ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১৬তম পর্ব

যে দিন রাজনীতি হেরে গেল ভালোবাসার কাছেঃ


মানুষের জীবনে কিছু সিদ্ধান্ত থাকে, যেগুলো নেওয়ার সময় মনে হয়— এটাই সবচেয়ে সঠিক পথ।

কিন্তু অনেক বছর পরে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, সেই সিদ্ধান্তই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ছিল।

ছেলেটির জীবনেও এমন একটি সিদ্ধান্ত এসেছিল।

ছোটবেলা থেকেই তার পরিচয় ছিল অন্যরকম।

বন্ধুরা যখন বিকেলে খেলাধুলা করত, সে তখন মানুষের বাড়িতে বাড়িতে যেত।

কখনো কারও জমির ঝামেলা মেটাতে।

কখনো অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে।

কখনো বৃদ্ধ মানুষের সরকারি ভাতা বা কাগজপত্রের কাজে সাহায্য করতে।

তার কাছে রাজনীতি মানে ছিল না ক্ষমতা।

ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

তাই খুব অল্প বয়সেই এলাকার মানুষ তাকে চিনে ফেলেছিল।

বয়স্করা স্নেহ করতেন।

তরুণরা পাশে থাকত।

বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষও তাকে সম্মান করত।

কারণ সে কখনো মানুষকে দল দিয়ে বিচার করেনি।

তার কাছে মানুষ আগে।

রাজনীতি পরে।

সে বিশ্বাস করত—

জাত, বংশ, পেশা কিংবা অর্থ দিয়ে মানুষের মূল্য নির্ধারণ হয় না।

একজন দিনমজুরের হাত যেমন সম্মানের,

তেমনি একজন শিক্ষিত মানুষের কথাও।

এই বিশ্বাস নিয়েই সে বড় হচ্ছিল।

বাবা অবশ্য বিষয়টি নিয়ে সব সময় চিন্তায় থাকতেন।

তিনি চাইতেন ছেলে পড়াশোনা করুক।

নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক।

রাজনীতি থেকে দূরে থাকুক।

অনেকবার বলেছিলেন,

"মানুষের জন্য কাজ করবি, কর।

কিন্তু রাজনীতির ভেতরে এত গভীরে যাস না।"

ছেলেটি শুধু হেসে বলত,

"একদিন বুঝবেন, আমি খারাপ কিছু করছি না।"

বাবা আর কিছু বলতেন না।

শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন।

এদিকে সময় এগোচ্ছিল।

এলাকার অনেকেই চাইছিল—

আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে ছেলেটি সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকুক।

অনেকে তাকে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল।

এত অল্প বয়সে এমন গ্রহণযোগ্যতা খুব কম মানুষের ভাগ্যে আসে।

কিন্তু ঠিক সেই সময়েই ভালোবাসা তার জীবনে নতুন এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল।

এক সন্ধ্যায় মেয়েটি খুব শান্ত গলায় বলল,

"একটা কথা বলব?"

"বলো।"

"রাগ করবে না তো?"

সে হেসে বলল,

"তোমার ওপর রাগ করতে পারি?"

মেয়েটি একটু থেমে বলল,

"তুমি রাজনীতি ছেড়ে দাও।"

কথাটা শুনে সে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল।

এমন কথা সে আগে কখনো শোনেনি।

"কেন?"

মেয়েটি বলল,

"আমি ভয় পাই।"

"কীসের ভয়?"

"মানুষকে নিয়ে কাজ করলে শত্রুও তৈরি হয়।

আমি চাই না, তোমার কোনো ক্ষতি হোক।"

সে বোঝানোর চেষ্টা করল,

"সব রাজনীতি এক রকম না।"

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

"হতে পারে।

তবুও আমার ভয় লাগে।"

সেদিন বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়েছিল।

কিন্তু এরপর থেকে মাঝেমধ্যেই একই কথা উঠতে লাগল।

"রাজনীতি ছেড়ে দাও।"

"মানুষের সেবা অন্যভাবেও করা যায়।"

"ব্যবসা করো।

নিজেকে গুছিয়ে নাও।"

সে প্রতিবারই বলত,

"রাজনীতি আমার স্বপ্ন।"

মেয়েটি উত্তর দিত,

"আমি কি তোমার স্বপ্নের বাইরে?"

এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে ছিল না।

রাতের পর রাত সে ভাবত।

একদিকে বহু বছরের পথচলা।

মানুষের ভালোবাসা।

স্বপ্ন।

অন্যদিকে—

যে মানুষটি বলেছিল,

"এক কাপড়ে থাকব।"

"একশ এক টাকা মহরই যথেষ্ট।"

"তোমাকে ছাড়া কোথাও যাব না।"

শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নিল।

নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হওয়ার আগেই সে নিজেই সরে দাঁড়াল।

কারও চাপে নয়।

কোনো ভয়ে নয়।

শুধু একজন মানুষের মুখের হাসি বাঁচিয়ে রাখতে।

তার অনেক সহযোদ্ধা অবাক হয়ে গিয়েছিল।

অনেকে কারণ জানতে চেয়েছিল।

সে শুধু বলেছিল,

"ব্যক্তিগত কিছু কারণ আছে।"

আর কিছু বলেনি।

কারণ সে কাউকে দোষ দিতে চায়নি।

সেদিন রাতে মেয়েটিকে খবরটি জানাল।

ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর খুব আস্তে একটি বাক্য—

"সত্যি?"

সে মৃদু হেসে বলল,

"হ্যাঁ।"

"তুমি... আমার জন্য?"

সে উত্তর দিল,

"তোমার শান্তির জন্য।"

মেয়েটি অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারেনি।

শুধু কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

শেষে বলল,

"আমি কোনো দিন তোমাকে কষ্ট দেব না।"

সে বিশ্বাস করেছিল।

সম্পূর্ণ বিশ্বাস।

সেদিন রাতে সে নিজের ঘরে একা বসে ছিল।

টেবিলের ওপর পড়ে ছিল কিছু পুরোনো পোস্টার।

কিছু কাগজ।

মানুষের সমস্যার তালিকা।

কিছু অসমাপ্ত পরিকল্পনা।

সে একে একে সব গুছিয়ে একটি বাক্সে তুলে রাখল।

মনে হচ্ছিল—

জীবনের একটি অধ্যায় সে নিজেই বন্ধ করে দিচ্ছে।

তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের দিকে তাকাল।

মনে মনে বলল,

"রাজনীতি ছাড়লাম।

কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো দিন ছাড়ব না।"

সেই প্রতিজ্ঞা সে আজও ভাঙেনি।

তবে সেদিন সে জানত না—

যার জন্য সে নিজের বহু বছরের স্বপ্নকে একপাশে সরিয়ে রাখল,

একদিন সেই মানুষটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

আর সেই দিন যখন আসবে,

তখন সে বুঝবে—

স্বপ্ন হারানোর কষ্ট যতটা,

বিশ্বাস হারানোর কষ্ট তার চেয়েও অনেক বেশি।
24 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব