যে রাত ভোর হতে চায়নিঃ
মানুষের জীবনে কিছু কথোপকথন থাকে, যেগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়, অথচ তার প্রভাব থেকে যায় বছরের পর বছর।
সেই রাতটিও তেমনই ছিল।
সারাদিন তার মনটা অদ্ভুত অস্থির ছিল।
বারবার মনে পড়ছিল আগের রাতের কথা।
মুখ দিয়ে রক্ত পড়ার খবর।
চিকিৎসকের জরুরি নির্দেশ।
আর তারপরও হাসপাতালে না যাওয়ার ঘটনা।
সে বিষয়টি ভুলতে পারছিল না।
রাত একটু গভীর হতেই আবার একটি ফোন এল।
ওপাশের কণ্ঠ আগের চেয়েও দুর্বল।
মেয়েটি বলল,
"আজও শরীরটা ভালো লাগছে না।"
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"তোমার ফুফু কি পাশে আছেন?"
"আছেন।"
"একটু কথা বলানো যাবে?"
কিছুক্ষণ পর ফোনের ওপাশে আরেকটি কণ্ঠ শোনা গেল।
ভদ্রমহিলার কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু আন্তরিকতাও ছিল।
সে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিল।
তারপর চিকিৎসকের নির্দেশগুলো আবার ধীরে ধীরে বুঝিয়ে বলল।
কোন ওষুধ কখন খেতে হবে।
কোন লক্ষণ দেখা দিলে আর দেরি করা যাবে না।
রোগীকে যেন একা না রাখা হয়।
মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে না দেওয়া হয়।
ভদ্রমহিলা মন দিয়ে সব শুনলেন।
শেষে বললেন,
"ঠিক আছে বাবা, আমরা খেয়াল রাখব।"
ফোনটি আবার মেয়েটির হাতে ফিরে গেল।
সে ভেবেছিল, এখন হয়তো কথা শেষ হবে।
কিন্তু সেদিন যেন দুজনের কেউই ফোন রাখতে চাইছিল না।
প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা।
শরীরের খবর।
ওষুধের কথা।
তারপর ধীরে ধীরে নীরবতা।
সেই নীরবতার মাঝেই হঠাৎ মেয়েটি বলল,
"তুমি একটা কথা বলো তো..."
"হ্যাঁ?"
"তুমি এত সাহায্য করো কেন?"
প্রশ্নটা শুনে সে মৃদু হেসে ফেলল।
"সব সাহায্যের কারণ খুঁজতে নেই।"
"তবুও?"
সে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,
"হয়তো একদিন আমিও কারও সাহায্যের প্রয়োজন হব। তখন চাইব, কেউ যেন আমাকে ফিরিয়ে না দেয়।"
ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর খুব আস্তে করে মেয়েটি বলল,
"সব মানুষ তোমার মতো হয় না।"
সে উত্তর দিল না।
কারণ সে জানত—
সব মানুষকে এক মাপে মাপা যায় না।
কথা চলতে লাগল।
একসময় বিষয় বদলে গেল।
মেয়েটি নিজের জীবনের কথা বলতে শুরু করল।
প্রথমে একটু একটু করে।
তারপর যেন বহুদিন ধরে জমে থাকা কথাগুলো একে একে বেরিয়ে আসতে লাগল।
শৈশব।
পরিবার।
অভিমান।
ভয়।
অশান্তি।
কিছু কথা বলতে বলতে তার কণ্ঠ কেঁপে যাচ্ছিল।
কিছু কথার পরে সে থেমে যাচ্ছিল।
মাঝে মাঝে কান্নাও পাচ্ছিল।
সে শুধু শুনছিল।
একবারও বাধা দেয়নি।
একবারও বিচার করেনি।
সে শুধু বলেছিল,
"যা বলতে স্বস্তি লাগে, শুধু সেটুকুই বলো।"
এই একটি বাক্য যেন মেয়েটিকে আরও সাহসী করে তুলল।
সেদিন প্রথমবার সে এমন কিছু পারিবারিক কষ্টের কথা জানল, যা বাইরে থেকে কখনো বোঝা যেত না।
সে বুঝতে পারল—
কিছু মানুষ হাসতে জানে।
কিন্তু সুখে থাকতে জানে না।
মেয়েটি বলছিল,
আর সে শুনছিল।
মাঝে মাঝে শুধু বলছিল,
"আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।"
"সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।"
রাত বাড়ছিল।
ঘড়ির কাঁটা একটার ঘর ছাড়িয়ে দুইটায় গেল।
দুইটা থেকে তিনটা।
তিনটা থেকে চারটা।
কথার শেষ হচ্ছিল না।
একসময় মেয়েটি বলল,
"আজ এত কথা কেন বলছি জানো?"
সে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
"কেন?"
উত্তর এল,
"কারণ মনে হচ্ছে... তুমি শুনবে।"
এই কথাটুকু শুনে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
কত বড় একটি বিশ্বাসের কথা!
কোনো মানুষ যখন নিজের সবচেয়ে গোপন কষ্ট কাউকে বলতে শুরু করে, তখন সে আসলে তার হাতে নিজের ভাঙা হৃদয় তুলে দেয়।
সে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে চাইল।
তাই কোনো উপদেশ দিল না।
কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিল না।
শুধু পাশে রইল।
এভাবেই কথা বলতে বলতে কখন যে মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে এলো, তারা কেউই বুঝতে পারেনি।
দুজনেই থেমে গেল।
আজানের ধ্বনি যেন তাদের মনে করিয়ে দিল—
একটি রাত শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু সেই রাতের ভেতর দুজন মানুষের সম্পর্কের ভেতরে অদৃশ্য এক পরিবর্তন ঘটে গেছে।
তারা তখনও একে অপরকে ভাই-বোন বলেই ডাকছিল।
তবুও কোথাও যেন একটি নতুন বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে।
যে বিশ্বাসের কোনো নাম ছিল না।
ফজরের নামাজের সময় হয়ে গেছে।
সে বলল,
"নামাজ পড়ে বিশ্রাম নাও।"
মেয়েটি খুব আস্তে করে বলল,
"তুমিও।"
ফোন কেটে গেল।
সে অজু করল।
নামাজ পড়ল।
দীর্ঘ সিজদায় মাথা রেখে শুধু একটি দোয়া করল—
"হে আল্লাহ, এই মানুষটিকে সুস্থ করে দিন।"
তারপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে শুয়ে পড়ল।
কিন্তু ঘুমানোর আগে তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—
কেন আজ এই মানুষটির কষ্ট শুনে নিজের বুকটা এত ভারী লাগছে?
সে উত্তর খুঁজে পেল না।
হয়তো তখনও উত্তর আসার সময় হয়নি।
কারণ ভালোবাসা কখনও এক মুহূর্তে জন্ম নেয় না।
তা জন্ম নেয় অজান্তে।
অসংখ্য ছোট ছোট অনুভূতির ভেতর দিয়ে।
আর তাদের জীবনের সেই অদৃশ্য পরিবর্তনের শুরু হয়ে গেছে—
যদিও তারা দুজনের কেউই তখনও তা বুঝতে পারেনি।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ৬ষ্ঠ পর্ব
30
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই