এই বলে নীলাঞ্জনা খন্দকার মিরাজের নাম ধরে তাকে ডাকতে লাগলেন। মায়ের ডাক শুনে মিরাজ এক ছুটে ড্রয়িং রুমে এসে হাজির হলো এবং কিঞ্চিত বিরক্ত হয়ে তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো-
মিরাজ: কি হলো মা, আমায় ডাকছো কেন?
নীলাঞ্জনা খন্দকার: ডাকছি কি আর সাধে, এবার তো আমাদের বাড়ি ফিরে যেতে হবে নাকি!
নীলাঞ্জনা খন্দকারের কথাটা শুনে মিরাজের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মতো অবস্থা!
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে চাপা স্বরে তার মাকে উদ্দেশ্য করে আবার বলতে লাগলো-
মিরাজ: কিন্তু মা, বাবা যে আমাদের নিয়ে আসার সময় বলল এটাই আমাদের আসল বাড়ি। আজ থেকে আমরা এই বাড়িতেই থাকবো।
নীলাঞ্জনা খন্দকার: কিন্তু সেদিন এখনো আসেনি রে বাবা,, সেদিন যেদিন আসবে তখন তুই আর আমি নিশ্চয়ই এ বাড়িতে থাকব। সেদিন এ বাড়িতে থাকতে কেউ আমাদের কোন বাধা দিতে পারবে না!
মিরাজ: মা, তাহলে কি কেউ তোমাকে আর আমাকে এ বাড়িতে থাকতে বারণ করে দিয়েছে!
মিরাজের কথাটা শুনে নীলাঞ্জনা খন্দকার কোন কিছু না বলে তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন! তা দেখে মিরাজ আবার বলতে লাগলো-
মিরাজ: মা, বলো না,, কে আমাদের এই বাড়িতে থাকতে বারণ করেছে!
কি হলো মা, চুপ করে আছো কেন! কি দোষ করেছি আমরা, যে আমাদের এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে! মা, বলো না গো......
মিরাজের কথাগুলো শুনে বেশ অনেকটা বিরক্তিত হলেন নীলাঞ্জনা খন্দকার। রাগের মাথায় মিরাজের বা গালে একটা চড় মারতে যাবেন এমন সময় অর্পিতা চৌধুরী এসে ওনার হাতটা আটকালেন,, এবং গম্ভীর গলায় বলতে লাগলেন-
অর্পিতা চৌধুরী: এই তোমার সন্তানের প্রতি ভালোবাসা নীলা,, ওর বলা দুটো কথাও তুমি সহ্য করতে পারছো না! আর ও তো উচিত কথাই বলেছে,, কি অপরাধ করেছ তোমরা যে আমরা তোমাদের এ বাড়িতে থাকতে বারণ করেছি! ওর প্রশ্নের উত্তর দাও,, চুপ করে থেকো না!
অর্পিতা চৌধুরীর কথাগুলো শুনে বেশ অনেকটা চটে গেলেন নীলাঞ্জনা খন্দকার। রাগে ওনার চোখজোড়া লাল হয়ে গেছে।
"পারেন তো এই মুহূর্তে অর্পিতা চৌধুরীকে গিলে খেয়ে ফেলবেন।"
অর্পিতা চৌধুরী তা গ্রাহ্য না করে আবার বলতে লাগলেন-
অর্পিতা চৌধুরী: কি হলো নীলা,, এখনো চুপ করে আছো যে! তোমার ছেলের প্রশ্নের উত্তর কি তোমার কাছে নেই!
যদি না থেকে থাকে তাহলে বরং আমিই ওর প্রশ্নের উত্তরটা দিয়ে দিই। কি বলো তুমি!....
অর্পিতা চৌধুরীর পরবর্তী কথাগুলো শুনে আর চুপ করে থাকতে পারলেন না নীলাঞ্জনা খন্দকার।
উঁচু স্বরে বলে উঠলেন-
নীলাঞ্জনা খন্দকার: এই অর্পিতা চৌধুরী। তুই কি বলতে........ (পুরোটা বলতে না দিয়ে)
অর্পিতা চৌধুরী: (নীলাঞ্জনা খন্দকারের দিকে আঙুল উঠিয়ে) এই আস্তে,, গলা নামিয়ে কথা বল। আমি কোন কাঠের পুতুল নই যে তুই আমায় যা বলবি তাই সহ্য করে নেব! একুশ বছর ধরে সবাই যেই অর্পিতা চৌধুরীকে দেখছে,, এখন আমি আর সেই অর্পিতা চৌধুরী নই।
এই অর্পিতা চৌধুরী আগের অর্পিতা চৌধুরীর মতো অন্যায় - অবিচার দেখলে মুখ বুজে সব সহ্য করে না। এই অর্পিতা চৌধুরী অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করে! অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
তাই বারবার করে বলছি- এখন এখানে অযথা সিনক্রিয়েট না করে তোর ছেলেটাকে নিয়ে এ বাড়ি থেকে দূর হ! নইলে তোর সাথে কি হতে পারে সেটা বোধহয় তুই এতক্ষণে খুব ভালো করেই বুঝে গেছিস!
অর্পিতা চৌধুরীর কথাগুলো শুনে পুরো তেলে - বেগুনে জ্বলে উঠলেন নীলাঞ্জনা খন্দকার। রাগে গজগজ করতে করতে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু তিনি বলার মত কোন ভাষাই খুঁজে পাচ্ছেন না!
তাই তিনি মিরাজের একটা হাত খপ করে ধরে নিয়ে তাকে টানতে টানতে চৌধুরী বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে লাগলেন। ওনাদের পেছন পেছন আরিয়ান চৌধুরীও যেতে লাগলেন।
মিরাজ যেতে যেতে পেছনে ঘুরে তাকিয়ে তার দাদিকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো-
মিরাজ: (মৃদু হেসে) "দাদি" আমি গেলাম! আমি তোমাকে আবার দেখতে আসবো! তুমিও আমাকে দেখতে যেও কেমন!
কথাটা বলে মিরাজ তার দাদিকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাতে লাগলো।
তা দেখে তার দাদিও হাত নাড়িয়ে তাকে বিদায় জানাতে লাগলেন। এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর ওনাদেরকে আয়েশা চৌধুরী অস্পষ্ট রূপে দেখতে লাগলেন। কারণ ওনারা বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়ি নিয়ে কোথায় জানি চলে যাচ্ছেন।
এ ঘটনাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না আয়েশা চৌধুরী। ওনার মনে হতে লাগলো, কেউ ওনার কলজেটা ছিড়ে দু - টুকরো করে দিচ্ছে! অশ্রুসিক্ত চোখ নিয়ে উনি ওনার রুমের দিকে চলে গেলেন। (বয়স বাড়ার কারণে আয়েশা চৌধুরী নিচ তলা থেকে একটা একটা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরতলায় যেতে পারেন না তাই ওনাকে থাকার জন্য নিচ তলায় একটি রুম দেওয়া হয়েছে।)
নিজের রুমে গিয়ে আয়েশা চৌধুরী দরজার লক করে বিছানায় বসে একঘেয়ে কাঁদতে লাগলেন।
*
বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেছে আয়েশা চৌধুরী দরজা খুলে বাইরে বের হননি। একথা শোনার পর চৌধুরী বাড়ির সবাই অস্থির হয়ে উঠলো! সবাই গিয়ে দরজায় কড়া নেড়ে আয়েশা চৌধুরীকে ডাকতে লাগলো! কিন্তু ভেতর থেকে কোন আওয়াজই আসছেনা!
৯/ সংসার
84
Views
16
Likes
3
Comments
5.0
Rating

সকল মন্তব্যগুলো (3)
চমৎকার হয়েছে
চমৎকার
অসাধারণ একটি গল্প,, খুব ভালো লাগলো।