তা দেখে অর্পিতা চৌধুরী বুঝে গেলেন- রেহান আবার মুখ খুললে মৌকে আরো দু চার কথা শুনিয়ে দেবে! এমনিতেই মৌ এর এখন যা অবস্থা,, রেহান আবার মুখ খুললে একটা সর্বনেশে কান্ড ঘটবে। তাই তিনি হাতজোড় করে রেহানকে চুপ করে থাকার জন্য ইশারা করতে লাগলেন। তা দেখে রেহান কিছুটা উঁচু গলায় বলতে লাগলো-
রেহান: কি ইশারা করছো তুমি মা,, চুপ করে থাকার জন্য! এই মেয়েটা যা শুরু করে দিয়েছে না বাড়িটাতে তারপরও কি চুপ করে থাকা যায়! এই মেয়ে এই কি শুরু করে দিয়েছিস টা কি বাড়িটাতে! সারাদিন ঘরে বসে বসে ইন্ডিয়ান সিরিয়াল গুলো দেখে দেখে তাদের মত ডায়লগ মারা শুরু করে দিয়েছে। কাল থেকে দেখি কখন টিভি চালু করে ইন্ডিয়ান সিরিয়াল দেখা শুরু করে দিস। পড়ালেখার কোন খবর নেই সারাদিন শুধু সিরিয়াল. সিরিয়াল. সিরিয়াল. এই সামনেই না তোর এস.এস.সি পরীক্ষা। পড়ালেখার দিকে ফোকাস না করে সারাদিন কিসব "তেতুল পাতা" "বসু পরিবার" "জগদ্ধাত্রী" "কনস্টেবল মঞ্জু" "নিম ফুলের মধু" এগুলো নিয়ে বসে পড়িস। হয় ঠিকমতো পড়ালেখা কর নয়তো নিজের পথ নিজে মেপে নে! সেখানে আমি কেন বাড়ির কেউ তোকে নিয়ে কোন কথা বলতে যাবে না। আর তোর এই ন্যাকা কান্না বন্ধ কর,, ভাল লাগছে না কিন্তু আমার এসব।
রেহানের কথাগুলো শেষ হতেই মৌ এর দু'চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল ঝরতে লাগলো। এই দৃশ্য দেখে অর্পিতা চৌধুরী মৌকে সান্তনা দেবার জন্য রেহানকে উদ্দেশ্য করে শাসনের সুরে বলতে লাগলেন-
অর্পিতা চৌধুরী: রেহান এবার কিন্তু তুই একটু বেশিই বলে ফেলছিস! দেখছিস না মেয়েটা কাঁদছে! যা ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বোস। আমি তোকে ব্রেকফাস্ট দিচ্ছি।
মায়ের বকুনি খেয়ে রেহান ডাইনিং রুমের দিকে চলে গেল। রেহান চলে যাওয়ার পর অর্পিতা চৌধুরী মৌ এর ডান কাঁধে নিজের বাঁ হাতটা রেখে ধিমে গলায় বলতে লাগলেন-
অর্পিতা চৌধুরী: "মৌ" সোনা মা আমার,, তুমি আর কেঁদো না। রেহানের হয়ে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি। তুমি আর ওর ওপর রাগ করে থেকো না! জানোই তো আমার ছেলেটা একটু রাগী-প্রকৃতির। একবার রাগ উঠলে দু-চার কথা না শুনিয়ে ছাড়ে না। কিন্তু মনের দিক দিয়ে ছেলেটা খুবই ভালো। "বাদ দাও ওসব কথা" এসো ব্রেকফাস্ট করবে এসো।
এই বলে অর্পিতা চৌধুরী মৌকে ডাইনিং রুমে নিয়ে গিয়ে ডাইনিং টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিলেন। এরপর উনিও একটি চেয়ারে বসে পড়লেন। মৌ লক্ষ্য করল তার পাশেই রেহান বসে আছে। তাই ভয়ে ভয়ে কোনমতে নিজের পড়নের ওরনা'র খানিক অংশ দিয়ে দু-চোখের জল মুছতে লাগলো সে! ততক্ষণে কাজের বুয়া শিলা খাতুন টেবিলে সব ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে ফেলেছে। টেবিলে এত কিছু দেখে রেহান তো পুরো অবাক! বিস্ময়সূচক গলায় তার মাকে বলতে লাগলো-
রেহান: "মা" পায়েস, নুডুলস, লুচি আলুর দম, আইসক্রিম, ফলমূল আরো কত কি! এত কিছুর কি প্রয়োজন ছিল! শুধু শুধু অযথা খাটুনি।
রেহানের কথাগুলো শুনে তার মা একগাল হেসে কোন কিছু না বলে তার দিকে একটা পায়েসের বাটি এগিয়ে দিলেন। রেহান সাথে সাথে হাতে একটা চামচ উঠিয়ে নিয়ে পায়েস খেতে শুরু করে দিল। প্রথমবার এক চামচ পায়েস মুখে দিতেই কেন জানি গপগপ করে একবাটি পায়েস খেয়ে নিল রেহান। পায়েস খাওয়া শেষে রেহানের মনে হলো এটা নিশ্চয়ই তার মায়ের হাতের তৈরি করা পায়েস। তাই সে তার মাকে উদ্দেশ্য করে আবার বলতে লাগলো-
রেহান: "মা" পায়েসটা তো তো দারুন হয়েছে! যদিও আগেও অনেকবার তোমার হাতের পায়েস খেয়েছি,, কিন্তু আজকেরটা সবচেয়ে বেস্ট। এক্কেবারে অসাধারণ। থ্যাঙ্ক ইউ মা! জানি এই থ্যাঙ্ক ইউ টা তোমার বানানো পায়েসের কাছে একটি তুচ্ছ শব্দ মাত্র। তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মা।
রেহানের কথাগুলো শেষ হতেই তার মা মুচকি হেসে নরম কন্ঠে বলতে লাগলেন-
অর্পিতা চৌধুরী: রেহান আমার বানানো পায়েসের কাছে নয়,, বরং মৌ এর বানানো পায়েসের কাছে এই ধন্যবাদটা একটি তুচ্ছ শব্দ মাত্র। সব কিছুর আয়োজন তো মৌ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সব একা হাতে করেছে। আমাদের কি শিলাকে পর্যন্ত সে রান্না ঘরে ঢুকতে দেয়নি। তাও বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওকে রান্নাঘর থেকে বের করে আমি আর শিলা মিলে লুচি আর আলুর দমটা করেছি। আর মৌ তো পায়েস বানাতে আমার থেকে আরও বেশি এক্সপার্ট। তাই আজকের পায়েসটা একটু অন্যরকম এবং সবচেয়ে বেস্ট হয়েছে।
মায়ের কথাগুলো শুনে রেহান কিছুক্ষণ হাঁদারামের মতো মৌ এর দিকে ডেবডেব করে তাকিয়ে থেকে হালকা একটু লজ্জা পেয়ে নিজের চেয়ার থেকে উঠে রেডি হতে হবে কথাটা বলে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। তা দেখে ডাইনিং রুমে উপস্থিত সবাই অট্টহাসিতে মেতে উঠলো।
নিজের রুমে গিয়ে রেহান তার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টগুলো একটা ফাইলে ভরে নিল। এরপর ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার জন্য একটি সাদা টি শার্ট,, ব্ল্যাক ব্লেজার ও একটি কালো কালারের প্যান্ট বের করে পড়ে নিল। আর চুলগুলো জেল দিয়ে সুন্দর করে সেট করে নিলো এবং বাঁ হাতে একটা খয়রি কালারের ঘড়ি পড়ে নিল। ফাইলটা ডান হাতে উঠিয়ে নিয়ে দোতলা থেকে আবার নিচতলায় নেমে এলো রেহান। নিচে নেমে এসে সবার প্রথম তার মায়ের দু-পায়ে সালাম করে দোয়া নিল। এরপর বাকি অন্যান্য গুরুজনের'ও পায়ে সালাম করে দোয়া নিয়ে শেষপর্যায়ে তার ফুপি আর আঙ্কেলকে সালাম করতে গেল। কিন্তু রেহান যখন তার ফুপিকে সালাম করতে যাবে তার ফুপি দুপা পিছিয়ে গেলেন এবং ভীষণ কর্কশ গলায় বলতে লাগলেন-
আচল চৌধুরী: এই ছেলে এই,, কিসের সালাম করিস! "তুই একটা সর্বনাশ" আর তোর এই সর্বনাশা হাতের ছোঁয়া পেলে তো আমার পা-জোড়া জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। আর আমি সেটা কখনোই হতে দেব না! তুই আমার কাছ থেকে দোয়া চাস তো যা এমনিই তোকে দোয়া করে দিলাম।
আঁচল চৌধুরী কেন এমন করলেন রেহান এর সাথে? কেন তাকে সর্বনাশ বললেন তিনি? কি ভুল করেছে রেহান! কেন তাকে আঁচল চৌধুরীর কাছে এভাবে অপমানিত হতে হলো!
জানতে হলে অবশ্যই চোখ রাখতে হবে সংসার ধারাবাহিক গল্পের পরবর্তী পর্বগুলোতে।
এই পর্বটা যদি ভালো লেগে থাকে তাহলে অবশ্যই লাইক, রেটিং, মন্তব্য দিয়ে যাবেন।
আমি লক্ষ্য করছি,, পাঠকরা শুধু গল্প পড়েই চলে যাচ্ছেন। লাইক, রেটিং, মন্তব্য কিছুই দিচ্ছেন না। যদি আমার গল্পগুলো ভালো না লেগে থাকে তাহলে বলুন,, আমি গল্প লিখা ছেড়ে দেব।
আপনাদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে এই গল্পটা 'র পরবর্তী পর্ব আসবে।
২/ সংসার
125
Views
22
Likes
2
Comments
5.0
Rating

সকল মন্তব্যগুলো (2)
চমৎকার লিখেছেন
ভালো হয়েছে। পরবর্তী অংশ চাই তবে এর চেয়ে বড় করে