জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিতে ই সূর্যের এক ছটা আলো এসে পড়ল গভীর ঘুমে মগ্ন রেহানের উপর। তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে মৌ। আর মনে মনে ভাবছে- ইস,, ঘুমের মধ্যে রেহান ভাইয়াকে কত্ত সুন্দর দেখাচ্ছে! পুরো দু-তিন বছরের শিশুর মতো মায়াবী চেহারাটা। "হে খোদা তুমি দেখো" রেহান ভাইয়া যেন সাত জন্মের জন্য আমারই থাকে,, তুমি ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিও না। রেহান ভাইয়া আমার শুধুই আমার,, আমি তাকে আর অন্য কারো হতে দেব না,, অন্য কারোরই না।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রেহানের গলা পেয়ে মৌ এর চমক ভাঙলো। লক্ষ্য করল রেহান ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। তাই সে রেহানের বিছানার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ঠাট্টা করে বলতে লাগলো-
মৌ: উঠে পড়েছো রেহান ভাইয়া। নাও নাও ফ্রেশ হয়ে নাও,, তুমি না বলেছিলে আজ তোমার একটা চাকরি ইন্টারভিউ আছে! পরে তো আবার বলবে- আজ বাড়ির সবাই নাকি সরষের তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিল নাকি; যে আজ আমার একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে যারা সত্ত্বেও কেউ আমাকে একটু ডাকতে আসে নি।
মৌ এর কথাগুলো শুনে ঘুম ঘুম চোখে বেশ বিরক্তি নিয়ে রেহান একটু রাগান্বিত গলায় বলতে লাগলো-
রেহান: মৌ,, তোর এই বদ অভ্যাসটা কি কোনদিনও যাবে না নাকি। সারাক্ষণ শুধু বকবক করেই চলেছে তো করেই চলেছে! কোন সেন্স নেই,, ননসেন্স কোথাকার। সর,, ফ্রেস হতে হবে আমাকে।
এই বলে মৌ এর হাত থেকে নিজের টাওয়ালটা নিয়ে ফ্রেশ হতে বাথরুমের দিকে চলে গেল রেহান।
এদিকে মৌ তো পুরো রেগে আগুন! অবশ্য এমনিতে সবসময় সে ঠান্ডা মেজাজ নিয়েই থাকে। হয়তো পরিস্থিতির সাথে সাথে নিজেকে পাল্টাতে হয়েছে তাকে! ছোটবেলায় তার বাবা মারা যায়। আর সেই শোকে দীর্ঘ দশ বছর ধরে তার মা মেন্ডাল হসপিটালে ভর্তি আছেন। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে কিন্তু কোন ডাক্তার'ই আজ পর্যন্ত তার মাকে সুস্থ করে তুলতে পারেননি! এই সবকিছুর জন্য মৌ সবসময় নিজেকে দায়ী ভাবে। কারণ- ছোটবেলায় অত্যন্ত জেদি ছিল। সে যা চাইতো তাই তাকে এনে দিতে হতো। নইলে সে খাওয়া-দাওয়া, পড়াশোনা, স্নান সবকিছু বাদ দিয়ে সারাক্ষণ নিজেকে তার ঘরে বন্দী করে রাখত! ঘর হতে একবারটি বেরোতো না। কারো সাথে কোন কথাও বলত না! মৌ তার বাবা-মা'র একমাত্র সন্তান। তাই মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তার বাবা-মা আর কিছুতেই থাকতে পারতেন না। মধ্যবিত্ত হওয়া সত্ত্বেও ওনারা মৌ যা চাইতো তাই তাকে এনে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। এমনি একদিন-
মৌ বায়না ধরেছে সে কক্সবাজার বেড়াতে যাবে। কি আর করেন মৌ এর বাবা। ক'দিনের জন্য অফিস থেকে ছুটি নিয়ে গাড়ি ছোটালেন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে পথে মৌ লক্ষ করল রাস্তার পাশে একজন বৃদ্ধা লোক আইসক্রিম বিক্রি করছে। আর সে তো পুরোই আইসক্রিম পাগল,, তাই তার আইসক্রিম চাই, চাই, চাই। গাড়ি রাস্তার পূর্ব পাশে সাইট করে তার বাবা গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন মৌ এর আবদার রক্ষা করার জন্য। হাঁটতে হাঁটতে তিনি রাস্তার পশ্চিম পাশে সেই বৃদ্ধা আইসক্রিম ওয়ালার কাছে এসে পৌঁছালেন। কিছুক্ষণ পর তিনি মৌ এর জন্য আইসক্রিম কিনে নিজের গাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছিলেন,, এমন সময় দূর থেকে খুব স্পিডে একটা গাড়ি আসছিল! তিনি তা লক্ষ্য না করে রাস্তার পূর্ব পাশে ফিরে যাচ্ছিলেন হঠাৎ গাড়িটা এসে ওনাকে জোরে একটা ধাক্কা মেরে চলে যায় এবং তিনি সেখানেই মারা যান। সেই শোকে পাগল হয়ে যান মৌ এর মা। আর তারপর থেকে মৌ তার বড় খালামণি'র বাড়িতে বড় হয়েছে এবং ছোট থেকেই রেহানকে নিজের উপযুক্ত জীবনসঙ্গী হিসেবে গণ্য করে এসেছে! কিন্তু রেহান কোনদিনও মৌকে সেই চোখে দেখেনি! রেহান সব সময় মৌকে নিজের ছোট বোনের চোখে দেখে এসেছে। কিন্তু মৌ এর বিশ্বাস একদিন রেহান নিজে এসে তাকে বলবে; মৌ আই লাভ ইউ,, ডু ইউ লাভ মি..
আর মৌ সেদিন রেহানকে জড়িয়ে ধরে বলবে; হ্যাঁ রেহান ভাইয়া,, "আই লাভ ইউ টু" আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি।
আজ বহুদিন পর প্রচন্ড রেগে গিয়েছে মৌ! রাগে গজ গজ করতে করতে রেহানের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে একটা একটা করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো সে। নিচে নেমে এসে মৌ যা দেখল তা দেখে তো তার চোখ ছানাবড়া! রেহান এই প্রথমবার চাকরি ইন্টারভিউ দিতে যাবে! তাই সারা বাড়িতে হুলস্থুল লেগে গেছে। কেউ রান্না করছে,, কেউ থলে নিয়ে বাজারে যাচ্ছে কেউ আবার তার ইন্টারভিউ এর জন্য পোশাক সিলেক্ট করছে। আজ কারো একবিন্দু দম ফেলার জো নেই! সবাই নানা রকম কাজে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ সবার দিকে তাকিয়ে থেকে মৌ কিচেনে ঢুকতে ঢুকতে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো-
মৌ: আদৌ রেহান ভাইয়া চাকরিটা পাবে কিনা তার কোন গ্যারেন্টি নেই! আর কারো আদিখ্যেতা'র শেষ নেই।
মৌ এর এই আচরণটা লক্ষ্য করলেন অর্পিতা চৌধুরী,, (রেহানের মা)! মনে মনে নানান কথা ভাবতে ভাবতে মৌকে জিজ্ঞেস করলেন-
অর্পিতা চৌধুরী: মৌ,, মা কি হয়েছে তোমার! কি বলছো বিড়বিড় করে!
অর্পিতা চৌধুরীর কথাটা মৌ এর কানে পৌঁছাতে একপ্রকার চমকে উঠলো সে এবং একটু করুন স্বরে বলতে লাগলো-
মৌ: খালামণি,, আমি কি সবসময় বকবক করি! আমার কোন সেন্স নেই! আমি কি ননসেন্স! কেন তোমার ছেলের সব সময় আমাকে এভাবে বলে? আমার কি খারাপ লাগে না বুঝি!
মৌ এর কথাগুলো শুনে অর্পিতা চৌধুরী ফিনকি হাসিতে মেতে পড়লেন। কিছুতেই আর হাসি থামাতে পারছেন না তিনি। এ দৃশ্য দেখে মৌ তো বেজায় চটে গেছে। একটু অভিমানী গলায় অর্পিতা চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে আবার বলতে লাগলো-
মৌ: খালামণি তুমিও,, তুমিও তোমার ছেলের সাথে হাত মিলিয়ে আমায় এভাবে খেপাচ্ছো তাই না! তোমরা সবাই একজন হয়ে আমার সাথে এমন করছো। সব বুঝে গেছি আমি! যাও,, আর কারোর সাথে কথা বলবো না আমি।
কথাগুলো বলতে বলতে মৌ এর দুচোখ বেয়ে দু-একফোটা করে জল ঝরতে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে অর্পিতা চৌধুরী হাসি থামে কিছু একটা বলতে যাবেন এমন সময় হঠাৎ লক্ষ করলেন কিচেনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রেহান। রাগে তার চোখ জোড়া পুরো লাল বর্ণ ধারণ করে ফেলেছে!
( কি হবে এরপর! রেহান কি মৌকে আবার বকবে! মৌকে এত বকাবকি করে কেন রেহান! মৌ'ই কি আমাদের গল্পের নায়িকা হবে! নাকি অন্য কেউ আসবে রেহানের জীবনে! জানতে হলে অবশ্যই চোখ রাখতে হবে সংসার ধারাবাহিক গল্পের পরবর্তী পর্বগুলোতে! )
{ আবারো ফিরে এলাম আপনাদের মাঝে একটি ভিন্ন স্বাদের ধারাবাহিক গল্প সংসার নিয়ে। প্রথম পর্ব কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন। সাথে লাইক, রেটিং, মন্তব্য করতে একদম ভুলবেন না। আর আমায় ফলো করতে একদমই ভুলবেন না। }
১/ সংসার
272
Views
24
Likes
4
Comments
4.9
Rating

সকল মন্তব্যগুলো (4)
চমৎকার
super
say
খুব খুব সুন্দর লিখেছেন