আজ সন্ধ্যা। আকাশে রক্তিম মেঘের আঁচড়, পাখিদের ফিরতি ডানার শব্দ আর বেলতলার পাশের মসজিদ থেকে আজানের সুর ভেসে আসছে।
এই সন্ধ্যা আজ অন্যরকম—যেন পৃথিবী থেমে গেছে আর আমি দাঁড়িয়ে আছি আমারই জীবনের সামনে।
ত্রিশ বছর…
হ্যাঁ, ঠিক তিরিশ বছরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে আজ আমি প্রথমবার কলম তুলেছি।
আমার নাম মুসাফির—অজস্র ব্যথা, অ্যাফেক্সন, ভুল, পাপ, পুণ্য, প্রতিঘাত, বেঁচে থাকা, হারানোর ধারালো স্মৃতি নিয়ে হাঁটা এক পথিক।
আজ আমি তোমাকে—হ্যাঁ, তোমাকেই—শুনাবো আমার জন্ম থেকে আজকের এই সন্ধ্যা পর্যন্ত সমস্ত অন্ধকার–আলো মেশানো গল্প।
শুনাবো সেই মানুষের কথা, যাদের ভালোবাসায় আমি বদলে গেছি, আবার যাদের বিশ্বাসঘাতকতায় আমি ভেঙে পড়েছি।
শুনাবো সেই ভয়াবহ রাতের কথা, যে রাতে আমার জীবনের প্রথম ট্র্যাজেডি শুরু হয়েছিল।
আর শুনাবো সেই আধ্যাত্মিক দরজার কথা, যা খুলে গেলে মানুষ নিজের ভেতরের আলো দেখতে পায়—যদিও সেই আলোতে পৌঁছানোর পথ রক্ত, অশ্রু আর ত্যাগে ভরা।
আমি জানি না আমার এই গল্প তোমাকে কোথায় নিয়ে যাবে—
তবে এটুকু জানি, আমার জীবন কোনো রূপকথা নয়;
আমার জীবন হলো—
“মানুষ যতটা সহ্য করতে পারে, তারও বহু বেশি আঘাতের মধ্য দিয়ে মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে তার নগ্ন প্রমাণ।”
এসো…
তোমাকে আমি নিয়ে যাই আমার জন্মের রাতে,
যেখানে অশনি সংকেতের মতো শুরু হয়েছিল আমার ট্র্যাজেডির প্রথম অধ্যায়।
সেদিন রাতটা ছিল বৈশাখের মাঝামাঝি। আকাশে মেঘ জমেছিল, কিন্তু বৃষ্টি নামছিল না। বাতাসে আগুনের মতো একটা তাপ, যেন পৃথিবী নিঃশ্বাস আটকিয়ে অপেক্ষা করছে কোনো অঘটনের। গ্রামের নাম ছিল ‘চর-আলমপুর’। নদীর পাড় ঘেঁষে একটা ছোট গাঁ—যেখানে মানুষের জীবনযাপন নদীর ঢেউয়ের মতো, ওঠানামায় ভরা।
সেই গ্রামেই আমার জন্ম।
এক অগ্নিভরা রাতের ভোরে।
আমার মা পরে বলতেন—
“তোকে পেটে নিয়েই বুঝেছিলাম, তুই সহজ কোনো সন্তান হবি না। তোর শ্বাস, তোর নড়াচড়া—সবকিছুতেই ছিল এক আলাদা ঝড়।”
সে রাতে মা যখন প্রসবযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন, তখন গ্রামের দূর প্রান্তে আগুন লেগে যায়। কারো ঘরে, কারো উঠোনে, কোথাও বাঁশঝাড়ে অগ্নি দৌড়ে বেড়াতে থাকে। লোকেরা দৌড়াচ্ছে—পানিভর্তি বালতি, ছেঁড়া গামছা, মশাল, আলো, চিৎকার—সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খলা।
ঠিক এমন সময়েই আমি জন্মাই।
মা পরে হাসতে হাসতে বলতেন,
“তুই আসতেই না আবার একটা ঘরে আগুন ছড়াল! যেন তুই আগুনের দাওয়াত নিয়ে আসছিস দুনিয়ায়।”
কিন্তু সে হাসির আড়ালে একটা ভয়ও ছিল—
কারণ অগ্নির রাত আমাদের পরিবারে অশুভ বলে ধরা হতো।
আব্বু ছিলেন এক সাধারণ মানুষ। কৃষক—মাটির গন্ধমাখা, ঘামে ভেজা পরিশ্রমী প্রাণ। কিন্তু বাবার চোখে ছিল এক অদ্ভুত কঠোরতা, যেন জীবনের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই তাকে ভেতরে ভেতরে পাথর করে ফেলেছে। তাঁর জীবন অতি দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে,শৈশবে পিতা মাতা হারিয়ে চাচার অহেতু বোঝা ও অবহেলায় কেটেছে কৈশোর, যৌবনে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই সংসারে চাপে অতিষ্ঠ হয়েছেন,অনেকবার মেজাজ হারিয়েছেন কিন্তু পরিবার সন্তানের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা তাঁকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে -
আমি জন্ম নিলাম সেই বিশ্বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে।
আর তাই হয়তো বাবা আমাকে প্রথম দেখেই একবার থমকে গিয়েছিলেন।
মা ক্লান্ত, কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেছিলেন—
“দেখো, তোমার ছেলে… কত সুন্দর, তাই না?”
বাবা তখন শুধু ফিসফিস করে বলেছিলেন—
“ওর চোখ দুটো… অদ্ভুত গভীর। যেন কোনো কালের পথিক।”
সেই প্রথম, বাবা আমাকে ‘মুসাফির’ বলে ডাকলেন।
আমার প্রকৃত নাম পরে রাখা হয়েছিল—‘রাহিম’—কিন্তু সে নাম কখনোই বাড়ির ভিতরে টিকলো না। সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে গেল—
“মুসাফির”—একটা যাত্রামগ্ন আত্মা।
মা এসব শুনলে খুব রেগে যেতেন।
কিন্তু কিছু কথা মানুষের মনে কাঁটা হয়ে থাকে, আর আমার মা-ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। মাঝে মাঝে আমাকে বুকে নিয়ে শান্তভাবে বলতেন—
“তোর জীবন এমন হবে কেন? আল্লাহ তোকে তো শুধু দয়া করেই পাঠাইছেন। তুই তোর আলোর পথ খুঁজে নিবি, বুঝলি?”
আমি তখন শিশু, কিছু বুঝতাম না।
কিন্তু মায়ের বুকের উষ্ণতা আমার প্রথম আশ্রয় ছিল।
আমাদের বাড়িটি ছিল কাঁচা মাটির, খড়ের ছাউনি, দরজাটা নড়বড়ে।
নদীর স্রোত যখন বাড়তো, আমাদের উঠান পর্যন্ত পানি হানা দিত।
তবু সেই ছোট বাড়িটি ছিল আমাদের সুখ, দুঃখ, রাগ, কান্না, সব অনুভূতির কেন্দ্র।
মাত্র তিন বছর বয়সে আমি প্রথমবার মৃত্যুর দৃশ্য দেখি—
গ্রামের পাশের বৃদ্ধা রহিমা খালা মারা গিয়েছিলেন।
লোকেরা তাঁর চোখে তুলো দিচ্ছিল, মুখে সাদা কাপড়।
আমি তখন বুঝতাম না, শুধু দেখছিলাম।
মা আমাকে কোলে তুলে বলেছিলেন—
“এটাই দুনিয়া। এখানে আসা মানে সবার আগে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি।”
সেদিন থেকেই মৃত্যু আমার কাছে ভয়ানক রহস্য হয়ে দাঁড়ালো।
আমি মানুষের মুখভঙ্গি, ভয়ের শব্দ, কান্নার প্রতিধ্বনি—সবকিছু অদ্ভুতভাবে লক্ষ্য করতাম।
গ্রামের সবাই বলত—
“ছোট ছেলেটা যেন বুড়ো মানুষের মতো কথা বলে। চোখে ওর যেন সব বোঝে।”
কেউ কেউ আমাকে নজর লাগার মতো শিশুই ভাবত।
---
আমার চার বছর বয়সে বাবা প্রথমবার আমাকে নদীর ধারে নিয়ে যান।
নদী তখন ভরা।
বাবা নদীর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন—
“দেখো, এই নদী জীবন আর মৃত্যুর মাঝে এক সেতু। স্রোত কখনো বলে না, কাকে কোথায় নিয়ে যাবে।”
আমি পাশে দাঁড়িয়ে বাবার চোখে জল দেখেছিলাম।
তখনও বুঝিনি তাঁর অতীত স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে।
সেদিন বাবার কথাগুলো আমার মনে এত গভীরভাবে দাগ কেটেছিল যে আজও মনে হয়—
আমি যেন জন্মের আগেই শিখে ফেলেছিলাম জীবন মানে অনিশ্চয়তার নদী।
---
গ্রামের চায়ের দোকানে প্রায়ই কথাবার্তা উঠত—
“মুসাফির বড় হলে বড় কিছু হবে। ছেলেটার মাঝে আলাদা শক্তি আছে।”
আবার কেউ বলত—
“না, ওর দ্বারা কিছু হবে না,ওর বাপ বেশি পড়ালেখা করেনি,তার ছেলে কি আর করবে। জন্ম ছেলে বেশি দূর এগোবে না।”
আমার জীবন কি সত্যিই এমন হবে?
আমি তখনও জানতাম না,
কিন্তু পরে বুঝেছি—
মানুষের মুখের কথা কখনো কখনো ভবিষ্যতের অশনি সঙ্কেত হয়ে দাঁড়ায়।
---
আমার পাঁচ বছর বয়সে প্রথমবার বুঝলাম—
জীবন শুধু জন্ম আর বড় হওয়া নয়;
জীবন মানে আঘাত সইতে শেখা।
সেদিন বিকেলে গ্রামের উঠোনে আমি খেলছিলাম, হঠাৎ গাঁয়ে ঝগড়া শুরু হলো।
দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ—জমি নিয়ে।
হাতাহাতি, চিৎকার, গালি, রক্ত।
আমি ছোট হয়ে মায়ের আঁচলের নিচে লুকিয়ে দেখছিলাম।
মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
“জগৎটা তোর জন্য নয় রে মা… তোর মতো কোমল হৃদয়ের মানুষকে এই জগৎ প্রতিদিনই কষ্ট দেবে।”
জানি না কেন, সেদিন প্রথমবার মনে হলো—
আমি সত্যিই এই জগতের জন্য তৈরি নই।
আমি যেন বাইরের কেউ—অন্য কোনো পথের যাত্রী।
এক পথিক।
এক মুসাফির।
মুসাফির
92
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই