মুসাফির

বিকেলটা সেদিন অস্বাভাবিকভাবে ভারী ছিল। আকাশে কালো মেঘ জমে ছিল, অথচ বৃষ্টি নামছিল না। যেন প্রকৃতিও অপেক্ষা করছিল—কিছু একটা ভেঙে পড়ার। মুসাফির দাঁড়িয়ে ছিল রাইয়ার বাড়ির গেটের বাইরে। লোহার গেটটা মরচে ধরা, তবু শক্ত—ঠিক যেন মানুষের মুখোশ পরা হৃদয়ের মতো। সে জানত না, ভেতরে ঢুকে কী বলবে, কীভাবে বলবে। শুধু এটুকু জানত—আজ কথা বলতে হবে।
দরজা খুলে গেল। রাইয়ার বাবা বেরিয়ে এলেন। মধ্যবয়সী, চশমা পরা, চোখে একধরনের হিসেবি দৃষ্টি। তিনি মুসাফিরকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে নিলেন।

“তুমি কে?”—শুষ্ক কণ্ঠ।

মুসাফির শান্ত গলায় নিজের পরিচয় দিল। বলল, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, রাইয়ার সঙ্গে পরিচয় আছে।
বাবা ভেতরে বসতে বললেন। বসার ঘরে ভারী সোফা, দেয়ালে পারিবারিক ছবির সারি। রাইয়ার হাসিমুখের ছবি ঝুলছে—যেন সবকিছু ঠিকঠাক। বাবা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন, “বল, কী দরকার?”
মুসাফির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি আপনার সঙ্গে রাইয়ার বিষয়ে কথা বলতে এসেছি।”
বাবা হালকা হাসলেন। সেই হাসিতে ছিল ঠান্ডা কৌশল।“রাইয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে,” তিনি বললেন। “ভালো পরিবার, ভালো ছেলে। এসব ছোটখাটো আবেগের ব্যাপার বাদ দাও।”
এই কথাটা যেন পাথরের মতো এসে পড়ল মুসাফিরের বুকে।সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। ভেতরে কেমন একটা শূন্যতা তৈরি হলো। তবু সে জিজ্ঞেস করল, “রাইয়া কি জানে?”
বাবা নির্বিকার গলায় বললেন, “জানবে। মেয়েরা বেশি বুঝে না। অভিভাবকেরা বুঝে।”
সেদিন মুসাফির সেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল ভারী মনে। বাইরে তখনও আকাশ অন্ধকার। তার মনে হলো—সবকিছু যেন পূর্বনির্ধারিত নাটক। কিন্তু নাটকটা এখানেই শেষ হয়নি।

কিছুদিন পরই জানা গেল—রাইয়া কলেজে ভর্তি হয়েছে। বিয়ের কথাটা যেন হঠাৎ মিলিয়ে গেছে। কোথাও কোনো প্রস্তুতি নেই, কোনো আলোচনা নেই। যেন সেটি ছিল কেবল একটা কৌশল—পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ছক।এদিকে সময় এগিয়ে গেল। মুসাফিরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষের পথে। বন্ধুরা চাকরি, উচ্চশিক্ষা, বিদেশ—এসব নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বাস্তবতা—পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হলে টাকা দরকার।
সে টিউশনি শুরু করল। সকাল থেকে বিকেল ক্লাস, সন্ধ্যা থেকে রাত—একটার পর একটা বাড়িতে পড়াতে যাওয়া। শরীর ক্লান্ত, মন আরও ক্লান্ত।এই টানাপোড়েনের মধ্যেই একদিন তার বাড়িতে বিষয়টা জানাজানি হয়ে গেল।তার বাবা কঠোর গলায় বললেন, “এসব প্রেম-ট্রেম করে সময় নষ্ট করছিস? পড়াশোনা নষ্ট হচ্ছে!”
মা কান্নাভেজা চোখে বললেন, “ও মেয়েটাকে ভুলে যা। আমাদের মান-সম্মান আছে।”
বাড়িতে একের পর এক বকা, ঝগড়া, নিষেধ। যেন সবাই ধরে নিয়েছে—রাইয়াই তার সব সমস্যার মূল।
মুসাফির চুপ করে শুনল। প্রতিবাদ করল না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ জমতে লাগল—নিজের ওপর, পরিবারের ওপর, পরিস্থিতির ওপর। ঠিক তখনই আবার রাইয়া যোগাযোগ করল।
সে কখনো কল দিত, কখনো মেসেজ পাঠাত—চতুরভাবে, এমনভাবে যেন কেউ বুঝতে না পারে। কখনো বলত, “শুধু খোঁজ নিলাম।” কখনো বলত, “ভুলে গেলে?”
মুসাফির বুঝতে পারছিল—সে পুরোপুরি ছিন্ন করতে পারছে না। আবার জড়িয়ে পড়তেও পারছে না। দুই আগুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মতো অবস্থা।একদিন সবকিছু সীমা ছাড়াল।
টিউশনি শেষ করে রাত দশটায় সে বাসায় ফিরছিল। মাথা ভারী, শরীর অবসন্ন। তখনই রাইয়ার কল এলো।
“কেমন আছ?”—স্বাভাবিক কণ্ঠ।
মুসাফিরের মাথা গরম হয়ে গেল। দিনের পর দিন জমে থাকা চাপ যেন এক মুহূর্তে ফেটে পড়ল।
সে কঠিন গলায় বলল, “তুমি কেন বারবার যোগাযোগ করছ? নাটক বন্ধ করো।”
রাইয়া অবাক কণ্ঠে বলল, “নাটক? আমি তো শুধু—”
মুসাফির তাকে থামিয়ে দিল। “সোজা বলছি—তুমি ভালো মেয়ে নও।”
লাইনটা মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর রাইয়া ধীরে বলল, “আমার সম্পর্কে সব না জেনে তুমি এভাবে মন্তব্য করে দিলে? আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, মুসাফির। কিন্তু তুমি জানো না কীভাবে ভালোবাসা টিকিয়ে রাখতে হয়।”
এই কথাটা যেন আগুনে ঘি ঢালল।
মুসাফির তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, “তোমার জন্য আমার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, আমার বাড়িতে অশান্তি হয়েছে—আর তুমি আমাকে ভালোবাসা শেখাবে?”
তারপর আরও কঠোর হয়ে বলল, “তোমাদের মতো দের আমি বিশ্বাস করি না।”
শব্দগুলো বেরিয়ে গেল—কঠিন, নির্মম, ফিরে না নেওয়ার মতো।
রাইয়া আর কিছু বলল না। শুধু কলটা কেটে গেল।

কয়েকদিন পর মুসাফির জানতে পারল—রাইয়া কলেজে বেশ ভালো করছে। বিতর্ক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়েছে, লেখালেখিতে নাম করছে। সে ভাবল, “আমি কি ভুল বিচার করলাম?”
অন্যদিকে, টিউশনি করতে গিয়ে সে একদিন এক ছাত্রীর পরিবারের কাছে রাইয়ার বাবাকে দেখতে পেল—কিন্তু ভিন্ন পরিচয়ে। সেখানে জানা গেল, তিনি মাঝে মাঝে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নাটকীয় সিদ্ধান্ত নেন, পরিস্থিতি বুঝতে পরীক্ষা করেন। তখন মুসাফিরের মনে হলো—রাইয়ার বিয়ের কথাটাও কি এমনই কোনো পরীক্ষা ছিল?এদিকে তাহরিক আবার তার পাশে এসে দাঁড়াল। এক সন্ধ্যায় সে বলল, “তুই শুধু মানুষকে দূরে সরাস, কিন্তু নিজের ভেতরের ক্ষত সারাস না।”এই কথাটা মুসাফিরকে গভীরভাবে নাড়া দিল।
এক রাতে সে স্বপ্ন দেখল—রাইয়া একটি দীর্ঘ সেতুর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে। সে ডাকছে, কিন্তু কাছে যেতে পারছে না। মাঝখানে গভীর নদী—যেন ভুল বোঝাবুঝির নদী।
ভোরে ঘুম ভেঙে সে বুঝল—তার রাগ, অহংকার, ক্লান্তি—সব মিলিয়ে সে হয়তো তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।কিন্তু তখন আর ফেরার পথ ছিল না।শেষ পর্যন্ত সে নিজের ডায়েরিতে লিখল:
“আমি হয়তো সঠিক ছিলাম না। আবার হয়তো ভুলও ছিলাম না। আমি শুধু এক বিভ্রান্ত যাত্রী—যে পথ হারিয়ে ফেলেছে।”
39 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই