয়েও অনেক ভাবছিল।
প্রতিদিন নতুন নতুন পরিকল্পনা করত।
কাগজে লিখত।
হিসাব করত।
কখনো কোনো ছোট অফিসের স্বপ্ন দেখত।
কখনো একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র।
কখনো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েরা কম খরচে দক্ষতা শিখতে পারবে।
প্রতিবারই মেয়েটি মন দিয়ে শুনত।
কখনো কোনো স্বপ্নকে ছোট করত না।
বরং বলত,
"একদিন তুমি পারবেই।"
এই একটি বাক্য যেন তাকে নতুন শক্তি দিত।
তবে বাস্তবতা সহজ ছিল না।
টাকা ছিল না।
পুঁজি ছিল না।
পরিকল্পনা ছিল।
ইচ্ছা ছিল।
কিন্তু শুরু করার মতো সামর্থ্য ছিল না।
অনেকবার চেষ্টা করেও সে সফল হতে পারছিল না।
তবুও হাল ছাড়েনি।
সে বলত,
"আজ না পারলে কাল। একদিন না একদিন হবেই।"
মেয়েটি উত্তর দিত,
"আমি সেই দিনটা দেখব।"
এই কথাগুলো শুনে সে মনে মনে ভবিষ্যতের ছবি আঁকত।
একদিন ছোট্ট একটি অফিস।
দেয়ালে নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম।
বাইরে অপেক্ষা করছে কয়েকজন মানুষ।
আর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটি।
হয়তো এভাবেই সুখের ছবি মানুষ কল্পনা করে।
এদিকে তাদের সম্পর্কের কথা তার মা ধীরে ধীরে বুঝে গিয়েছিলেন।
একদিন রাতে মা তাকে ডেকে বললেন,
"একটা কথা বলব?"
সে বুঝে গিয়েছিল, কী নিয়ে কথা হবে।
মা বললেন,
"তুই কি ওকে পছন্দ করিস?"
সে প্রথমবারের মতো কোনো কথা লুকাল না।
মাথা নিচু করে শুধু বলল,
"হ্যাঁ।"
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
"মানুষের চরিত্র ভালো হলে বাকি সবকিছু পরে গড়ে নেওয়া যায়।
তবে তোর নিজের জীবনও গুছাতে হবে।"
এই কথাগুলো তার খুব ভালো লেগেছিল।
কারণ সে জানত—
মা শুধু আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তবতা দিয়েও ভাবেন।
এরপর থেকে মেয়েটি মাঝেমধ্যেই তার মায়ের সঙ্গে কথা বলত।
প্রথমে লজ্জা পেত।
পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেল।
কখনো খোঁজ নিত।
কখনো দোয়া চাইত।
কখনো শুধু সালাম দেওয়ার জন্য ফোন করত।
মা-ও তাকে আপন মানুষের মতোই কথা বলতেন।
ছেলেটি দূর থেকে এসব দেখত।
তার বুক ভরে যেত এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে।
সে ভাবত—
হয়তো আল্লাহ সত্যিই তার জন্য পথ সহজ করে দিচ্ছেন।
একদিন মজা করে সে মেয়েটিকে বলল,
"একটা কথা বলো তো।"
"হ্যাঁ?"
"মহরানা কত চাইবে?"
মেয়েটি প্রথমে হেসে ফেলল।
"এই প্রশ্ন এখন কেন?"
"এমনিই জানতে ইচ্ছে করল।"
সে ভেবেছিল—
হয়তো অনেক বড় অঙ্কের কথা বলবে।
কিন্তু মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
"তুমি যতটা পারবে।"
সে আবার বলল,
"না, একটা সংখ্যা বলো।"
মেয়েটি অনেক অনুরোধের পর খুব আস্তে বলল,
"১০১ টাকা।"
সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
"এত কম?"
মেয়েটি মুচকি হেসে বলল,
"আমার কাছে টাকার চেয়ে মানুষ বড়।"
সে বলল,
"আমি চাইলে এর চেয়ে অনেক বেশি দিতে পারি।"
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
"আমার দরকার নেই। তুমি থাকলেই হবে।"
সেদিন সে মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিল।
কারণ তার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়ে গিয়েছিল—
এই মানুষটি তাকে তার অবস্থার জন্য নয়, মানুষ হিসেবে ভালোবেসেছে।
তখনও সে জানত না—
জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতারণাগুলো অনেক সময় সবচেয়ে সুন্দর বাক্যের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে।
তবুও সে কোনো সন্দেহ করেনি।
কারণ ভালোবাসা যখন বিশ্বাসে পরিণত হয়—
তখন মানুষ প্রশ্ন করা ভুলে যায়।
আর ঠিক সেই বিশ্বাসের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই সে ভবিষ্যতের একটি পূর্ণ জীবন গড়তে শুরু করেছিল।
সে জানত না—
দূরে কোথাও, খুব নিঃশব্দে, একটি ঝড় তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১১তম পর্ব
23
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই