কি করে বলবো তোমায় (পর্ব ০৫)

ঘড়ির এলার্মের আওয়াজ শুনে পরদিন সকালে ঘুমটা ভেঙে গেল হিয়ানের। বেশ অনেকটা বিরক্ত হয়ে এলার্মটা বন্ধ করে দিয়ে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে।
এমনিতে সে প্রতিদিন ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে পড়ে। কিন্তু ইন্টারভিউ এর আগের দিন রাত জেগে পড়াশোনা করায় ঘুমটা কিছুতেই ভাঙছে না তার!

না, খুব চেষ্টা করেও আর ঘুমোতে পারলো না হিয়ান। হঠাৎ বাইরে থেকে কে যেন মিষ্টি সুরে ডাকতে লাগলো-

"কাকাই, ও কাকাই, কাকাই গো,, কাকাই!!

কণ্ঠস্বর টা শুনে হিয়ানের আর বুঝতে বাকি রইলো না যে এটা আরুর গলা। বিরক্ত হওয়া সত্বেও হিয়ান ভদ্র ছেলের মতো বিছানা ছেড়ে হাই তুলতে তুলতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে ঘুম ঘুম চোখে তার দিকে তাকিয়ে বলল-

হিয়ান: কি গো মামণি,, সাত সকালে কাকাইকে এভাবে ডাকছো কেন??

আরু: কাল তুমি আমায় কি বলেছিলে,, ভুলে গেলে!

হিয়ান: (কিছুক্ষণ ভেবে) কি বলেছিলাম গো মামণি,, আমার তো ঠিক মনে পড়ছে না!

আরু: তোমাকে নিয়ে আর পারি না বাপু! এত বড় হয়েছে,, কালকে বলা কথা আজকেই ভুলে যাচ্ছে। নাও. আমিই বলছি তুমি কি বলছিলে! তুমি আমায় কাল ব্রেকফাস্ট করার সময় বলেছিলে শহর থেকে আমার জন্য মিষ্টি মিষ্টি চকলেট নিয়ে আসবে।

হিয়ান: ও হ্যাঁ, তাই তো,, সরি গো,, কাল তোমায় চকলেটগুলো দিতে আমি ভুলে গিয়েছিলাম! দাঁড়াও আমি ঘর থেকে নিয়ে আসছি।

এই বলে হিয়ান আবার রুমের ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর হাতে কয়েকটা চকলেট নিয়ে রুমের বাইরে বেরিয়ে এলো।

হিয়ান: (মৃদু গলায়) এই যে মামণি, তোমার চকলেট।

আরু: (হিয়ানের হাত থেকে চকলেটগুলো নিয়ে) Thank You কাকাই।

হিয়ান: শুধু Thank You দিয়ে যে আমার হবে না মামণি! আমার যে আরো কিছু লাগবে!

আরু: আরো কিছু মানে!

আরুর কথাটা শুনে হিয়ান তাকে নিজের কোলে উঠিয়ে নিল। এবং মৃদু হেসে বলল-

হিয়ান: আমার গালে একটা পাপ্পা দিতে হবে!

আরু: (হিয়ানের গালে চুমু খেয়ে) হয়েছে, এবার আমায় যেতে দাও তো বাপু। চকলেটগুলো যে আমার পেটে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে রয়েছে।

হিয়ান: (আরুকে নিচে নামিয়ে দিয়ে) বেশি চকলেট খাবে না কিন্তু! বেশি চকলেট খেলে দাঁতে পোকা পড়বে।

আরু: ঠিক আছে বাপু, ঠিক আছে। আমায় এতো জ্ঞান দিও না তো!

এই বলে আরু আবার মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। হিয়ান আবার রুমের ভেতরে ফিরে এলো। দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাতেই দেখতে পেল সাড়ে আটটা বেজে যাচ্ছে। তাই সে ভাবলো এখন আর ঘুমিয়ে কোনো লাভ নেই! তার চেয়ে বরং স্নানটাই সেড়ে ফেলে যাক!


*


হিয়ান ফ্রেশ হয়ে নিক। ততক্ষণে চলুন একবার রাধিকাদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি! দেখি সেখানে কি হচ্ছে!


সুব্রত বাবু: (খবরের কাগজ থেকে চোখ সড়িয়ে) কি গো গিন্নি,, তোমার মহারানী উঠলো!

আশালতা দেবী: (কিচেন থেকে) আচ্ছা তুমি সবসময় আমার বাবুকে এভাবো বলো কেন বলো তো! তোমার জন্য আমার বাবুটা একটা দিনও শান্তি করে ঘুমোতে পারে না! আচ্ছা আমার বাবুটাকে দিয়েই তো এই সংসারটা চলছে... ওকেও তো আমাদের একটু বিশ্রাম নিতে দেওয়া উচিৎ। সকাল দশটায় মেয়েটা বাড়ি থেকে বের হয় আর রাত দশটায় বাড়ি ফেরে। যে বয়সে দেশের মেয়েরা এনজয় করে বেড়ায় সেই বয়সে আমার বাবুকে একটা অফিস আর একটা পরিবার সামলাতে হচ্ছে। তুমি কি বলতে চাচ্ছো; ও সারাদিন কোনো পরিশ্রম করে না! শোনো,, আমার বাবু দিনে যতটা পরিশ্রম করে,, তুমি বোধহয় সারা জীবনেও ততটা পরিশ্রম করো নি।

এই পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন আশালতা দেবী। বোধহয় রান্না করার সময় কথা বলতে ডিস্টার্ব হচ্ছে। সুব্রত বাবুও আর কিছু না বলে চুপ করে পত্রিকা পড়তে লাগলেন।
সুব্রত বাবু মনোযোগ দিয়ে পত্রিকায় কিছু একটা পড়ছেন,, এমন সময় হঠাৎ ভেসে আসতে লাগলো ওনার মেয়ের কণ্ঠস্বর।......

রাধিকা: Good Morning বাবা....

রাধিকার কথায় সুব্রত বাবু কিছু একটা বলতে যাবেন এমন সময় হঠাৎ আশালতা দেবী কিচেন থেকেই বলে উঠলেন-

আশালতা দেবী: কিরে বাবু, উঠে পড়েছিস। কিন্তু তুই এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়লি কেন? যা আরেকটু গিয়ে ঘুমো,, নইলে চোখের নিচে দাগ পড়ে যাবে যে!

রাধিকা: মা, তুমি আমায় নিয়ে এত উতলা হয়ো না তো! আমার ঘুম হয়েছে।

আশালতা দেবী: ও... তাহলে ফ্রেশ হয়ে নে! আমার রান্নাটা শেষ হয়ে গেলেই তোকে খেতে দিচ্ছি।

রাধিকা: মা, আমি আজ বাড়িতে খাব না! আসলে অর্জুনের সাথে আজ আমার দেখা করার কথা! দু'জন আজ বাইরেই ব্রেকফাস্ট করবো।

আশালতা দেবী: ও... ঠিক আছে! তাহলে যা.. আর ঠিকমতো ড্রাইভিং করবি কিন্তু!

রাধিকা: ওকে.. মা, তাহলে আমি আসছি। আর মা, দাদাকে ঠিকমতো ওষুধগুলো খাইয়ে দিও!
বাবা আমি তাহলে আসছি।

সুব্রত বাবু: খুব যে বলছিস আমি আসছি। আমি যদি না করি, তাহলে কি তুই শুনবি।

রাধিকা: মানে!

সুব্রত বাবু: মানে, তোকে বারবার করে আমি বলছি, ওই অর্জুন ছেলেটার হাবভাব মোটেই সুবিধের নয়! ও তোকে নয়, ভালোবাসে শুধু তোর টাকা পয়সা কে।

রাধিকা: "বাবা আবার!" ধুর, ভাল লাগে না!

এই বলে রেগেমেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল রাধিকা। সে চলে গেলে সুব্রত বাবু মনে মনে বলতে লাগলেন,, মারে, তুই যে কেন আমার কোনো কথা শুনিস না! আর কতবার তোকে বলবো, ওই অর্জুন নামের ছেলেটা তোকে কখনোই ভালোবাসতে পারে না! ও শুধু তোর সয়-সম্পত্তি, টাকা-পয়সাকেই ভালোবাসে। তুই একদিন ঠিকই বুঝতে পারবি, তোর বাবা কখনো তোর খারাপ চায় নি। সবসময় তোর ভালো চেয়েছে। ওই ছেলেটা সত্যিই খুব খারাপ, খুব লোভী। একমাত্র তোর সম্পত্তির লোভে পড়ে সে তোর সাথে এই ভালোবাসার নাটক করছে। কিন্তু সেটা বুঝতে যে তোর অনেক দেরি হয়ে যাবে রে মা! ভগবান প্লিজ, আমার মেয়েটার জীবনে এমন একজনকে পাঠাও,, যে আমার মেয়ের দম্ভ, অহংকার, প্রতিপত্তি ভেঙ্গে তাকে (রাধিকাকে) নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসবে। তার (রাধিকার) রাগ-অভিমান, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সব, সব ভাগ করে নেবে।

কথাগুলো মনে মনে বলে সুব্রত বাবু আবার খবরের কাগজ পড়তে আরম্ভ করলেন।


*


হিয়ান ফ্রেশ হয়ে আবার নিজের রুমে ফিরে এলো। পোশাক পরিধান করে ডাইনিং টেবিলের দিকে চলে গেল সে। ডাইনিং টেবিলে গিয়ে হিয়ান দেখলো রোজকার মতো তার দাদা আর আরু ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। আর তার বৌমনি রান্না করছে। আর তার মা কাল একটু ওনার বোনের বাড়িতে গিয়েছেন।
হিয়ান ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসতেই তার দাদা মৃদু হেসে বলল-

আয়ান: তা ভাই, কাল কেমন ইন্টারভিউ দিলি। তোর বৌমনির মুখে শুনলাম তুই নাকি এবার চাকরিটা পেয়েছিস। অফিসের বসকে কেমন লাগলো তোর?

হিয়ান: সত্যিই ওনার মতো মানুষ খুব কমই হয় রে দাদা। উনি আর বাইরের দশটা অফিসের বসের মতো চাকরি নিতে গেলেই ঘুষ চান না! উনি মানুষের মেধা, ব্যবহার-আচরণ দেখেই চাকরি দেন। আমি ভেবেছিলাম ওই চাকরিটাও বুঝি আমার হাতছাড়া হয়ে যাবে, কিন্তু ওনার মতো একজন ভালো মানুষের জন্য এবার আমায় আগের মতো হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়নি।

হিয়ানের কথাটা শুনে আয়ান কিছু একটা বলতে যাবে এমন সময় হঠাৎ পূর্ণা ডাইনিং টেবিলে ভাতের বাটিটা ঠাস করে রেখে বিদ্রুপ করে বলল-

পূর্ণা: সত্যিই হিয়ান, আমি কখনো ভাবতে পারিনি তুমি কখনো চাকরি পাবে! আমি তো ভেবেছিলাম তোমাকে সারাজীবন চাষাগিরি করেই সংসার চালাতে হবে।
87 Views
24 Likes
2 Comments
5.0 Rating
Rate this:
(24)

মন্তব্য

সকল মন্তব্যগুলো (2)

Reader photo
জান্নাত
16-Sep-2024, 12:06 PM

খুব ভালো লাগলো পড়ে।

মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
16-Sep-2024, 12:33 PM

Thanks

Reader photo
Airina Khatun "শিখান পাখি"
15-Sep-2024, 07:11 AM

খুব খুব খুব খুব খুব খুব সুন্দর লিখেছো ভাই 👌👌👌👌এভাবেই লিখতে থাকো পাশে আছি❤️🌻

মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
15-Sep-2024, 08:29 AM

ধন্যবাদ