ভাঙা স্বপ্নের পরে — ৮ম পর্ব

একটি স্বীকারোক্তিঃ


মানুষ কখন ভালোবাসায় পড়ে?

প্রথম দেখাতেই?

নাকি দীর্ঘদিনের পরিচয়ের পর?

এই প্রশ্নের উত্তর সবার জন্য এক নয়।

কেউ চোখ দেখে ভালোবাসে।

কেউ হাসি দেখে।

আবার কেউ একজন মানুষের চরিত্র দেখে ধীরে ধীরে তার হৃদয়ে জায়গা করে দেয়।

তাদের গল্পটাও ঠিক তেমনই ছিল।

সেই রাতের পর থেকে তাদের কথাবার্তা আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল।

এখন আর শুধু অসুস্থতার খবর নেওয়া নয়।

পড়াশোনা, সমাজ, মানুষের জীবন, ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়েই কথা হতো।

সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিল, মেয়েটি অন্যদের সামনে যতটা চুপচাপ, তার সঙ্গে ততটাই খোলামেলা।

তবু সম্পর্কের সীমারেখা তখনও অটুট ছিল।

একদিন সন্ধ্যায় মেয়েটি হঠাৎ বলল,

"একটা কথা বলব?"

সে স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিল,

"বলো।"

মেয়েটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,

"আমি অনেক দিন ধরে একজনকে ভালোবাসি।"

সে অবাক হলেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

তার মনে প্রথমেই এলো—

হয়তো সে কোনো পরামর্শ চাইবে।

সে হেসে বলল,

"তাহলে বলে দাও।"

ওপাশ থেকে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর খুব আস্তে উত্তর এল,

"পারি না।"

"কেন?"

"ভয় লাগে।"

সে একটু মজা করেই বলল,

"ভয় পেলে তো হবে না। মানুষ মনের কথা না বললে অন্য মানুষ বুঝবে কীভাবে?"

মেয়েটি আবারও চুপ।

সে বিষয়টা হালকা করার জন্য বলল,

"আচ্ছা, নাম বলো। আমি গিয়ে বলে দিচ্ছি।"

মেয়েটি হেসে ফেলল।

"না।"

"তাহলে নম্বর দাও।"

"সেটাও না।"

"তাহলে কীভাবে হবে?"

"জানি না।"

সে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

"আচ্ছা, অন্তত একটা মেসেজ পাঠাও। খুব বেশি কিছু না। শুধু মনের কথাটা লিখে পাঠিয়ে দাও।"

মেয়েটি বলল,

"যদি উত্তর খারাপ হয়?"

সে বলল,

"সত্যি উত্তর সব সময় ভালো। অনিশ্চয়তার চেয়ে প্রত্যাখ্যানও ভালো।"

ওপাশে আবার নীরবতা।

তারপর মেয়েটি বলল,

"ঠিক আছে।"

"এখনই পাঠাব?"

"হ্যাঁ।"

"তুমি ফোন রাখো।"

সে হেসে বলল,

"ঠিক আছে, পাঠিয়ে আমাকে জানিও কী উত্তর পেল।"

ফোন কেটে গেল।

সে বিছানায় বসে রইল।

মনে মনে ভাবছিল—

হয়তো আজ আরেকটি মানুষের ভালোবাসার গল্প শুরু হবে।

কয়েক মিনিট কেটে গেল।

হঠাৎ তার নিজের ফোনে একটি নতুন বার্তার শব্দ।

সে অবাক হয়ে ফোন হাতে নিল।

প্রেরকের নাম দেখে আরও অবাক হলো।

মেয়েটিই বার্তা পাঠিয়েছে।

সে ভাবল—

হয়তো ভুল করে পাঠিয়েছে।

বার্তাটি খুলতেই মাত্র তিনটি শব্দ।

"আমি তোমাকে চাই।"

সে স্থির হয়ে গেল।

মনে হলো, সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে।

সে কয়েকবার বার্তাটি পড়ল।

হয়তো ভুল দেখছে।

হয়তো অন্য কারও জন্য লেখা।

হয়তো ভুল করে তার কাছে চলে এসেছে।

সে তাড়াতাড়ি ফোন করল।

মেয়েটি ফোন ধরল।

সে প্রথমেই বলল,

"এই মেসেজটা...?"

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর নেই।

সে আবার বলল,

"ভুল করে পাঠিয়েছ?"

কয়েক সেকেন্ড পর খুব আস্তে একটি উত্তর ভেসে এল—

"না।"

তার বুকের ভেতর কেমন যেন ধক করে উঠল।

"তাহলে?"

মেয়েটি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,

"যাকে এতদিন ধরে ভালোবাসি... সে তুমি।"

এই কথাটুকু শোনার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।

একদমই না।

তার মনে যেন একসঙ্গে হাজারটা প্রশ্ন এসে ভিড় করল।

"কীভাবে সম্ভব?"

"কবে থেকে?"

"আমি তো তোমাকে সব সময় ছোট বোনের মতোই দেখেছি।"

সে শান্ত থাকার চেষ্টা করে বলল,

"তুমি কি বুঝে বলছ?"

মেয়েটি দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

"হ্যাঁ।"

"কবে থেকে?"

"অনেক দিন।"

"কেন আমাকে আগে বলনি?"

"সাহস পাইনি।"

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তার মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে।

কিছুক্ষণ পর বলল,

"তুমি জানো তো, আমার কিছুই নেই?"

"জানি।"

"আমার স্থায়ী আয় নেই।"

"জানি।"

"আমি এখনও নিজের জীবনই গুছিয়ে উঠতে পারিনি।"

"জানি।"

"তাহলে?"

মেয়েটির উত্তর ছিল খুব শান্ত।

"আমি মানুষকে ভালোবেসেছি, অবস্থাকে না।"

সে আরেকবার বোঝানোর চেষ্টা করল।

"শোনো, আবেগ দিয়ে সংসার চলে না।"

"আমি জানি।"

"আমি তোমাকে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারব না।"

"আমি নিশ্চয়তা চাই না।"

"ভবিষ্যতে অনেক কষ্ট হতে পারে।"

"হোক।"

"আমি হয়তো কখনো সফলও হতে পারব না।"

মেয়েটি এবার একটু হেসে বলল,

"তুমি নিজেকে যতটা ছোট ভাবো, আমি ততটা ছোট দেখি না।"

সে আরেকবার শেষ চেষ্টা করল।

"যদি কোনো দিন আমার কাছে কিছুই না থাকে?"

মেয়েটির উত্তর এলো এক নিঃশ্বাসে—

"এক কাপড়ে থাকব।"

সে চুপ।

"যদি শুধু ভাত আর পানি খেয়ে থাকতে হয়?"

"তবুও থাকব।"

"যদি অনেক বছর কষ্ট করতে হয়?"

"তবুও তোমার সঙ্গেই করব।"

কথাগুলো শুনে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নিল।

সে জীবনে অনেক মানুষের কথা শুনেছে।

অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছে।

কিন্তু এমন নির্ভরতার ভাষা আগে কখনো শোনেনি।

তবু সে নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করছিল।

কারণ সে জানত—

একটি সম্পর্ক শুধু ভালোবাসা দিয়ে নয়, দায়িত্ব দিয়েও গড়ে ওঠে।

সে বলল,

"আমাকে একটু সময় দাও।"

মেয়েটি খুব শান্তভাবে উত্তর দিল,

"আমি অপেক্ষা করতে পারি।"

সেদিন রাতে ফোন কেটে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ সে ঘুমাতে পারেনি।

বারবার সেই কথাগুলো কানে বাজছিল—

"আমি মানুষকে ভালোবেসেছি, অবস্থাকে না।"

"এক কাপড়ে থাকব।"

"পানি-ভাত খেয়েও থাকব।"

সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল।

নিজেকে প্রশ্ন করছিল—

এ কি সত্যিই ভালোবাসা?

নাকি সময়ের তৈরি কোনো আবেগ?

তার কোনো উত্তর ছিল না।

তবে সে এটুকু বুঝেছিল—

আজকের পর থেকে তাদের সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফিরে যাবে না।

একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে।

যার শেষ কোথায়...

তা তখনও কেউ জানত না।
32 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব