ভাঙা স্বপ্নের পরে — ২য় পর্ব

মানুষের নেতা হওয়ার পথেঃ


একজন মানুষ কখন নেতা হয়ে ওঠে?

নির্বাচনে জিতে?

কোনো বড় দলের পদ পেয়ে?

নাকি হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়ে?

সে এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক আগেই নিজের ভেতরে খুঁজে পেয়েছিল।

তার কাছে নেতা মানে ছিল—যে মানুষের প্রয়োজনে আগে পৌঁছে যায়, নিজের প্রয়োজনে পরে।

এই বিশ্বাস নিয়েই তার পথচলা।

কৈশোর পেরোতেই তার দিনগুলো যেন আর নিজের থাকল না। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের কাজ করার আগেই কারও না কারও ফোন আসত। কোথাও একজন বৃদ্ধ অসুস্থ। কোথাও কোনো দরিদ্র পরিবার সরকারি ভাতা পাওয়ার জন্য কাগজপত্র বুঝতে পারছে না। কোথাও দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ। আবার কোথাও কোনো শিক্ষার্থীর ভর্তি নিয়ে সমস্যা।

অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—এসব সমস্যার সমাধান করার মতো ক্ষমতা তার হাতে ছিল না।

তবুও মানুষ তাকে খুঁজত।

কারণ মানুষ জানত, এই ছেলেটি অন্তত চেষ্টা করবে।

সে কখনো কাউকে ফিরিয়ে দিত না।

যার কাজ সে নিজে করতে পারত না, তার জন্য এমন একজন মানুষ খুঁজে বের করত, যিনি করতে পারবেন।

অনেক সময় সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরত। মা জিজ্ঞেস করতেন,

— "সারাদিন কোথায় ছিলি?"

সে হেসে বলত,

— "এদিক-ওদিক একটু কাজ ছিল।"

মা হয়তো বিশ্বাস করতেন।

কিন্তু পুরো সত্য জানতেন না।

বাবাও জানতেন না।

তারা জানতেন না, তাদের ছেলে ধীরে ধীরে এলাকার মানুষের কাছে একটি পরিচিত মুখ হয়ে উঠছে।

তার কাছে কোনো দলের মানুষ বলে আলাদা কিছু ছিল না।

একই দিনে হয়তো এক রাজনৈতিক দলের নেতার কাজ করে দিয়েছে, আবার বিকেলে প্রতিপক্ষ দলের একজন কর্মীর অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।

অনেকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করত,

— "তুই সবার সঙ্গে এত ভালো সম্পর্ক রাখিস কীভাবে?"

সে হেসে উত্তর দিত,

— "মানুষের বিপদে আগে দল আসে না, মানুষ আসে।"

এই একটি বিশ্বাসের কারণেই কেউ তাকে ঘৃণা করতে পারত না।

তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল—সে কারও বিরুদ্ধে অপপ্রচার করত না।

কোনো বৈঠকে, কোনো চায়ের দোকানে, কোনো আড্ডায় অন্যের চরিত্র নিয়ে কথা বলতে তাকে দেখা যেত না।

সে বলত,

"মানুষকে ছোট করে নিজে বড় হওয়া যায় না।"

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকার অনেক প্রবীণ মানুষও তাকে স্নেহ করতে শুরু করলেন।

কেউ বলতেন,

"তুই একদিন ইউনিয়নের দায়িত্ব নেবি।"

কেউ বলতেন,

"তোকে সামনে এগোতে হবে।"

প্রথমে সে এসব কথায় হাসত।

কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, মানুষ তাকে শুধু ভালোবাসছে না—বিশ্বাসও করছে।

সেই বিশ্বাসই তার কাঁধে নতুন দায়িত্ব চাপিয়ে দিল।

এদিকে নিজের জীবনটা খুব সহজ ছিল না।

অনেকেই ভাবত, মানুষের এত কাজ করে নিশ্চয়ই তার অনেক টাকা আছে।

বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।

অনেক দিন এমন গেছে, নিজের পকেটে এক কাপ চা খাওয়ার টাকাও ছিল না।

তবুও কারও ওষুধ লাগলে, কারও যাতায়াতের ভাড়া লাগলে, নিজের হাতে যা থাকত সেটুকুই দিয়ে দিত।

একদিন এক বন্ধু বিরক্ত হয়ে বলেছিল,

— "নিজের অবস্থা দেখেছিস? তুই নিজেই তো কষ্টে আছিস!"

সে মুচকি হেসে বলেছিল,

— "আজ যদি আমার কাছে দশ টাকা থাকে, আর কারও কাছে এক টাকাও না থাকে, তাহলে আমার দশ টাকাই তার জন্য অনেক বড়।"

বন্ধুটি মাথা নেড়ে বলেছিল,

— "তুই বদলাবি না।"

সে উত্তর দিয়েছিল,

— "মানুষের উপকার করতে পারলে বদলানোর দরকার কী?"

তবে তারও স্বপ্ন ছিল।

সে কখনো অন্যের টাকায় বড় হতে চায়নি।

দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার স্বপ্নও তার ছিল না।

সে বিশ্বাস করত, নিজের মাটিতেই দাঁড়িয়ে সফল হওয়া যায়।

সে ছোট ছোট ব্যবসার পরিকল্পনা করত।

কাগজে লিখে হিসাব করত।

কোথায় দোকান নিলে ভালো হবে, কীভাবে শুরু করলে কম পুঁজিতে ব্যবসা দাঁড় করানো যাবে, কীভাবে একদিন অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা যাবে—এসব নিয়েই ভাবত।

কিন্তু পরিকল্পনা আর বাস্তবতা এক ছিল না।

অর্থের অভাব বারবার তার পথ আটকে দিত।

যেখানে ব্যবসা শুরু করার কথা, সেখানে মানুষের সমস্যার পেছনেই সময় চলে যেত।

বন্ধুরা বলত,

— "আগে নিজের জীবন গুছিয়ে নে।"

সে বলত,

— "একদিন সব হবে, ইনশাআল্লাহ।"

তার বিশ্বাস ছিল অটুট।

সে ভাবত, আল্লাহ যদি চান, একদিন সে সফল হবেই।

তারপর আরও বেশি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবে।

এসএসসি পরীক্ষায় সে সফল হতে পারেনি।

এই ব্যর্থতা অনেকের চোখে তাকে ছোট করে দিয়েছিল।

কেউ কেউ আড়ালে বলত,

"নিজের পড়াশোনা ঠিক রাখতে পারল না, আবার সমাজ বদলাবে!"

সে এসব শুনত।

কষ্টও পেত।

কিন্তু উত্তর দিত না।

সে জানত, একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া মানেই জীবনে ব্যর্থ হওয়া নয়।

বইয়ের সার্টিফিকেট মানুষের পরিচয় হতে পারে, কিন্তু চরিত্রের সার্টিফিকেট দেয় সমাজ।

আর সে সেই সার্টিফিকেট অর্জনের চেষ্টাই করছিল।

একসময় তার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে গেল যে স্থানীয় বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তাকে ডাকতে শুরু করল মানুষ।

বয়সে ছোট হলেও তার কথা মন দিয়ে শুনতেন অনেক প্রবীণ মানুষ।

কারণ তার ভাষায় উত্তেজনা কম, যুক্তি বেশি ছিল।

সে মানুষকে বিভক্ত করার কথা বলত না।

সে বলত,

"একটা গ্রামের শক্তি তার ঐক্য।"

এই কথাগুলো মানুষ মনে রাখত।

এদিকে তার বাবা মাঝে মাঝে বুঝতে শুরু করেছিলেন—ছেলেটা হয়তো রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

তিনি কয়েকবার নিষেধও করেছিলেন।

বলেছিলেন,

"রাজনীতি খুব কঠিন পথ। সবাইকে বিশ্বাস করা যায় না।"

সে বাবার কথা মন দিয়ে শুনেছিল।

কিন্তু উত্তর দিয়েছিল খুব শান্তভাবে—

"আমি রাজনীতি করতে চাই না, আমি মানুষের পাশে থাকতে চাই। যদি মানুষের পাশে থাকতে গিয়ে রাজনীতির পথ ধরতে হয়, তাহলে সেই পথও আমি ছাড়ব না।"

বাবা আর কিছু বলেননি।

শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন।

হয়তো একজন বাবার মনে অজানা আশঙ্কা জন্মেছিল।

কিন্তু ছেলেটা তখনও বুঝতে পারেনি—

জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ রাজনীতির মাঠে নয়...

অপেক্ষা করে আছে তার নিজের হৃদয়ের ভেতর।

আর সেই যুদ্ধের শুরু হবে এমন একজন মানুষকে দিয়ে, যাকে প্রথম দেখার আগ পর্যন্ত সে কখনো নিজের ভাগ্যের অংশ বলেও ভাবেনি।
27 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব