যে স্বপ্ন নিজেই ভেঙে দিলামঃ
ভালোবাসা কখনো কখনো শুধু একটি সম্পর্ক কেড়ে নেয় না।
কেড়ে নেয় মানুষের বহু বছরের স্বপ্নও।
ছেলেটির জীবনেও ঠিক সেটাই ঘটেছিল।
ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
ক্ষমতার জন্য নয়।
সম্মানের জন্যও নয়।
শুধু মানুষের ভালোবাসা অর্জন করার জন্য।
কৈশোরেই সে সমাজের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল।
কোথাও অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া,
কোথাও দরিদ্র পরিবারের জন্য সাহায্যের ব্যবস্থা করা,
কোথাও দুই পক্ষের ঝগড়া মিটিয়ে দেওয়া,
আবার কোথাও তরুণদের নিয়ে সামাজিক কাজ করা।
তার নিজের তেমন কোনো অর্থ ছিল না।
তবুও সময় ছিল।
পরিশ্রম ছিল।
ইচ্ছাশক্তি ছিল।
সে বিশ্বাস করত—
সব সাহায্য টাকা দিয়ে হয় না।
অনেক সময় একটি সাহসের হাতই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠে।
এভাবেই ধীরে ধীরে মানুষের ভালোবাসা পেতে শুরু করেছিল সে।
বয়সে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও,
এলাকার প্রবীণরাও তাকে চিনতেন।
বিভিন্ন মতের মানুষ তার সঙ্গে কথা বলতেন।
কেউ তার কাছে দল দেখে আসতেন না।
মানুষ হিসেবেই আসতেন।
সে নিজেও কখনো মানুষকে পরিচয়ে ভাগ করেনি।
তার কাছে ধনী-গরিব,
উঁচু-নিচু,
শিক্ষিত-অশিক্ষিত—
সবাই ছিল সমান।
এই কারণেই একসময় এলাকার অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন,
একদিন এই ছেলেটি বড় দায়িত্বে যাবে।
এমনকি স্থানীয় নির্বাচনে তাকে প্রার্থী করার কথাও উঠেছিল।
প্রথমে সে রাজি হয়নি।
তার মনে হতো,
সে এখনও অনেক ছোট।
আরও শিখতে হবে।
আরও অভিজ্ঞ হতে হবে।
কিন্তু মানুষের অনুরোধ বাড়তেই থাকল।
বাড়ির বাইরের মানুষ তাকে সাহস দিচ্ছিল।
যদিও বাড়ির ভেতরের কেউই জানতেন না,
সে কতটা সক্রিয়ভাবে মানুষের সঙ্গে কাজ করে।
তার বাবা সবসময় একটি কথাই বলতেন—
"আগে নিজের জীবন গড়।
তারপর মানুষের জন্য কাজ করবি।"
ছেলেটি বাবার কথার সম্মান করত।
কিন্তু মানুষের ডাকে সাড়া না দিয়েও থাকতে পারত না।
সে ভাবত—
একদিন ব্যবসা করবে।
নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
তারপর আরও বড় পরিসরে মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
সেই স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু ঠিক তখনই তার জীবনে আসে ভালোবাসা।
প্রথম দিকে সে দুই দিকই সামলানোর চেষ্টা করেছিল।
মানুষের কাজও।
সম্পর্কও।
কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারল,
মেয়েটি তাকে আগের মতো সময় দিতে পারছে না,
আবার তার কাছ থেকেও আরও বেশি সময় চাইছে।
প্রতিদিনের কথা।
অভিমান।
অপেক্ষা।
মান-অভিমান মেটানো।
সব মিলিয়ে তার জীবনের ভারসাম্য বদলে যেতে শুরু করল।
তারপর একদিন এমন একটি কথা এল,
যা সে কখনো কল্পনাও করেনি।
ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট—
রাজনীতি ছেড়ে দিতে হবে।
মানুষের ভিড় থেকে দূরে থাকতে হবে।
নিজেকে গুটিয়ে নিতে হবে।
প্রথমে সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল।
কারণ সে বিশ্বাস করত,
যে মানুষ তাকে ভালোবাসে,
সে কখনো তার স্বপ্ন কেড়ে নিতে চাইবে না।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুরোধ আরও জোরালো হতে লাগল।
সে দ্বিধায় পড়ে গেল।
একদিকে বহু বছরের স্বপ্ন।
অন্যদিকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।
অনেক রাত সে ঘুমাতে পারেনি।
নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে দোয়া করত।
কোন সিদ্ধান্তটি সঠিক—
সে বুঝতে পারছিল না।
অবশেষে একদিন সে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল।
নির্বাচনের জন্য তার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার আগেই
সে নিজেই সরে দাঁড়াল।
কারও সঙ্গে তর্ক করল না।
কারও বিরুদ্ধে অভিযোগও করল না।
শুধু বলেছিল,
"আমি আর থাকছি না।"
এই একটি সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়তেই অনেক মানুষ অবাক হয়ে গেল।
কেউ কারণ জানতে চাইল।
কেউ বলল,
"এত কষ্ট করে এখানে এসে এখন কেন চলে যাচ্ছ?"
সে শুধু হাসত।
কোনো উত্তর দিত না।
কারণ সত্যিটা বললে,
হয়তো কেউ বিশ্বাস করত না।
সে নিজের স্বপ্নটাকে নিজের হাতেই ভেঙে দিয়েছিল।
একজন মানুষকে বিশ্বাস করে।
যার হাত ধরে নতুন জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখেছিল।
তার মনে হয়েছিল—
স্বপ্ন আবার গড়া যাবে।
কিন্তু মানুষটাকে হারানো যাবে না।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—
শেষ পর্যন্ত স্বপ্নও হারাল।
মানুষটাও হারাল।
একদিন সন্ধ্যায় সে একা বসে ছিল।
দূরে মানুষের কোলাহল।
কেউ তাকে ডাকছিল।
আগের মতো কোনো সামাজিক কাজের জন্য।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব আস্তে করে বলল,
"ক্ষমা করবেন...
আমি এখন আর পারি না।"
এই কথাটি বলার সময় তার নিজেরই মনে হচ্ছিল,
সে যেন অন্য কাউকে নয়,
নিজেকেই বিদায় জানাচ্ছে।
যে ছেলেটি একসময় মানুষের জন্য নিজের সবকিছু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত ছিল,
আজ সেই ছেলেটি নিজের ভাঙা হৃদয়টুকুও সামলাতে পারছিল না।
তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় কোনো নির্বাচনে হয়নি।
হয়েছিল নিজের ভেতরে।
সেদিন সে প্রথমবার বুঝেছিল—
সব হারানোর শব্দ বাইরে শোনা যায় না।
কিছু ভাঙনের শব্দ শুধু মানুষ নিজের বুকের ভেতরই শুনতে পায়।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২৭তম পর্ব
30
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই