স্বপ্নের শুরুঃ
সেই রাতের পর দুজনের জীবন যেন অদৃশ্যভাবে বদলে গেল।
কেউ কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে "ভালোবাসি" বলেনি।
কোনো নাটকীয় প্রতিশ্রুতি ছিল না।
কোনো আংটি বদলও নয়।
শুধু দুটি মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছিল— তারা একে অপরকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারছে না।
তবুও ছেলেটি নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাড়াহুড়ো করেনি।
সে জানত, ভালোবাসা যত সহজে মুখে বলা যায়, তার দায়িত্ব বহন করা ততটাই কঠিন।
পরদিন সকালে ফজরের নামাজের পরও সে অনেকক্ষণ বসে ছিল।
সিজদায় মাথা রেখে শুধু একটি কথাই বলেছিল—
"হে আল্লাহ, যদি এই সম্পর্ক আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে সহজ করে দিন। আর যদি না হয়, তাহলে আমার অন্তরকে শক্ত করে দিন।"
তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল মানুষকে নিয়ে বেঁচে থাকা।
ছোটবেলা থেকেই সে রাজনীতি ভালোবাসত।
ক্ষমতার জন্য নয়।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।
বন্যায় কারও ঘর ভেঙে গেলে, অসুস্থ কারও রক্ত লাগলে, কোনো গরিব ছাত্র বই কিনতে না পারলে—এসব খবর শুনলেই সে ছুটে যেত।
তার নিজের পকেটে টাকা থাকত না।
তবুও মানুষের জন্য দৌড়ানো বন্ধ করত না।
অনেকেই বলত,
"নিজের ভবিষ্যৎ গড়ো আগে।"
সে শুধু হাসত।
কারণ তার বিশ্বাস ছিল—
মানুষের দোয়ার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু নেই।
কিন্তু সেই মানুষটিই আজ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রথমবারের মতো সিরিয়াসভাবে ভাবতে শুরু করল।
কারণ এখন সে একা নয়।
তার সঙ্গে আরেকটি স্বপ্ন জড়িয়ে গেছে।
মেয়েটির।
সেদিন দুপুরে কথা বলতে বলতে সে বলল,
"একটা কথা বলব?"
"বলো।"
"আমি তোমাকে একটা সুখের জীবন দিতে চাই।"
মেয়েটি হেসে বলল,
"তুমি আছো, এটাই তো সুখ।"
সে মাথা নাড়ল।
"না। শুধু ভালোবাসা দিয়ে সংসার চলে না।"
"আমি জানি।"
"আমাকে কিছু একটা করতে হবে।"
তার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল দেশে থেকেই একটি ব্যবসা শুরু করবে।
সে বিদেশে গিয়ে জীবন কাটানোর স্বপ্ন কখনো দেখেনি।
তার বিশ্বাস ছিল—
নিজের দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে সফল হওয়ার আনন্দ আলাদা।
আর নিজের মানুষের পাশে থাকাটাও তার কাছে অনেক বড় বিষয়।
সে ব্যবসার নানা পরিকল্পনা করতে শুরু করল।
কখনো গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ বড় করার কথা ভাবত।
কখনো একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র করার স্বপ্ন দেখত।
কখনো আবার ছোট একটি প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা করত।
খাতার পর খাতা ভরে ফেলত হিসাব-নিকাশে।
কোথা থেকে শুরু করবে।
কত টাকা লাগবে।
কীভাবে মানুষকে কাজ দেবে।
সবকিছু নিয়েই তার ভাবনা।
মেয়েটি আগ্রহ নিয়ে তার সব পরিকল্পনা শুনত।
কখনো বলত,
"তুমি পারবে।"
কখনো বলত,
"আমি পাশে থাকব।"
এই কথাগুলো তাকে নতুন সাহস দিত।
একদিন সে হেসে বলল,
"যদি কোনোদিন আমি খুব বড় ব্যবসায়ী হই?"
মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
"তাহলে আমি তোমার সবচেয়ে বড় সমালোচক হব।"
সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কেন?"
"কারণ তুমি যেন অহংকারী না হয়ে যাও।"
সে হেসে ফেলল।
"আর যদি ব্যর্থ হই?"
মেয়েটি এক মুহূর্ত দেরি না করে বলল,
"তাহলেও তোমার হাত ছাড়ব না।"
এই একটি বাক্য তার মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
সে বিশ্বাস করতে শুরু করল—
হয়তো আল্লাহ সত্যিই এমন একজন মানুষকে তার জীবনে পাঠিয়েছেন, যে সুখ-দুঃখ সবকিছুতেই পাশে থাকবে।
দিন যেতে লাগল।
এখন তারা ভবিষ্যতের ছোট ছোট স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছে।
কোথায় থাকবে।
কেমন একটি ছোট ঘর হবে।
ঘরের সামনে কয়েকটি ফুলগাছ।
একটি বুকশেলফ।
একটি নামাজের জায়নামাজ সব সময় বিছানো থাকবে।
ছেলেটি বলত,
"আমার বাড়িতে যেন কেউ সাহায্য চাইতে এসে খালি হাতে না ফেরে।"
মেয়েটি উত্তর দিত,
"ইনশাআল্লাহ।"
সে আবার বলত,
"আমার রাজনীতি যদি কখনো মানুষকে কষ্ট দেয়, আমি সেই রাজনীতি করব না।"
মেয়েটি বলত,
"তুমি মানুষকে ভালোবাসো, তাই আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখবেন।"
সেদিন তার মনে হয়েছিল—
এই মানুষটিই বুঝি তাকে সবচেয়ে বেশি বোঝে।
তার স্বপ্নকে।
তার আদর্শকে।
তার সংগ্রামকে।
সে জানত না—
জীবনে সবচেয়ে বড় ভাঙন অনেক সময় শুরু হয় সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নগুলোর মধ্য থেকেই।
যে মানুষটি আজ বলছে,
"আমি তোমার পাশে থাকব।"
একদিন সেই মানুষটিই তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার কারণ হবে।
কিন্তু তখন?
তখন তারা শুধু স্বপ্ন দেখছিল।
ভবিষ্যতের।
একটি ছোট সংসারের।
আর এমন একটি জীবনের—
যেখানে ভালোবাসা, সম্মান আর বিশ্বাসই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ।
তারা কেউই জানত না—
স্বপ্ন ভাঙার শব্দ সবচেয়ে বেশি শোনা যায় তখনই, যখন মানুষ সেই স্বপ্নকে পুরো হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করে ফেলে।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ৯ম পর্ব
29
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই