মুসাফির

রাত তখন গভীর। মুসাফিরের ঘরের জানালা দিয়ে শহরের দূরবর্তী হলুদ আলোগুলো অস্পষ্ট ঝিলিক দিচ্ছে। সিলিং ফ্যানের একটানা শব্দ যেন তার মাথার ভেতরের অস্থিরতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘুরছে। বিছানায় শুয়ে থেকেও ঘুম আসছে না—মাথার ভেতরে শুধু ঘুরে ফিরছে রাইয়ার কণ্ঠ, তার শেষ নীরবতা, আর কল কেটে যাওয়ার সেই ক্ষণ।
সে উঠে বসল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা বই, নোট, পুরনো প্রশ্নপত্র—সবকিছু যেন তাকে তিরস্কার করছে। একসময় যে পড়ার টেবিল ছিল স্বপ্নের জায়গা, এখন তা ক্লান্তির বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।ডায়েরিটা টেনে নিল সে।কলম ধরল, কিন্তু কী লিখবে বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ পর এক লাইনে লিখল—
“রাগের মুহূর্তে বলা কথা কখনো সত্য হয় না, তবু তা ক্ষত সৃষ্টি করে।”
কলম থেমে গেল।পরদিন সকালটা শুরু হলো ভারী মাথা নিয়ে। টিউশনি ছিল তিনটা—দুপুরে দুইটা, সন্ধ্যায় একটা। শরীর চলছিল, কিন্তু মন অন্য কোথাও পড়ে ছিল।প্রথম টিউশনি বাড়িতে পৌঁছে দেখল, সেই ছাত্রীর বাবা একজন শিক্ষিত, মার্জিত মানুষ। তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি শুধু পড়ান, না নিজেও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন?”
মুসাফির সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল। তখন লোকটি বললেন, “জীবনে বড় হতে গেলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ শিখতে হয়। না হলে সম্ভাবনা নষ্ট হয়।”কথাটা যেন সরাসরি তার বুকের ভেতরে গিয়ে বিঁধল।ফিরে আসার পথে বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে সে ভাবল—আমি কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলাম? নাকি আমি সত্যটাই বলেছি? সন্ধ্যার দিকে তাহরিকের সঙ্গে দেখা হলো। ক্যাম্পাসের পুরনো লাইব্রেরির পাশের সিঁড়িতে বসে তারা দু’জন চুপচাপ ছিল অনেকক্ষণ।শেষে তাহরিক বলল, “তুই ওকে অপমান করেছিস, কিন্তু নিজেকেও ক্ষমা দিচ্ছিস না—এই দ্বন্দ্বই তোকে শেষ করে দেবে।”
মুসাফির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমি আর কী করতাম? বাড়ি থেকে চাপ, পড়াশোনার চাপ, টাকা—সবকিছু একসঙ্গে এসে পড়েছিল।”
তাহরিক শান্ত গলায় বলল, “রাগে সিদ্ধান্ত নিলে, বিবেকে অনুতাপ আসে। এটা প্রকৃতির নিয়ম।”
সেই রাতে মুসাফির বাড়ি ফিরতেই আবার পারিবারিক পরিবেশ বদলে গেল। তার মা খাবার দিলেন নীরবে, কিন্তু চোখে ছিল চিন্তা। বাবা শুধু বললেন, “মন দিয়ে পড়াশোনা কর। এসব ঝামেলায় জড়াস না।”ঝামেলা—এই শব্দটা যেন তার কানে বাজতে থাকল।কিন্তু সে যতই এড়িয়ে যেতে চাইছিল, রাইয়ার স্মৃতি ততই ফিরে আসছিল।
তিন দিন পর হঠাৎ একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এলো। মুসাফির প্রথমে ধরল না। দ্বিতীয়বার আসতেই সে ধরল। অন্যপ্রান্তে নীরবতা।
তারপর খুব ধীরে পরিচিত কণ্ঠ—“আমি রাইয়া।”
তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল।সে ঠান্ডা গলায় বলল, “কী দরকার?”
রাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম—আমি তোমার শত্রু নই। তুমি আমাকে যেভাবে ভাবছ, আমি তেমন নই।”
মুসাফির কঠিন গলায় বলল, “এখন এসব কথা অর্থহীন।”রাইয়া নিঃশ্বাস ফেলল। “হয়তো। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম তুমি জানো—আমি কখনো তোমার ক্ষতি চাইনি।”
লাইন কেটে গেল।সেই রাতেই সে আবার স্বপ্ন দেখল—একটা লম্বা সেতু, নিচে অন্ধকার নদী, আর দূরে রাইয়া দাঁড়িয়ে আছে। সে এগোতে চাইল, কিন্তু পা যেন আটকে আছে।ভোরে ঘুম ভাঙতেই সে বুঝল—দূরত্ব শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও।

কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল।মুসাফির টিউশনি বাড়াতে লাগল। তার ফলাফল ধীরে ধীরে উন্নতি করছিল, কিন্তু ভেতরের শূন্যতা বাড়ছিল। বন্ধুদের আড্ডায় সে হাসত, কিন্তু হাসির আড়ালে ছিল একধরনের ক্লান্তি।একদিন ক্যাম্পাসে পুরনো এক অনুষ্ঠানে হঠাৎ রাইয়াকে দেখল।সে বদলে গেছে। আগের দুষ্টু, উচ্ছ্বল মেয়েটি যেন পরিণত হয়েছে। চোখে গভীরতা, চলনে সংযম। তার সঙ্গে ছিল কয়েকজন শিক্ষক ও সহপাঠী।মুহূর্তের জন্য তাদের চোখাচোখি হলো।কেউ কথা বলল না।
কিন্তু সেই নীরবতায় ছিল হাজারটা না বলা কথা।
অনুষ্ঠান শেষে বের হওয়ার সময় রাইয়া তার পাশ দিয়ে চলে গেল। খুব ধীরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল, “আমি চাই তুমি ভালো থাকো।”
এই一句 কথা মুসাফিরকে নড়বড়ে করে দিল।
সে ঘরে ফিরে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর ডায়েরিতে আরেকটা লাইন লিখল—
“মানুষকে হারালে বোঝা যায়, হারানোর আগে কী ছিল।”এরপর সে সিদ্ধান্ত নিল—আর পালাবে না। নিজেকে মুখোমুখি দাঁড়াবে।সে তাহরিকের কাছে গেল। বলল, “আমি কি ভুল করেছি?”
তাহরিক সরাসরি উত্তর দিল না। শুধু বলল, “ভুল বা ঠিক—দুটোই মানুষের। প্রশ্ন হলো, তুই কী শিখলি?”মুসাফির চুপ করে রইল।সেই রাতে সে দীর্ঘ সময় ধরে নামাজে দাঁড়াল। সিজদায় পড়ে মনে মনে বলল—“আল্লাহ, আমাকে পরিষ্কার পথ দেখাও।”ভোরের আলো ফুটতেই তার ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি এলো। সে বুঝল—রাইয়ার সঙ্গে তার গল্প হয়তো শেষ হয়নি, কিন্তু তাকে আগে নিজেকে গড়তে হবে।কিন্তু নিয়তি তখনও তার জন্য আরেকটা মোচড় বাঁচিয়ে রেখেছিল। কয়েকদিন পর সে জানতে পারল— স্য
চ্ছে।এই খবরটা শোনার পর তার বুকের ভেতরটা যেন খালি হয়ে গেল।সে দাঁড়িয়ে রইল জানালার পাশে, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে—ফোঁটা ফোঁটা জল যেন তার মনে জমে থাকা অনিশ্চয়তার প্রতিচ্ছবি।
শেষ পর্যন্ত সে নিজের ডায়েরিতে লিখল—
“আমি যদি আবার সুযোগ পাই, তবে কি ভিন্নভাবে বলতাম? নাকি আমি আবার একই ভুল করতাম?”
“দূরত্ব কখনো কখনো মানুষকে আলাদা করে না—বরং সত্যটা আরও স্পষ্ট করে দেয়।”--
46 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই