মুসাফির

নবম শ্রেণীতে পড়ি তখন। সময়টা যেন হঠাৎ করেই গম্ভীর হয়ে উঠেছিল। এর আগে আমার জীবন ছিল একরকম—মাদ্রাসার পাঠ, কুরআনের আয়াত, হাদিসের বাণী, নামাজের কাতার আর শিক্ষকের স্নেহভরা চোখ। আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামী জ্ঞান আমি ছোটবেলা থেকেই পেয়েছি। আমার পরিবারও ছিল ইসলামী মাইন্ডের—কথায়, আচরণে, দৈনন্দিন জীবনে। সাত বছর বয়স থেকেই আমাকে নামাজে অভ্যস্ত করা হয়েছিল। প্রথমে হাত ধরে মসজিদে নেওয়া, তারপর নিজে নিজে দাঁড়িয়ে পড়া—এভাবেই নামাজ আমার জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

কিন্তু নবম শ্রেণীতে উঠতেই যেন ভেতরে এক অদ্ভুত প্রশ্ন জন্ম নিতে শুরু করল। আত্মীয়দের আচরণ আমাকে বিষিয়ে তুলছিল। মুখে ইসলাম, কিন্তু কাজে তার ছায়াও নেই—এই দ্বৈততা আমাকে ভাবিয়ে তুলত। কেউ কেউ নামাজ পড়ে, কিন্তু কথা বলার সময় বিষ ঢালে। কেউ রোজা রাখে, অথচ দুর্বলের প্রতি নির্মম। আমি অবাক হয়ে দেখতাম—ইসলাম কি এমনই শেখায়? নাকি আমরা মানুষরাই ইসলামের পথে হাঁটতে গিয়ে বারবার হোঁচট খাই?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেউ আমাকে দেয়নি। আত্মীয়দের কাছ থেকে তো নয়ই। বরং তাদের দুর্ব্যবহার আমাকে আরও একা করে তুলেছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, মুসলমানের চালচলন আর ইসলামের আদর্শ এক জিনিস নয়—তবু এই ফারাকটা মেনে নিতে কষ্ট হতো। মনে হতো, আমি যেন দুই বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়ে আছি—একদিকে পবিত্র আদর্শ, অন্যদিকে কলুষিত আচরণ।

আমি তখন উপযুক্ত বন্ধু খুঁজছিলাম। এমন কেউ, যার সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যাবে, যে আমাকে বুঝবে। কিন্তু পাইনি। স্কুলে অনেকেই ছিল, কিন্তু মননের মিল ছিল না। কেউ ব্যস্ত নিজের স্বার্থে, কেউ ব্যস্ত উপহাসে। কেউ কেউ আমার নীরবতাকে দুর্বলতা ভেবে হাসত। তারা জানত না, এই নীরবতার ভেতরে কত প্রশ্ন, কত যুদ্ধ লুকিয়ে আছে।

পড়াশোনার ক্ষেত্রেও আমি ছিলাম একা। কেউ আমাকে উৎসাহ দেয়নি। “তুই পারবি”—এই কথাটা শোনার জন্য আমার মন কতবার যে হাহাকার করেছে, তা শুধু আমিই জানি। কিন্তু তবুও আমি থামিনি। নিজের চেষ্টায় এগিয়েছি। বই খুলে বসতাম, মনে মনে বলতাম—আল্লাহ দেখছেন, তিনিই আমার ভরসা। মানুষ পাশে না থাকলেও, রব তো আছেন।

অনেক রাত আমি জেগে কাটিয়েছি। জানালার বাইরে তাকিয়ে আকাশ দেখতাম। তারাদের দিকে তাকিয়ে মনে হতো—এই বিশাল পৃথিবীতে আমি কত ক্ষুদ্র। তখন নিজের নামটা আরও গভীর অর্থ পেত—মুসাফির। আমি জানি, এই পৃথিবীতে আমি কয়েকদিনের জন্য এসেছি। এই জীবন চিরস্থায়ী নয়। এই উপলব্ধিই আমাকে শক্ত করত। কষ্টগুলো তখন আর চূড়ান্ত মনে হতো না, বরং পরীক্ষার মতো লাগত।

নামাজে দাঁড়িয়ে আমি আল্লাহর কাছে অভিযোগ করতাম না, প্রশ্ন করতাম। বলতাম—“হে রব, তুমি তো জানো, আমার ভেতরের দ্বন্দ্ব। তুমি আমাকে পথ দেখাও।” ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম—মানুষের দিকে তাকিয়ে ইসলামকে বিচার করা ভুল। ইসলাম পূর্ণ, মানুষ অপূর্ণ। এই বোধ আমাকে একটু শান্ত করত।

তবুও, ভেতরের ক্ষত সহজে শুকাত না। আত্মীয়দের কথা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য—সব মনে জমে থাকত। কখনো মনে হতো, আমি কি ভুল পথে হাঁটছি? আবার কুরআনের কোনো আয়াত পড়লে বুকটা ভরে উঠত আলোয়। সেই আলোই আমাকে টেনে নিত সামনে।

এই অধ্যায়ে আমি শিখছিলাম একা চলতে। ভিড়ের মাঝেও একা, কিন্তু বিশ্বাসে দৃঢ়। মুসাফির হিসেবে আমি বুঝতে শুরু করলাম—এই পথটা সহজ নয়, কিন্তু সত্যের পথ কখনোই সহজ হয় না। হয়তো সামনে আরও আঘাত অপেক্ষা করছে, আরও প্রশ্ন। তবুও আমি চলব। কারণ আমি জানি, আমি একজন মুসাফির—আর মুসাফিরের কাজ থেমে যাওয়া নয়, এগিয়ে যাওয়া।

আলহামদুলিল্লাহ, দশম শ্রেণিতে আমি ভালো ফল করলাম। পরিচিতি বেরে গেল,বন্ধু বান্ধব বেশ জুটে গেল...এখন আমি আর ডাকঘরের অমল নয়; অন্য পাহাড় ডিঙিয়ে যাওয়ার বাসনা জাগল,নিজের জন্য নয় দশের জন্য...
নতুন করে পৃথিবীটাকে, অচেনা মানব- মানবী,জাতি,ধর্ম বর্ণ নানা অভিজ্ঞতা।২বছরের বিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা অনেকটা ভিন্নভাবে ধরা দিল,যারা এড়িয়ে চলত,তারাই আপন করে নিলো।কিন্তু মন চাইল,হেথা নয় হেথা নয়, অন্য কোথায় "ছেড়ে দিলাম বিদ্যালয়, ভর্তি হলাম নতুন ইন্সটিটিউটে বেছে নিলাম স্বাধীন জীবন।

রিয়াজুস্ব সলেহিন মিশন (RCM)...
66 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই