ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২৫তম পর্ব

আলোর শুরুঃ


মানুষ যখন পৃথিবীর সব দরজায় কড়া নেড়ে ব্যর্থ হয়,

তখন সে বুঝতে শেখে—

সবচেয়ে বড় দরজাটি সবসময়ই খোলা ছিল।

সেটি আল্লাহর দরজা।

সেদিনের সেই ফোনকলের পর ছেলেটি আর আগের মানুষটি ছিল না।

সে আর কারও সঙ্গে তর্ক করল না।

কাউকে নিজের নির্দোষ প্রমাণ করারও চেষ্টা করল না।

শুধু নীরবে নিজের ঘরে বসে থাকত।

একসময় যে ছেলেটি মানুষের সমস্যার কথা শুনে ছুটে যেত,

আজ সে নিজের ভাঙা মন নিয়েই বসে থাকত।

মা দূর থেকে ছেলেকে দেখতেন।

বাবা কিছু বলতেন না।

তবে দুজনেই বুঝতেন—

ছেলেটি বেঁচে আছে,

কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা এখনও গভীর অন্ধকারে আটকে আছে।

এক সন্ধ্যায় বাবা বললেন,

"চল, কোথাও যাব।"

ছেলেটি কোনো প্রশ্ন করল না।

চুপচাপ বাবার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।

পথে বাবা খুব বেশি কথা বলেননি।

শুধু বলেছিলেন,

"সব সমস্যার সমাধান মানুষের কাছে থাকে না।

কিছু সমস্যার সমাধান আল্লাহর কাছেই চাইতে হয়।"

তারা একজন সম্মানিত আলেমের কাছে গেলেন।

তিনি খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন।

কোনো বাড়তি আয়োজন ছিল না।

কোনো অলৌকিকতার দাবি ছিল না।

তিনি অনেকক্ষণ ছেলেটির কথা শুনলেন।

একবারও বাধা দিলেন না।

তারপর শুধু বললেন,

"তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছ।

কিন্তু কষ্ট পাওয়া আর আল্লাহর ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলা এক জিনিস নয়।"

তিনি কুরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন।

আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন।

তারপর শান্ত কণ্ঠে বললেন,

"মানুষের ওপর ভরসা করলে মানুষ ভেঙে দিতে পারে।

আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনি হয়তো পরীক্ষা নেন,

কিন্তু পরিত্যাগ করেন না।"

এই কথাগুলো ছেলেটির হৃদয়ের গভীরে গিয়ে লাগল।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অনেক দিন পর তার বুকটা একটু হালকা লাগছিল।

সমস্যাগুলো তখনও ছিল।

কষ্টও ছিল।

কিন্তু মনে হচ্ছিল—

অন্ধকারের ভেতর কোথাও যেন খুব ক্ষীণ একটি আলো জ্বলেছে।

সেই রাত থেকেই সে নিজের জীবনটাকে আবার গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করল।

নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করল।

অনেক দিন পর সিজদায় মাথা রেখে দীর্ঘ সময় কাঁদল।

কিন্তু এবার সেই কান্নায় অভিযোগ ছিল না।

ছিল আত্মসমর্পণ।

প্রতিটি নামাজের শেষে সে একটি কথাই বলত—

"হে আল্লাহ,

যাকে হারিয়ে আমি কষ্ট পাচ্ছি,

যদি সে আমার জন্য কল্যাণের না হয়,

তাহলে তাকে আমার হৃদয় থেকে সরিয়ে দিন।

আর যদি আমার জন্য অন্য কোনো উত্তম ফয়সালা লিখে রাখেন,

তাহলে আমাকে তা গ্রহণ করার শক্তি দিন।"

ধীরে ধীরে সে একটি আমল নিয়মিত করতে শুরু করল।

প্রতিদিন এশার নামাজের পর দরুদ শরিফ পড়ত।

তারপর মনোযোগ দিয়ে বারবার পড়ত—

"লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আযীম।"

প্রথম দিকে শুধু মুখে পড়ত।

পরে একদিন এই শব্দগুলোর অর্থ নিয়ে ভাবতে শুরু করল।

*"আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই।

কোনো ক্ষমতা নেই।"*

সে বুঝতে পারল—

এত দিন সে মানুষকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল।

এখন সময় এসেছে আল্লাহকে আঁকড়ে ধরার।

ধীরে ধীরে তার ভেতরে পরিবর্তন আসতে লাগল।

আগের মতো হঠাৎ রাগ হতো না।

অকারণে কান্নাও কমে গেল।

রাতে ঘুম না এলেও সে কুরআন তিলাওয়াত করত।

কখনো তাসবিহ পড়ত।

কখনো শুধু চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত।

একদিন বাবা তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

"এখন কেমন লাগছে?"

সে একটু ভেবে উত্তর দিল,

"ব্যথা এখনও আছে।

কিন্তু আগের মতো আর শ্বাসরোধ করে না।"

বাবা মৃদু হাসলেন।

বললেন,

"সময় সব ব্যথা মুছে দেয় না।

কিন্তু মানুষকে সেই ব্যথা নিয়ে বাঁচতে শিখিয়ে দেয়।"

ছেলেটি মাথা নাড়ল।

সে বুঝতে শুরু করেছে—

ভালোবাসা হারিয়ে গেলেও ঈমান হারানো যাবে না।

মানুষ প্রতারণা করতে পারে।

আল্লাহ কখনো করেন না।

তবুও একটি প্রশ্ন তাকে এখনও তাড়া করে ফিরত।

কেন?

কেন এত প্রতিশ্রুতির পর সব বদলে গেল?

কেন এত কান্নার পরও শেষটা এমন হলো?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তখনও তার জানা ছিল না।

কিন্তু আল্লাহ খুব শিগগিরই এমন কিছু সত্য তার সামনে উন্মোচন করতে যাচ্ছিলেন,

যা জানার পর সে দীর্ঘ সিজদায় পড়ে শুধু একটি কথাই বলবে—

"আলহামদুলিল্লাহ।"

কারণ কখনো কখনো,

যে বিচ্ছেদকে মানুষ নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি মনে করে,

আসলে সেটিই হয় আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় রহমত।
29 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব