ভাঙা স্বপ্নের পরে — ১৪তম পর্ব

দেয়ালের ওপাশেঃ


একটি সম্পর্ক যখন পরিবারের চোখে পড়ে যায়, তখন শুধু দুটি মানুষের জীবনই বদলে যায় না।

বদলে যায় তাদের প্রতিদিনের অভ্যাসও।

যে মানুষটির সঙ্গে প্রতিদিন কথা বলা হতো, তার সঙ্গে কথা বলাটাও একসময় কঠিন হয়ে যায়।

সেই সময়টাও তাদের জীবনে এসে গেল।

ছবির ঘটনার পর কয়েক দিন যেন সবকিছু থমকে ছিল।

আগের মতো আর ইচ্ছেমতো দেখা করা যেত না।

হঠাৎ ফোন করাও সম্ভব ছিল না।

মেয়েটির প্রতিটি পদক্ষেপ এখন পরিবারের নজরে।

কখন বের হচ্ছে।

কোথায় যাচ্ছে।

কার সঙ্গে কথা বলছে।

সবকিছুর হিসাব রাখা হচ্ছিল।

ছেলেটি বিষয়টি বুঝতে পেরেছিল।

তাই সে কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি।

বরং নিজেই যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিল।

সে চাইছিল না, তার কারণে মেয়েটিকে আরও বেশি সমস্যায় পড়তে হোক।

কিন্তু ভালোবাসা কি এত সহজে দূরে থাকে?

একদিন দুপুরে হঠাৎ একটি ছোট্ট বার্তা এল।

"আজ খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে।"

সে বার্তাটি পড়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

উত্তরে শুধু লিখল,

"আমি আছি।"

এই দুটি শব্দই যেন মেয়েটির জন্য অনেক বড় ভরসা ছিল।

কিছুক্ষণ পর ফোন এল।

কণ্ঠে ক্লান্তি।

চাপা কান্না।

মেয়েটি বলল,

"আগের মতো কিছুই নেই।"

সে শান্ত গলায় বলল,

"সময় বদলায়।

আবার ঠিকও হয়ে যায়।"

মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"তুমি এত সহজে কীভাবে বলো?"

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দিল,

"কারণ আমি বিশ্বাস করি, মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে আল্লাহর পরিকল্পনা বড়।"

ওপাশে আর কোনো উত্তর এল না।

শুধু নিঃশব্দ কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল।

কয়েক দিন পর খবর এল—

মেয়েটিকে তার ফুফুর বাসা থেকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এই খবর শুনে তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

সে জানত, এর অর্থ একটাই—

তাদের দেখা করার সুযোগ আরও কমে যাবে।

সন্ধ্যায় অনেক কষ্টে কথা হলো।

মেয়েটি বলল,

"এখানে এসে খুব একা লাগছে।"

"কেন?"

"আমার সঙ্গে কেউ ঠিকমতো কথা বলে না।"

"খাবার খেয়েছ?"

কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল,

"আজ ঠিকমতো খেতে ইচ্ছে করেনি।"

ছেলেটির বুক কেঁপে উঠল।

সে জানত—

কষ্টের সময় মানুষ অনেক কিছু সহ্য করতে পারে।

কিন্তু একাকীত্ব সবচেয়ে কঠিন।

সেদিন রাতে সে অনেক ভেবেছিল।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিল—

সে মেয়েটির মায়ের সঙ্গে কথা বলবে।

কোনো অভিযোগ করার জন্য নয়।

শুধু একজন অভিভাবক হিসেবে অনুরোধ করার জন্য।

পরদিন সে ফোন করল।

অত্যন্ত ভদ্রভাবে সালাম দিল।

তারপর বলল,

"একটা কথা বলব?"

ওপাশ থেকে উত্তর এল,

"বলো।"

সে ধীরে ধীরে বলল,

"ও যদি কোনো ভুল করে থাকে, তাকে বুঝিয়ে বলুন।

কিন্তু ও যেন নিজেকে একা মনে না করে।"

ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর ভদ্রমহিলা বললেন,

"তুমি কি মনে করো, আমি আমার মেয়ের খারাপ চাই?"

সে দ্রুত বলল,

"না, কখনোই না।

আমি শুধু চাই, ও যেন মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে।"

কথা অনেকক্ষণ চলল।

কোনো উচ্চস্বরে তর্ক হয়নি।

কোনো অপমানও নয়।

শুধু দুইজন মানুষ, যারা নিজেদের অবস্থান থেকে একটি মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছিলেন।

সেদিনের পর পরিস্থিতি কিছুটা বদলাল।

মেয়েটি আবার সীমিত সময়ের জন্য ফোনে কথা বলতে পারত।

যদিও আগের মতো দীর্ঘ সময় নয়।

তবু এটুকুই তখন অনেক ছিল।

এর কিছুদিন পর ছেলেটির মা-ও মেয়েটির মায়ের সঙ্গে কথা বললেন।

দুইজন মা অনেকক্ষণ কথা বললেন।

কে ঠিক, কে ভুল—

সেটা নিয়ে নয়।

সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

সেদিন ছেলেটি দূর থেকে সব শুনছিল।

তার মনে হচ্ছিল—

হয়তো ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কারণ এখন আর বিষয়টি লুকিয়ে নেই।

দুই পরিবারই জানে।

এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

সেদিন রাতে মেয়েটি খুব খুশি ছিল।

সে বলল,

"আজ অনেক দিন পর একটু ভালো লাগছে।"

সে মুচকি হেসে বলল,

"দেখেছ?

ধৈর্য ধরলে আল্লাহ রাস্তা বের করে দেন।"

মেয়েটি বলল,

"তুমি সব সময় এত ভরসা পাও কোথা থেকে?"

সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

"যেদিন মানুষকে ভরসা করা ছেড়ে আল্লাহকে ভরসা করতে শিখেছি, সেদিন থেকেই।"

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

"আমিও চেষ্টা করব।"

সেই রাতে তাদের কথার শেষে কোনো বড় প্রতিশ্রুতি ছিল না।

ছিল না ভবিষ্যতের বিশাল কোনো পরিকল্পনাও।

শুধু দুজন মানুষ নীরবে বিশ্বাস করছিল—

সময় হয়তো তাদের পক্ষেই কথা বলবে।

কিন্তু তারা জানত না—

সময় কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে বড় পরীক্ষকও হয়।

যে দেয়াল আজ তাদের মাঝখানে উঠেছে,

সেটি শুধু ইট-পাথরের ছিল না।

সেটি ছিল সমাজের,

পরিবারের,

ভয় আর অনিশ্চয়তার।

আর সেই দেয়াল টপকানোর শক্তি,

শুধু ভালোবাসা দিয়ে সব সময় পাওয়া যায় না।
21 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব