মুসাফির

মুসাফির।
নামটা আমার বাবা রেখেছিলেন কোনো আভিজাত্য বা কাব্যিক ভাব থেকে নয়—বরং তার নিজের জীবনের দীর্ঘ যাত্রার স্মৃতি বহন করেই। তিনি বলতেন, “মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন যাত্রী মাত্র।” সেই অর্থেই আমি এক যাত্রী—কখনো রাস্তায়, কখনো বইয়ের পাতায়, আবার কখনো নিজের মনের গভীর অন্ধকার গলিতে।
তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ক্যাম্পাসের ধুলোমাখা পথ, পুরনো আমগাছ, লাল ইটের ভবন—সবকিছুই তখন আমার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। প্রথম বর্ষের ভীরুতা কেটে গেছে, কিন্তু জীবনের গভীর অর্থ তখনো ধরতে পারিনি। আমি পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো, বন্ধুদের মাঝে শান্ত স্বভাবের, আর ধর্মের প্রতি একধরনের নীরব শ্রদ্ধা ছিল—যদিও তখনো আমি পুরোপুরি অনুশীলনকারী ছিলাম না।
আমার দিনগুলো চলছিল একঘেয়ে ছন্দে—ক্লাস, লাইব্রেরি, মেসে ফিরে পড়াশোনা, রাতের নিস্তব্ধতায় দীর্ঘ চিন্তা। কিন্তু মানুষের জীবন কি কখনো একঘেয়ে থাকতে দেয়? হয়তো না। কারণ হঠাৎ করেই সে এল।
সেদিন বিকেলবেলা ছিল। আকাশে হালকা রোদ আর মেঘের খেলা। আমি ক্যাম্পাসের পাশের ছোট্ট চায়ের দোকানে বসে তাহরিক আর বুদ্ধের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। বুদ্ধ ছিল যুক্তিবাদী, প্রায় সবকিছুতেই সে প্রশ্ন তুলত। আর তাহরিক—শান্ত, গভীর, একটু রহস্যময়; সে সবসময় ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো দেখত।
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিচ্ছি, এমন সময় দেখি—রাস্তার ওপারে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে—এটা পরে জানতে পারি। তখন শুধু দেখলাম, তার চুল খোলা, চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক, ঠোঁটে অল্প হাসি। তার চলনে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস, যেন পৃথিবী তাকে দেখে চলবে, সে পৃথিবীকে নয়।
সে আমাদের দিকে তাকাল। মুহূর্তের জন্য আমার দৃষ্টি তার সঙ্গে আটকে গেল।
আমি হঠাৎ অস্বস্তি বোধ করলাম।
বুদ্ধ ফিসফিস করে বলল, “দেখেছিস?”
আমি চুপ করে রইলাম।
মেয়েটি রাস্তা পার হয়ে আমাদের দিকেই এগিয়ে এল। তার সঙ্গে ছিল আরেকটা বান্ধবী। তারা ঠিক আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল।
“এই, তোমরা কি এখানকার স্টুডেন্ট?”—সে সরাসরি প্রশ্ন করল।
আমি কথা বলার আগেই বুদ্ধ হাসতে হাসতে বলল, “হ্যাঁ, কেন?”
মেয়েটি হালকা ভ্রু কুঁচকে বলল, “এই ক্যাম্পাসটা খুব বড়। আমরা একটা ঠিকানা খুঁজছি।”
আমি মানচিত্রটা দেখালাম, বোঝানোর চেষ্টা করলাম। তখনই প্রথমবার তার কণ্ঠটা আমি ভালো করে শুনলাম—মিষ্টি, কিন্তু তার মধ্যে যেন এক ধরনের অদ্ভুত আকর্ষণ।
তার নাম—পরে জানলাম—রাইয়া।
সেদিনের পর থেকে আমাদের পরিচয়টা অদ্ভুতভাবে চলতে লাগল। কখনো লাইব্রেরির সামনে, কখনো ক্যাফেটেরিয়ায়, কখনো বা বাসস্ট্যান্ডে—হঠাৎ হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। সে কখনো সরাসরি কথা বলত, কখনো দুষ্টুমি করত, কখনো আবার এমনভাবে তাকাত যেন কিছু বলতে চায়, কিন্তু বলছে না।
আমি প্রেম-ট্রেমের ধার ধারতাম না। আমার কাছে প্রেম মানে ছিল ঝামেলা—মনোযোগ নষ্ট, সময় নষ্ট, আর সবচেয়ে বড় কথা, আমার ভেতরে একটা ভয় ছিল। ভয়টা কীসের? হয়তো নিজের দুর্বলতার।
কিন্তু ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পারলাম—রাইয়ার কথার মধ্যে কিছু একটা আছে। এমন কিছু, যা আমাকে ভাবিয়ে তুলত। ক্লাসে বসেও তার কথা মনে পড়ত। রাতে পড়তে বসে হঠাৎ তার হাসিটা চোখের সামনে ভেসে উঠত।
আমি নিজের সঙ্গে লড়াই করতে শুরু করলাম।
একদিকে ছিল আমার ভেতরের প্রবৃত্তি—যৌবনের স্বাভাবিক আকর্ষণ, কারো প্রতি ভালো লাগা, কারো সান্নিধ্য পাওয়ার ইচ্ছা। অন্যদিকে ছিল ওহীর বিধান—আমার বিশ্বাস, আমার ধর্ম, আমার নৈতিকতা। আমি জানতাম, অবৈধ সম্পর্ক, সীমা লঙ্ঘন—এসব আমার পথ নয়। কিন্তু মন কি সবসময় যুক্তি মানে?
এক রাতে মেসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। অন্ধকার আকাশে কয়েকটা তারা জ্বলজ্বল করছে। আমি মনে মনে বললাম—“আল্লাহ, আমাকে পথ দেখাও।”
পরদিন ক্যাম্পাসে বুদ্ধ আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলল, “শুন, মেয়েটা তোকে পছন্দ করে। তুইও যে একটু দুর্বল হয়ে পড়েছিস, সেটা আমি বুঝতে পারছি। করে ফেল না প্রেমটা!”
আমি হাসলাম, কিন্তু হাসিটা ছিল ফাঁপা।
তারপর তাহরিক এগিয়ে এল। তার চোখে ছিল গভীরতা, যেন সে অনেক কিছু বুঝে ফেলেছে।
সে শান্ত গলায় বলল, “মুসাফির, মেয়েটা তোর সাথে মানায় না। ওর মধ্যে একটা অস্থিরতা আছে, একটা উন্মাদনা আছে। সাবধানে থাক।”
আমি তখনও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। তাই শুধু বললাম, “দেখা যাবে।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে ঝড় উঠছিল।
এরপর ঘটনাগুলো দ্রুত এগোতে লাগল। একদিন রাইয়া আমাকে একা ডাকল। ক্যাম্পাসের পুরোনো বটগাছের নিচে। বিকেলের আলো তখন ম্লান হয়ে আসছে।
সে দাঁড়িয়ে ছিল, চুলে হালকা বাতাস খেলছে।
“মুসাফির,” সে বলল, “তুমি কি আমাকে এড়িয়ে চলছ?”
আমি চুপ।
সে একটু এগিয়ে এল। তার চোখে ছিল কৌতূহল আর জেদ—দুটোই।
“আমি তোমাকে ভালো লাগে,” সে হঠাৎ বলল।
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
আমি কিছু বলতে পারলাম না। মনে হলো, শব্দগুলো গলায় আটকে গেছে। তখনই আমার মনে পড়ল তাহরিকের কথা—“সাবধানে থাক।”
আমি ধীরে ধীরে বললাম, “রাইয়া, আমি এসবের মধ্যে যেতে চাই না।”
সে অবাক হলো, তারপর হালকা হাসল—কিন্তু সেই হাসিতে এবার আর দুষ্টুমি ছিল না, ছিল আঘাত।
“তুমি কি ভয় পাচ্ছ?” সে জিজ্ঞেস করল।
ভয়? হ্যাঁ, আমি ভয় পাচ্ছিলাম। নিজের দুর্বলতাকে, নিজের পতনকে, নিজের ঈমানের ভাঙনকে।
আমি তাকে বললাম, “ভয় না… দায়িত্ব।”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর হঠাৎ বলল, “ঠিক আছে। দেখা যাবে।”
সেই একই কথা—যেটা আমি আগেই বলেছিলাম।
এরপর থেকে রাইয়ার আচরণ বদলে যেতে লাগল। কখনো সে আমার সামনে দিয়ে এমনভাবে চলে যেত, যেন আমি অস্তিত্বহীন। আবার কখনো এমনভাবে তাকাত, যেন আমাকে পরীক্ষা করছে।
আমার ভেতরের দ্বন্দ্ব তীব্র হলো।
একদিন রাতে আমি ঘুমাতে পারছিলাম না। বারবার রাইয়ার মুখটা মনে পড়ছিল। তার হাসি, তার কণ্ঠ, তার চোখের দৃষ্টি। আমি বিছানা থেকে উঠে নামাজে দাঁড়ালাম। দীর্ঘ সিজদায় পড়ে রইলাম। মনে হলো, যেন আমার ভেতরের অস্থিরতা ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে।
কিন্তু সকালে ক্যাম্পাসে গিয়ে আবার তাকে দেখলাম।
সে এবার অন্য এক ছেলের সঙ্গে হাসছিল। আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। আমি বুঝলাম—আমি যতই অস্বীকার করি, তার প্রতি আমার একটা টান তৈরি হয়ে গেছে।
সেদিন বিকেলে তাহরিক আমাকে একপাশে নিয়ে বলল, “তুই কি বুঝতে পারছিস, কী হচ্ছে?”
আমি মাথা নিচু করলাম।
সে বলল, “এটা শুধু ভালো লাগা নয়, এটা পরীক্ষা—তোর নফসের পরীক্ষা।”
আমি নিঃশব্দে শুনে গেলাম।
রাত নামল। ক্যাম্পাসের আলো নিভে গেল। আমার মনে হলো, আমি যেন এক দীর্ঘ যাত্রার শুরুতে দাঁড়িয়ে আছি—যেখানে পথ দুই দিকে বিভক্ত। একদিকে প্রবৃত্তির পথ, সহজ, আকর্ষণীয়, কিন্তু অন্ধকারে ভরা। অন্যদিকে ওহীর পথ—কঠিন, কণ্টকাকীর্ণ, কিন্তু শেষে আলো আছে।
আমি জানতাম না, সামনে কী অপেক্ষা করছে।
শুধু এটুকু বুঝেছিলাম—আমার জীবনের প্রথম বড় দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে।
এবং সেই দ্বন্দ্ব আমাকে বদলে দেবে—চিরদিনের জন্য।
55 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই