ভাই-বোনের সম্পর্কের শুরুঃ
জীবনের সবচেয়ে গভীর সম্পর্কগুলোর শুরু অনেক সময় খুব সাধারণ হয়।
কোনো প্রতিশ্রুতি থাকে না।
কোনো স্বপ্ন থাকে না।
থাকে শুধু মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস।
সেদিনের সেই ছোট্ট পরিচয়ের পর কয়েক দিন তেমন কোনো যোগাযোগই হয়নি।
সে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত।
মানুষের কাজ, সামাজিক দায়িত্ব, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে দিনগুলো দ্রুত কেটে যাচ্ছিল।
অন্যদিকে মেয়েটিও নিজের পড়াশোনা আর পরিবার নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
মাঝেমধ্যে প্রয়োজন হলে একটি-দুটি বার্তা আসত।
"ভাই, একটা বিষয় জানতে চাই।"
"ভাই, একটু সাহায্য করবেন?"
ব্যস, এর বেশি কিছু নয়।
সে উত্তর দিত।
প্রয়োজন শেষ হলে কথাও শেষ হয়ে যেত।
অকারণে গল্প করার অভ্যাস তার ছিল না।
মেয়েটিও ধীরে ধীরে বুঝে গিয়েছিল—এই মানুষটি অন্যদের মতো নয়।
সে কখনো অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করে না।
কখনো ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করে না।
কোনো কথায় অশালীন ইঙ্গিত থাকে না।
তার কথায় ছিল সম্মান।
আচরণে ছিল ভদ্রতা।
আর এই কারণেই হয়তো মেয়েটি খুব অল্প সময়েই তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল।
একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ একটি বার্তা এল।
"ভাই, একটা কথা বলব?"
সে উত্তর দিল,
"বল।"
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর লেখা ভেসে উঠল—
"আজ খুব মন খারাপ।"
সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল।
কারণ সে জানত, অনেক সময় মানুষ শুধু একজন শ্রোতা খোঁজে।
পরামর্শ নয়।
কিছুক্ষণ পর মেয়েটি নিজেই লিখল,
"কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।"
সে আর জোর করল না।
শুধু লিখল,
"আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। সব সময় একরকম থাকে না।"
এই ছোট্ট উত্তরটুকুই ছিল তার স্বভাব।
সে কখনো কারও ব্যক্তিগত জীবনে অযথা প্রবেশ করত না।
কিন্তু ধীরে ধীরে সে একটি বিষয় লক্ষ্য করতে শুরু করল।
মেয়েটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই মন খারাপের লেখা দেখা যায়।
কখনো অভিমান।
কখনো কান্না।
কখনো নীরবতার ইঙ্গিত।
সে এসব পড়ত।
তারপর আবার নিজের কাজে ফিরে যেত।
তার মনে হতো—
"মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে বিচার করার অধিকার আমার নেই।"
তবুও মানুষের কষ্ট দেখলে তার ভেতরটা নরম হয়ে যেত।
এদিকে বিদেশে থাকা তার সেই বন্ধুর সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্কের কথা সে জানত।
তাদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো।
কখনো সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার খবর।
আবার কয়েক দিন পর সব ঠিক হয়ে যাওয়ার খবর।
এসব দেখে সে মাঝে মাঝে অবাক হতো।
তার মনে একটি প্রশ্ন জাগত—
ভালোবাসা যদি মানুষকে বারবার কাঁদায়, তাহলে সেই ভালোবাসার সৌন্দর্য কোথায়?
একদিন রাতে সে নিজের মনে একটি কথা ভেবেছিল।
কাউকে বলেনি।
শুধু নিজের কাছেই স্বীকার করেছিল—
"যদি কখনো আমার জীবনে এমন একজন মানুষ আসে, তাহলে আমি তাকে অকারণে কাঁদতে দেব না।"
এটি কোনো প্রেমের অনুভূতি ছিল না।
কোনো নির্দিষ্ট মানুষকে নিয়ে স্বপ্নও ছিল না।
এটি ছিল একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের দায়িত্ববোধের ধারণা।
তার কাছে সম্পর্ক মানেই ছিল নিরাপত্তা।
সম্মান।
বিশ্বাস।
কিছুদিন পর আবার মেয়েটির কাছ থেকে বার্তা এল।
সে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শ চাইল।
বিষয়টি ছিল খুব ব্যক্তিগত।
সে মন দিয়ে শুনল।
তারপর খুব শান্তভাবে বলল,
"যে সিদ্ধান্ত তোমার সম্মান, পরিবার আর ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে, সেটাই নিও।"
মেয়েটি লিখল,
"তুমি সব সময় এমন করে কথা বলো কেন?"
সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কেমন?"
উত্তর এল,
"মনে হয় কেউ বিচার করছে না। শুধু বুঝতে চাইছে।"
বার্তাটি পড়ে সে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।
তারপর লিখেছিল,
"মানুষকে বিচার করা সহজ। বুঝতে চেষ্টা করা কঠিন।"
সেদিনের পর থেকে তাদের যোগাযোগ একটু একটু করে বাড়তে লাগল।
তবে সম্পর্কের পরিচয় একটাই—
ভাই আর বোন।
মেয়েটি তাকে "ভাই" বলেই ডাকত।
সেও তাকে ছোট বোনের মতোই দেখত।
কখনো সীমা অতিক্রম করার কথা ভাবেনি।
বরং নিজের মনকে বারবার মনে করিয়ে দিত—
"এই সম্পর্কের সম্মান রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।"
এই সময়ে তার নিজের জীবনও সহজ ছিল না।
অভাব তখনও ছিল।
ব্যবসার পরিকল্পনা বারবার থেমে যাচ্ছিল।
মানুষের জন্য কাজ করেই দিনের বড় অংশ কেটে যেত।
তারপরও যখনই মেয়েটি কোনো সমস্যায় পড়ত, সে যতটুকু পারত সাহায্য করত।
কারণ সে মানুষকে সাহায্য করার সময় কখনো হিসাব করত না—
এই মানুষটি আমার কে?
সে শুধু ভাবত—
এই মানুষটির এখন আমাকে প্রয়োজন।
কিন্তু সে জানত না...
এই সাধারণ সাহায্য, এই সম্মান, এই বিশ্বাস—একদিন এমন এক অনুভূতির জন্ম দেবে, যা তাদের দুজনের জীবনকেই অন্য পথে নিয়ে যাবে।
আর সেই পথের শুরু হবে একটি অসুস্থতা দিয়ে।
একটি হাসপাতাল দিয়ে।
আর একটি দীর্ঘ রাত দিয়ে—
যে রাতের পর তারা আর আগের মতো থাকবে না।
ভাঙা স্বপ্নের পরে — ৪র্থ পর্ব
26
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating
কোন মন্তব্য নেই