মুসাফির

ভূগোল বিষয়টা আমার ভালোই লাগত। অন্যরা যেখানে সংখ্যার হিসাব বা ব্যাকরণের জটিলতায় বিরক্ত হতো, আমি সেখানে মানচিত্র খুলে বসে পড়তাম আনন্দ নিয়ে। নদীর বাঁক, পাহাড়ের রেখা, মরুভূমির বিস্তার—সবকিছুর মধ্যে যেন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতাম। মনে হতো, পৃথিবীটা একটা খোলা বই, আর ভূগোল সেই বইয়ের ভাষা।

আমার এই আগ্রহটা লক্ষ করেছিল আমার দুই ক্লাসমেট—ইতি আর নামি। আমরা তিনজন প্রায়ই একসঙ্গে বসে পড়তাম। স্কুল ছুটির পর কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো খোলা মাঠের পাশে বসে ভূগোল নিয়ে আলোচনা করতাম। ইতি ছিল খুব মেধাবী, সবকিছু দ্রুত বুঝে ফেলত। নামি ছিল শান্ত স্বভাবের, কম কথা বলত, কিন্তু যা বলত, তা গভীর হতো। এই দুইজনের সঙ্গে থাকলে আমার একাকিত্বটা একটু কমে যেত।

একদিন আমাদের স্কুলে ঘোষণা এল—বঙ্গীয় ভূগোল মঞ্চ আয়োজিত মেরিট টেস্ট। শিক্ষকরা বললেন, এই পরীক্ষায় ভালো করলে ভবিষ্যতে বড় সুযোগ আসতে পারে। আমাদের তিনজনের নাম প্রস্তাব করা হলো। সেদিন মনে হয়েছিল, জীবনে এই প্রথম কেউ আমার পড়াশোনার দিকে আলাদা করে তাকাল। যদিও উৎসাহের ভাষা খুব বড় ছিল না, তবুও এই সুযোগটাই আমার কাছে অনেক।

পরীক্ষার আগের দিনগুলো আমরা তিনজন খুব মন দিয়ে প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। মানচিত্র আঁকা, নদীর উৎপত্তি, জলবায়ুর পার্থক্য—সবকিছু নিয়ে আলোচনা চলত। কখনো মতভেদ হতো, আবার হাসিও ফুটত। আমি মনে মনে ভাবতাম, হয়তো এই দু’জনই আমার সেই উপযুক্ত বন্ধু, যাদের খুঁজে পাইনি এতদিন।

পরীক্ষার দিন সকালে আমরা একসঙ্গে রওনা হলাম। জায়গাটা ছিল বেশ দূরে। বাসে উঠতে উঠতে নামি বলেছিল,
“দেখিস, আজকে ভালোই হবে।”
ইতি হেসে বলেছিল,
“ভূগোল তো মুসাফিরের প্রাণ।”

আমি কিছু বলিনি। শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। রাস্তার পাশে গাছ, ঘর, মানুষ—সবকিছু যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে ছিল। মনে এক ধরনের অজানা অস্বস্তি কাজ করছিল, যদিও কারণটা বুঝতে পারছিলাম না।

হঠাৎই সবকিছু বদলে গেল। একটি তীব্র শব্দ, মানুষের চিৎকার, বাসের ভেতরে ভয়ানক ঝাঁকুনি। আমি শুধু অনুভব করলাম, শরীরটা শূন্যে ভেসে উঠল, তারপর অন্ধকার।

জ্ঞান ফিরে এলে আমি নিজেকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে দেখলাম। মাথা ঘুরছিল, কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ। পাশে মানুষজন জড়ো হয়েছে। কাউকে কাউকে চিৎকার করতে শুনলাম—
“একজন তো নড়ছে না!”

হঠাৎ বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। আমি উঠে বসার চেষ্টা করলাম। চোখ খুঁজল ইতি আর নমিকে। নমিকে দেখা গেল, রক্তাক্ত হলেও সে নড়াচড়া করছে। কিন্তু ইতি…

নিথর পড়ে ছিল। ডাকলাম—
“ইতি… শোন… ইতিম!”
কোনো সাড়া নেই।

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তাররা যা বললেন, তা আমার কানে ঢুকছিল না। শুধু একটা কথাই বারবার ভেসে আসছিল—
“সে আর নেই।”

সেদিন প্রথমবার আমি মৃত্যুটা এত কাছ থেকে দেখলাম। যে ছেলেটা সকালে বলেছিল, “আজ ভালোই হবে,” সে দুপুরের আগেই মানচিত্রের বাইরে চলে গেল। জীবনের কোনো এটলাসে যার অবস্থান আর চিহ্নিত করা যাবে না।

বঙ্গীয় ভূগোল মঞ্চের মেরিট টেস্ট দেওয়া আর হলো না। কাগজ-কলমের আগে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে গেল বাস্তবের কঠিন সত্য। পৃথিবীর মানচিত্রে দেশ বদলায়, নদী শুকায়—কিন্তু বন্ধুর মৃত্যু যে কীভাবে হৃদয়ের মানচিত্র ছিঁড়ে দেয়, তা সেদিন বুঝলাম।

দাঁড়িয়ে আমি চুপচাপ ছিলাম। চোখে জল আসছিল না, বুকটা ভারী হয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন আরও এক ধাপ একা হয়ে গেলাম।

সেদিন রাতে নামাজে দাঁড়িয়ে শুধু এটুকুই বলেছিলাম—
“হে আল্লাহ, তুমি যাকে ডেকে নিয়েছ, তাকে শান্তিতে রেখো। আর আমাকে শক্তি দাও এই পথ চলার।”

আমি তখন আরও গভীরভাবে বুঝতে শুরু করলাম—আমি সত্যিই একজন মুসাফির। কেউ একটু আগে নামে, কেউ একটু পরে। মানচিত্রে যেমন কিছু পথ হঠাৎ শেষ হয়ে যায়, তেমনি জীবনের পথেও। আর আমাদের কাজ—এই ক্ষণিকের যাত্রায় সত্য, ধৈর্য আর বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
95 Views
1 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই