একটি দীর্ঘ রাতঃ
মানুষের জীবনে এমন কিছু রাত আসে, যেগুলো শেষ হয়ে গেলেও শেষ হয় না।
সূর্য ওঠে।
নতুন সকাল আসে।
কিন্তু সেই রাতের প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের ভেতরে আজীবন জেগে থাকে।
সেই রাতটিও ছিল তেমনই।
এর আগ পর্যন্ত তাদের সম্পর্কের পরিচয় ছিল খুব সহজ।
সে ছিল একজন বড় ভাই।
আর মেয়েটি ছিল একজন ছোট বোন।
তাদের কথাবার্তা সীমিত।
প্রয়োজন ছাড়া যোগাযোগও খুব একটা হতো না।
এমন সময় একদিন বিদেশে থাকা সেই বন্ধুর কাছ থেকে একটি বার্তা এল।
সে জানাল, মেয়েটির শরীরে হঠাৎ তীব্র অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিয়েছে।
প্রথমে সে বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি।
ভেবেছিল, হয়তো সাধারণ কোনো সমস্যা।
কিন্তু পরপর দুই দিন একই কথা শুনে তার মনে অস্বস্তি তৈরি হলো।
শেষ পর্যন্ত সে নিজেই মেয়েটিকে একটি বার্তা পাঠাল।
— "কেমন আছ?"
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
— "ভালো না, ভাই।"
শব্দ দুটি খুব ছোট ছিল।
কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল অনেক ক্লান্তি।
সে বিস্তারিত জানতে চাইল।
মেয়েটি জানাল, কয়েক দিন ধরে শরীরে অদ্ভুত রকমের অ্যালার্জি হয়েছে।
ওষুধ খেলেও তেমন কাজ হচ্ছে না।
সে কিছুক্ষণ চিন্তা করল।
তারপর মনে পড়ল, শহরের একটি হাসপাতালে তার পরিচিত একজন চিকিৎসক আছেন।
তিনি অভিজ্ঞ।
মানুষ হিসেবেও খুব আন্তরিক।
সে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
রোগের লক্ষণগুলো জানাল।
সব শুনে চিকিৎসক বললেন,
"আগে রোগীকে নিয়ে আসুন। পরীক্ষা না করে কিছু বলা ঠিক হবে না।"
সে মেয়েটিকে লিখল,
"আগামীকাল সকালে হাসপাতালে চলে আসো। আমি আগে থেকেই বলে রাখছি।"
পরদিন সকালে নিজের অন্য কাজ থাকলেও সে হাসপাতালের দিকে রওনা হলো।
তার মনে হচ্ছিল—
একজন অসুস্থ মানুষকে একা পাঠানো ঠিক হবে না।
হাসপাতালে পৌঁছে সে দেখল, মেয়েটি আগেই এসেছে।
মুখে ক্লান্তি।
চোখের নিচে অবসাদের ছাপ।
আগের সেই চঞ্চল ভাব যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।
সে কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা বলল না।
শুধু বলল,
"চলো।"
ডাক্তারের কক্ষে নিয়ে গেল।
সব রিপোর্ট দেখাল।
চিকিৎসকের প্রশ্নের উত্তর দিতে সাহায্য করল।
তারপর প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাইরে বের হলো।
ওষুধ কিনে দিল।
কোন ওষুধ কখন খেতে হবে, কী কী খাবার এড়িয়ে চলতে হবে—সবকিছু ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিল।
বিদায় নেওয়ার আগে শুধু বলল,
"সময়মতো ওষুধ খেয়ো।"
মেয়েটি মাথা নাড়ল।
তারপর দুজনই নিজ নিজ পথে চলে গেল।
দিনটি সেখানেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু রাত তখনও অনেক বাকি।
রাত গভীর হওয়ার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তার ফোনে একটি বার্তা এল।
— "ভাই..."
সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল।
— "কী হয়েছে?"
উত্তর আসতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল।
তারপর মাত্র কয়েকটি শব্দ—
"মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে।"
বার্তাটি পড়েই তার বুক কেঁপে উঠল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে গেল।
তারপর আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
একজন পরিচিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করল।
সৌভাগ্যবশত ফোনটি ধরলেন।
সব কথা শুনে চিকিৎসক খুব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
"দেরি করবেন না। যত দ্রুত সম্ভব জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।"
ফোন কেটে সে সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটিকে কল করল।
তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
— "এখনই হাসপাতালে যাও।"
ওপাশ থেকে ভীত কণ্ঠে উত্তর এল,
— "রক্ত আরও বাড়ছে..."
সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল।
জিজ্ঞেস করল,
— "তোমার পাশে কে আছে?"
— "ফুফু আছেন।"
সে বলল,
"ফুফুকে নিয়ে এখনই বের হও। এক মুহূর্ত দেরি করবে না।"
কথাগুলো বললেও তার নিজের ভেতরে তখন অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছিল।
বারবার মনে হচ্ছিল—
যদি আরও বড় কিছু হয়ে যায়?
যদি দেরি হয়ে যায়?
সে অনেকক্ষণ জেগে রইল।
তারপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, নিজেও জানে না।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই প্রথম কাজ ছিল ফোন দেখা।
কোনো নতুন বার্তা নেই।
সে নিজেই ফোন করল।
মেয়েটি ফোন ধরল।
কণ্ঠ শুনেই বোঝা গেল, সে দুর্বল।
সে প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,
"হাসপাতালে গিয়েছিলে?"
ওপাশে নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—
"না।"
সে অবাক হয়ে গেল।
"কেন?"
মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল,
"আম্মু যেতে দেননি।"
সে আর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
মনে হচ্ছিল, এত বড় ঝুঁকির পরও একজন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা পেল না!
কিন্তু সে রাগ করল না।
বরং খুব শান্তভাবে বলল,
"এভাবে অবহেলা করা ঠিক নয়। শরীরের যত্ন নাও।"
কথা বলতে বলতে সে বুঝতে পারল—
মেয়েটির অসুস্থতা শুধু শরীরের নয়।
মনের ভেতরেও যেন অনেক দিনের জমে থাকা কষ্ট।
সেদিনের কথোপকথন খুব দীর্ঘ ছিল না।
তবুও প্রথমবার তার মনে হলো—
এই মেয়েটা শুধু অসুস্থ নয়...
সে ভেতর থেকেও ভেঙে পড়ছে।
আর একজন মানুষ যখন নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখতে রাখতে ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন সে শুধু ওষুধে ভালো হয় না।
তার প্রয়োজন হয়—
একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষের।
সে তখনও জানত না—
পরের রাতেই সেই বিশ্বাসের দরজা খুলে যাবে।
একটি রাত...
যেখানে ঘড়ির কাঁটা থেমে থাকবে না।
কিন্তু দুটি মানুষের জীবন চিরদিনের জন্য বদলে যাবে।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ৫ম পর্ব
23
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই