আমার জীবনে কিছু বাঁক থাকে, যেগুলো প্রথমে বিরক্তির মতো আসে, পরে গিয়ে দেখা দেয় আশীর্বাদ হয়ে। কলেজের সেই প্রথম দিকের দিনগুলো তেমনই এক বাঁক ছিল। ব্যাকরণ—যে শব্দটা শুনলেই একসময় আমার মাথার ভেতর কেবল নিয়ম, ব্যতিক্রম আর দাগ টানা ভুলের লাল কালি ঘুরে বেড়াত—সেই ব্যাকরণের পাশপাশানি একদমই ভালো লাগত না তার। স্কুলজীবনে বাংলা হোক বা ইংরেজি—নিয়ম মুখস্থ করা, টেন্সের সূত্র, ভয়েস বদল—সবই যেন এক যান্ত্রিক অত্যাচার। আমি ভাবতআম, ভাষা কি কেবল নিয়মের শেকলে বাঁধা থাকবে?
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুরভাবে সুন্দর। শেষ পর্যন্ত ঘুরে ফিরে সেই ভাষার কাছেই এসে দাঁড়াল সে—ইংরেজি অনার্সে ভর্তি হয়ে।
ভর্তির ফর্মে সাবজেক্ট হিসেবে “English Honours” লেখা মুহূর্তে তার নিজেরই একটু হাসি পেয়েছিল। মনে হয়েছিল, এ কি নিজের সঙ্গে ঠাট্টা? যে ব্যাকরণ একসময় তাকে ভয় দেখাত, সে-ই এখন তার প্রধান সঙ্গী! তবু এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি একার ছিল না। বন্ধুদের পরামর্শ, আলোচনা, ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘ রাতের কথোপকথন—সব মিলিয়েই এই পথচলা।
বুদ্ধ প্রথম বলেছিল,
—“শুধু গ্রামার না রে, লিটারেচারটা দেখ। একদম আলাদা জগৎ।”
তাহরিক যোগ করেছিল,
—“তুই তো এমনিই বেশি ভাবিস, কবিতা-গল্পে তোর মাথা কাজ করে। ইংরেজি নে, আফসোস করবি না।”
মৌসুম আর নমিও একবাক্যে সায় দিয়েছিল। তাদের চোখে বিশ্বাস ছিল, আর সেই বিশ্বাসই আমাকে সাহস দিয়েছিল।
কলেজে পা রেখেই সে বুঝতে পারল—সাহিত্য সত্যিই ভিন্ন এক জগৎ। এখানে শব্দ শুধু অর্থ বহন করে না, শব্দ বয়ে আনে মানুষ, সময়, যুদ্ধ, প্রেম, বিচ্ছেদ, আত্মসংঘর্ষ। শেক্সপিয়রের নাটকে সে খুঁজে পেল মানুষের চিরন্তন দ্বন্দ্ব, কিটসের কবিতায় পেল সৌন্দর্যের বিষণ্নতা, আর ওয়ার্ডসওয়ার্থে পেল নিঃশব্দ প্রকৃতির গভীর দর্শন।
ব্যাকরণ তখন আর শত্রু মনে হলো না। মনে হলো, এ তো সেই কাঠামো—যার ওপর দাঁড়িয়ে সাহিত্য নিজের শরীর গড়ে তোলে।
মুসাফির, বুদ্ধ, তাহরিক, মৌসুম আর নমি—এই পাঁচজন হয়ে উঠল এক অদ্ভুত সমীকরণ। পড়াশোনায় তাদের মধ্যে ছিল একধরনের নীরব প্রতিযোগিতা। কে বেশি পড়বে, কে আগে বুঝবে, কে ক্লাসে প্রশ্ন করবে—সবই চলত। যদিও আমি একটু এগিয়েই থাকতআম, তবু সে কখনো একা থাকতে চায়নি।
গ্রুপ স্টাডির দিনগুলো ছিল সবচেয়ে প্রিয়। লাইব্রেরির এক কোণে, কখনো ক্যান্টিনের ভাঙা টেবিলে, কখনো কারো মেসের ছোট ঘরে—তারা একসাথে বসত। কেউ নোট পড়ত, কেউ ব্যাখ্যা দিত, কেউ আবার হঠাৎ কোনো লাইনের ভেতর লুকিয়ে থাকা দর্শন নিয়ে তর্ক জুড়ে দিত।
বুদ্ধ ছিল সবচেয়ে যুক্তিবাদী। সাহিত্যেও সে যুক্তি খুঁজত।
তাহরিক আবেগী—কবিতার দুই লাইনেই সে হারিয়ে যেত।
মৌসুম শান্ত, গভীর—কম কথা বলত, কিন্তু যা বলত, তা ভেবে।
নমি ছিল প্রাণখোলা—সব কঠিন বিষয়কেও সহজ করে তুলত।
আর মুসাফির?
সে ছিল মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পর্যবেক্ষক। বন্ধুদের কথার ভেতর দিয়ে সে নিজেকে চিনত, নিজের ভেতরের পরিবর্তন লক্ষ করত।
একদিন ক্লাস থেকে ফেরার পথে মুসাফির হঠাৎ থেমে দাঁড়িয়েছিল। কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে ভাবছিল—এই সে, যে একসময় ব্যাকরণের পাশপাশানি অপছন্দ করত, আজ সে কবিতার লাইন মুখস্থ করে হাঁটে! তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন মানুষ—যে সাহিত্য ভালোবাসে, যে শব্দের ভেতর আশ্রয় খোঁজে।
বন্ধুরা পাশে দাঁড়িয়ে হাসছিল, ঠাট্টা করছিল, কিন্তু মুসাফির জানত—এই সময়টা আর এই মানুষগুলো তার জীবনের ভিত্তি হয়ে থাকবে।
প্রতিযোগিতা থাকলেও হিংসা ছিল না। একজন এগিয়ে গেলে বাকিরা টেনে তুলত। পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়া, একে অপরকে প্রশ্ন করা, কারো মন খারাপ হলে পাশে বসে থাকা—সব মিলিয়ে তারা শুধু সহপাঠী ছিল না, তারা ছিল সহযাত্রী।
আমি বুঝতে পারতাম,সাহিত্য আমাকে বদলে দিচ্ছে—কিন্তু এই বদলে যাওয়ার মাঝখানে কোথাও একটা অদৃশ্য ভয়ও জন্ম নিচ্ছিল। যে মানুষটা নিয়মের শেকল ভেঙে শব্দের সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছে, সে মানুষটাই আবার ভাবছিল—এই পথ কি সত্যিই তার?
ক্লাসরুমে বসে শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডি পড়তে পড়তে তার মনে হতো, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই লেখে, না কি ভাগ্য মানুষকে লিখে নেয়? হ্যামলেটের দ্বিধা তাকে অস্বস্তি দিত। মনে হতো, এই দ্বিধা কি তার নিজের নয়? সিদ্ধান্তহীনতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে মুসাফিরের মনটা দিন দিন ভারী হয়ে উঠছিল।
একদিন লাইব্রেরিতে বসে তারা পাঁচজন একসাথে পড়ছিল। বাইরে বৃষ্টি নামছিল—নরম, একঘেয়ে শব্দে। বুদ্ধ হঠাৎ বলল,
—“আচ্ছা, অনার্স শেষ হলে তোদের কী প্ল্যান?”
প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু আমার বুকের ভেতর কোথাও যেন কেঁপে উঠল।
তাহরিক বলল,
—“আমি তো এম.এ করব। তারপর দেখি, কলেজে পড়ানো গেলে মন্দ হয় না।”
মৌসুম একটু ভেবে বলল,
—“আমার ইচ্ছে লেখালেখি নিয়ে সিরিয়াস কিছু করার। তবে বাস্তবটা কী হবে জানি না।”
নমি হাসতে হাসতে যোগ করল,
—“আমি আপাতত পাশ করতে চাই। বাকিটা সময় বলবে।”
সবাই তাকাল আমার দিকে। আমিচুপ করে ছিলাম কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বললাম,
—“আমি জানি না।”
এই ‘জানি না’ শব্দটার ভেতর লুকিয়ে ছিল অনেক প্রশ্ন, অনেক অনিশ্চয়তা। মুসাফির সাহিত্যে প্রেমে পড়েছে ঠিকই, কিন্তু সে জানত—প্রেম দিয়েই জীবন চলে না। দায়িত্ব আছে, প্রত্যাশা আছে, পরিবার আছে।
বুদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
—“তুই তো বলতিস শিক্ষক হতে,সেরা পেশা,মানুষকে শিক্ষা দেওয়াও যায়, উপার্জনও হয়।এখন এমন কথা বলিস। তুইই না জানলে আমরা কী জানব?”
এই কথাটা আমারকে হাসাতে পারেনি। বরং তার ভেতরের চাপটা আরও বেড়ে গিয়েছিল। এগিয়ে থাকা মানেই কি সব উত্তর জানা?
সেই রাতে মেসের ঘরে ফিরে সে অনেকক্ষণ বই খুলে বসে ছিল, কিন্তু পড়তে পারেনি। জানালার বাইরে বৃষ্টির শব্দ, আর ভেতরে নিজের চিন্তার কোলাহল—দুটো মিলেমিশে এক অদ্ভুত অস্থিরতা তৈরি করেছিল।
সে ভাবছিল, একসময় সে ব্যাকরণ অপছন্দ করত, এখন সাহিত্য ভালোবাসে—কিন্তু আগামী দিনে কি সে নিজের জীবনকেও এমন করে ভালোবাসতে পারবে? নাকি জীবন তাকে এমন কোনো অধ্যায়ে এনে ফেলবে, যেখানে শব্দেরা আর সাহায্য করবে না?
পরদিন ক্লাসে প্রেজেন্টেশন ছিল।শিক্ষক প্রশংসা করেছিলেন। বন্ধুরা অভিনন্দন জানিয়েছিল। তবু তার ভেতরে একধরনের শূন্যতা কাজ করছিল। বাহ্যিক সাফল্য আর ভেতরের শান্তি—দুটো যে সবসময় এক হয় না, সেটা সে ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছিল।
ক্যাম্পাসের পুরোনো বটগাছটার নিচে একদিন বিকেলে তারা বসেছিল। চারপাশে অন্য ছাত্রছাত্রীদের হাসি, গল্প, জীবনযাপনের শব্দ। মুসাফির হঠাৎ বলল,
—“আমরা কি পরে এমনই থাকব? একসাথে?”
কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়নি।
মৌসুম মাটির দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
—“সবাই একসাথে থাকে না। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে—ভেতরে।”
এই কথাটা মুসাফির মনে গেঁথে গিয়েছিল। হয়তো সময় তাদের আলাদা করবে, হয়তো পথ বদলাবে—কিন্তু এই অধ্যায়, এই বন্ধুত্ব, এই সাহিত্য–আবিষ্কার—সবই তার ভেতরে থেকে যাবে।
সেই সন্ধ্যায় সে প্রথমবার নিজের ডায়েরিতে লিখেছিল—
“আমি ভাষা শিখছি না শুধু, আমি নিজেকে পড়তে শিখছি।”
শিক্ষামূলক সামাজিক এই উপন্যাসের ১০০ টি পর্ব হবে,ইনশাআল্লাহ। এই অধ্যায় এখানেই শেষ হয় না। কারণ মুসাফিরের জীবনের সামনে তখনও অনেক অধ্যায় লেখা বাকি—যেগুলো হয়তো আরও কঠিন, আরও বেদনাময়, কিন্তু আরও সত্য।তার জীবনের সেই সময়ের কথা বলে, যখন সে বুঝতে শিখেছিল—যা একসময় অপছন্দ ছিল, সময় তাকে ভালোবাসতে শেখাতে পারে। আর সেই ভালোবাসার পথ দেখায় বন্ধুরা, বই, আর নিঃশব্দ কিছু সন্ধ্যা—যেখানে শব্দেরা ধীরে ধীরে হৃদয়ে বাসা বাঁধে।
মুসাফির
72
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই