ঝড়ের দিনঃ
জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়গুলো কখনো হঠাৎ আসে না।
তার আগে ছোট ছোট অনেক ইঙ্গিত আসে।
কিন্তু মানুষ তখন সেগুলোকে গুরুত্ব দেয় না।
কারণ সে বিশ্বাস করতে চায়—
সব ঠিক হয়ে যাবে।
সেদিন সকালটাও ছিল একেবারে সাধারণ।
ফজরের নামাজ পড়ে ছেলেটি কিছুক্ষণ কুরআন তিলাওয়াত করল।
তারপর দিনের কাজের পরিকল্পনা করছিল।
হঠাৎ ফোন।
ওপাশে মেয়েটির কণ্ঠ।
খুব খুশি।
"আজ একটা সুখবর আছে।"
সে হেসে বলল,
"কী সুখবর?"
"মা আমাকে আবার স্কুলে যেতে দিচ্ছেন।"
সে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
কারণ কয়েক দিন ধরেই মেয়েটি বলছিল—
তাকে স্কুলে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।
তার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল,
একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেন মেয়েটির পড়াশোনা নষ্ট না করে।
সে বলল,
"আলহামদুলিল্লাহ।
মন দিয়ে পড়াশোনা করবে।"
মেয়েটি হেসে উত্তর দিল,
"আজ তোমার সঙ্গে দেখা হবে?"
সে একটু ভেবে বলল,
"যদি প্রয়োজন হয়, হবে।"
সেদিন তার সত্যিই একটি কাজ ছিল।
মেয়েটির জন্য সে আগে থেকেই একটি অনলাইন বই অর্ডার করেছিল।
ভাবছিল—
স্কুলে গেলে বইটি হাতে তুলে দেবে।
সকালে দুজনের দেখা হলো।
মেয়েটির সঙ্গে ছিল তার ছোট বোন।
তারা একসঙ্গে স্কুলে গেল।
স্কুলের কাজ শেষ হতে দুপুর হয়ে গেল।
তিনজন কাছের একটি ছোট রেস্টুরেন্টে বসে নাস্তা করছিল।
ঠিক তখনই বইয়ের ডেলিভারি এসে পৌঁছাল।
সে হাসিমুখে বইটি মেয়েটির হাতে তুলে দিল।
"ভালো করে পড়বে।"
মেয়েটি বইয়ের মলাটে হাত বুলিয়ে বলল,
"এটা আমি অনেক যত্ন করে রাখব।"
ছেলেটির বুক ভরে গেল।
সে সব সময় চাইত—
মেয়েটি পড়াশোনা শেষ করুক।
নিজের পায়ে দাঁড়াক।
তার স্বপ্নের সঙ্গী হোক।
কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব বদলে গেল।
তার ফোন বেজে উঠল।
ওপাশে মেয়েটির মা।
তিনি প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন,
"তুমি কোথায়?"
সে সত্য লুকাল না।
"বাজারে আছি।"
পরের প্রশ্ন—
"ও কোথায়?"
সে আবারও সত্য বলল।
"আমার সঙ্গে।"
ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর কঠিন কণ্ঠে বললেন,
"ওখানেই থাকো।
আমি আসছি।"
ফোন কেটে গেল।
ছেলেটির বুক ধক করে উঠল।
সে বুঝতে পারল—
কেউ তাদের একসঙ্গে দেখে খবর দিয়েছে।
মেয়েটির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
সে কাঁপা গলায় বলল,
"আম্মু একা আসবে না।"
"কী হয়েছে?"
"সঙ্গে একজন আত্মীয়ও আসবে।
আমি খুব ভয় পাচ্ছি।"
তার চোখ ভিজে উঠল।
"ওরা আমাকে মারবে।"
ছেলেটি এক মুহূর্ত দেরি করল না।
সে নিজের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে ফোন করল।
সব খুলে বলল।
বন্ধু শুধু বলল,
"আমি আসছি।
একদম চিন্তা করো না।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধু আর তার এক আত্মীয় সেখানে পৌঁছে গেল।
তারা পরিস্থিতি বুঝে ছেলেটির পাশে দাঁড়াল।
কয়েক মিনিট পর একটি গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে এলেন মেয়েটির মা।
তার সঙ্গে একজন বয়স্ক আত্মীয়।
চারপাশের পরিবেশ মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠল।
মেয়েটি ভয়ে কাঁপছিল।
তার হাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল।
সে আস্তে করে ছেলেটির হাত চেপে ধরল।
তার চোখে তখন একটাই অনুরোধ।
"আমাকে একা ছেড়ে যেও না।"
কথাবার্তা শুরু হলো।
প্রথমে উত্তেজনা।
তারপর অভিযোগ।
তারপর দীর্ঘ আলোচনা।
ছেলেটি কারও সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলেনি।
সে শুধু একটি কথাই বলছিল—
"আমার উদ্দেশ্য খারাপ নয়।"
তার বন্ধু মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছিল।
ঠিক সেই সময়—
মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়ল।
সবার সামনে সে ছেলেটির হাত শক্ত করে ধরে বলল,
"আমাকে নিয়ে চলে যাও।
আমি আর ফিরব না।"
চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
এই একটি বাক্য যেন সময়কে থামিয়ে দিল।
ছেলেটির বুক কেঁপে উঠল।
এক মুহূর্তের জন্য তারও মনে হলো—
যদি সত্যিই নিয়ে চলে যায়?
যদি আজ সব শেষ করে নতুন জীবন শুরু করে?
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার বিবেক তাকে থামিয়ে দিল।
সে জানত—
ভালোবাসা কখনো হারাম পথে পূর্ণতা পায় না।
সে খুব শান্তভাবে মেয়েটির হাত ধরল।
তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল।
বলল,
"না।
আমি তোমাকে নিয়ে পালাব না।"
মেয়েটি অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল।
তার চোখ বেয়ে অঝোরে পানি পড়ছিল।
সে আবার বলল,
"চলো না..."
ছেলেটি মাথা নাড়ল।
"না।
আমি চাই, একদিন তোমাকে তোমার পরিবারের দোয়া নিয়ে নিজের ঘরে আনতে।
চুরি করে নয়।"
এই কথাগুলো বলার সময় তার নিজের চোখও ভিজে উঠেছিল।
শেষ পর্যন্ত অনেক বোঝানোর পর মেয়েটি মায়ের সঙ্গে চলে যেতে রাজি হলো।
গাড়িতে ওঠার আগে সে ব্যাগ থেকে দুটি ছোট পারফিউম বের করল।
চুপচাপ ছেলেটির হাতে দিল।
মৃদু কণ্ঠে বলল,
"এগুলো তোমার জন্য।"
আর কিছু বলল না।
গাড়ি ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল।
সে অনেকক্ষণ রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
হাতে দুটি পারফিউম।
মনে হাজার প্রশ্ন।
বন্ধু তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
"চলো।"
সে হাঁটছিল।
কিন্তু মনে হচ্ছিল—
আজ যেন তার ভেতরের একটা অংশও সেই গাড়ির সঙ্গে চলে গেছে।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সে পারফিউম দুটো আলমারির ভেতর খুব যত্ন করে রেখে দিল।
সে জানত না—
একদিন এই দুটি ছোট বোতলই হয়ে উঠবে তার অতীতের সবচেয়ে নীরব সাক্ষী।
যখন মানুষটা থাকবে না...
তখনও সেই সুগন্ধ তাকে মনে করিয়ে দেবে—
কখনো একজন মানুষ ছিল,
যে একদিন তার হাত ধরে বলেছিল—
"আমাকে নিয়ে চলে যাও..."
আর সে...
ভালোবাসার চেয়েও বড় মনে করে বেছে নিয়েছিল
হালাল পথ,
ধৈর্য,
আর অপেক্ষাকে।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১৮তম পর্ব
22
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই