ভাঙা স্বপ্নের পরে — ৭ম পর্ব

অদৃশ্য পরিবর্তনঃ


মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্কের পরিবর্তন এত ধীরে ঘটে যে, সেই পরিবর্তনের শব্দও শোনা যায় না।

একদিন হঠাৎ মনে হয়—

সবকিছু তো আগের মতোই আছে।

কিন্তু সত্যি বলতে, কিছুই আর আগের মতো থাকে না।

সেই দীর্ঘ রাতের পর তাদের কথাবার্তায় কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আসেনি।

মেয়েটি এখনও তাকে "ভাই" বলেই ডাকত।

সেও আগের মতোই তাকে ছোট বোনের সম্মান দিত।

তবু কোথাও যেন অদৃশ্য একটি পরিবর্তন শুরু হয়ে গিয়েছিল।

এখন আর শুধু প্রয়োজনে কথা হতো না।

মাঝেমধ্যে সে নিজেই লিখত,

— "শরীর কেমন?"

উত্তর আসত,

— "আজ একটু ভালো।"

কখনো আবার লিখত,

— "আজ ওষুধ খেয়েছ তো?"

মেয়েটি মজা করে লিখত,

— "ডাক্তারের চেয়েও বেশি খোঁজ রাখো।"

সে শুধু একটি হাসির চিহ্ন পাঠিয়ে দিত।

তার কাছে এটি দায়িত্বের মতোই ছিল।

কারণ সে জানত, একজন অসুস্থ মানুষকে শুধু ওষুধ দিলেই হয় না, তাকে মনে করিয়ে দিতে হয়—সে একা নয়।

কিছুদিন পর এক বিকেলে মেয়েটির একটি ফোন এল।

কণ্ঠে অদ্ভুত অস্থিরতা।

সে বলল,

"আমার খুব ভয় করছে।"

"কী হয়েছে?"

"আমি আর এই বাড়িতে থাকতে চাই না।"

সে অবাক হয়ে গেল।

"কেন?"

মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

"আমি ঢাকায় চলে যাব।"

"কার কাছে?"

সে কয়েকজন আত্মীয়ের কথা বলল।

তার কণ্ঠে এমন এক জেদ ছিল, যেন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

সে অনেকক্ষণ মন দিয়ে শুনল।

তারপর খুব শান্তভাবে বলল,

"রাগের মাথায় বাড়ি ছেড়ে যাওয়া কোনো সমাধান নয়।"

ওপাশ থেকে উত্তর এল,

"কিন্তু এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।"

সে বলল,

"যত কষ্টই হোক, অপরিচিত বা দূরের মানুষের ওপর ভরসা করে বাড়ি ছেড়ে যেও না। আগে ভেবে দেখো।"

মেয়েটি চুপ করে রইল।

সেদিনের কথোপকথন শেষ হলেও তার মনটা অদ্ভুত অস্থির হয়ে রইল।

কেন জানি মনে হচ্ছিল—

মেয়েটি যেন খুব বড় কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

সন্ধ্যায় নিজের কাজ শেষ করে সে কিছুটা সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটাচ্ছিল।

হঠাৎ একটি ভিডিও তার চোখে পড়ল।

একটি নতুন অ্যাকাউন্ট।

নামটি তার কাছে অচেনা।

কিন্তু ভিডিওর কিছু বিষয় তার সন্দেহ জাগাল।

সে বিষয়টি নিয়ে বেশি কিছু ভাবতে চায়নি।

তবু কৌতূহলবশত কিছু তথ্য মিলিয়ে দেখল।

তার অভ্যাস ছিল—কোনো অভিযোগ করার আগে নিশ্চিত হওয়া।

অল্প সময়ের মধ্যেই তার সন্দেহ আরও দৃঢ় হলো।

সে সরাসরি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল।

উত্তর এল,

"না, এটা আমার না।"

সে আরেকবার জিজ্ঞেস করল।

উত্তর একই।

সে আর কিছু বলল না।

নিজের জানা কিছু উপায়ে বিষয়টি যাচাই করল।

তারপর নিশ্চিত হলো—

মেয়েটি সত্য বলছে না।

তার বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্যতা তৈরি হলো।

মিথ্যাটা বড় ছিল না।

কিন্তু তার কাছে সত্য লুকানোর বিষয়টাই বেশি কষ্টের ছিল।

সে নিজেকে প্রশ্ন করল—

"যাকে আমি এতটা বিশ্বাস করি, সে কেন মিথ্যা বলবে?"

অনেকক্ষণ কোনো উত্তর পেল না।

শেষ পর্যন্ত সে শুধু লিখল,

"যদি সত্যিটা বলতে, তাহলে হয়তো আরও ভালো লাগত।"

মেয়েটি বারবার ক্ষমা চাইতে লাগল।

কিন্তু তখন তার মনটা ভীষণ খারাপ।

সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দিল।

নিজেকেও দূরে সরিয়ে নিল।

কিন্তু সেই দূরত্ব বেশিক্ষণ টিকল না।

মাত্র কিছু সময় পরই তার ভেতরে আরেকটি অনুভূতি কাজ করতে শুরু করল।

সে ভাবল—

"মেয়েটা তো এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয়। আমি যদি রাগ করে দূরে থাকি, আর সে যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে?"

এই চিন্তাই তার সব অভিমানকে হারিয়ে দিল।

সে আবার যোগাযোগ করল।

মেয়েটিও সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল।

ক্ষমা চাইল।

বলল,

"আমি ভয় পেয়েছিলাম, তাই সত্যটা বলিনি।"

সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তারপর শুধু বলল,

"পরেরবার সত্যটা বলবে। সত্য যত কঠিনই হোক, মিথ্যার চেয়ে ভালো।"

মেয়েটি নীরবে সম্মতি জানাল।

সেদিনের পর তাদের মধ্যে আগের মতোই কথা চলতে লাগল।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে সে লক্ষ্য করল—

এখন মেয়েটি নিজের ছোটখাটো বিষয়ও তাকে জানায়।

কখন খেয়েছে।

কখন ওষুধ খেয়েছে।

কখন মন খারাপ হয়েছে।

কখন ভালো লেগেছে।

এসব খুব সাধারণ বিষয়।

কিন্তু এই সাধারণ বিষয়গুলোই অজান্তে দুটি মানুষের দূরত্ব কমিয়ে দিচ্ছিল।

অন্যদিকে সে নিজেও বুঝতে পারছিল—

মেয়েটির কোনো কষ্টের কথা শুনলে এখন আর শুধু একজন ভাইয়ের মতো উদ্বেগ হয় না।

এর চেয়ে একটু বেশি কিছু অনুভব করে।

তবে সেই অনুভূতির নাম সে তখনও জানত না।

জানতও না, সামনে এমন একটি মুহূর্ত অপেক্ষা করছে—

যেখানে একটি মাত্র বাক্য তার জীবনের সমস্ত হিসাব বদলে দেবে।

একটি স্বীকারোক্তি...

যা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
23 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব