কি করে বলবো তোমায় (পর্ব ০১)

কি করে বলবো তোমায় (পর্ব ০১)
"কই রে বাবু,, তাড়াতাড়ি আয়। সেই কখন থেকে আমি তোর জন্য ভাত বেড়ে বসে আছি।" - হাঁক পাড়লেন একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা।

ওনার হাঁক শুনে বিরক্ত হয়ে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এক ভদ্রলোক।

ভদ্রলোক: সকাল সকাল আবার চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু কোরো না তো গিন্নি।

মহিলাটি: আ, আমি চিৎকার করছি! আমি তো শুধু আমার বাবুকে ডাকছি।

ভদ্রলোক: সেটা একটু মিষ্টিমধুর সুরেও ডাকা যায়,, এভাবে কাকের মতো চিৎকার করেই যে ডাকতে হবে তা কেউ কোথাও লিখে দেয় নি।


"আহ বাবা, মা, তোমরা আবার ঝগড়া শুরু কোরো না তো।"

এই বলে হাই তুলতে তুলতে একটা একটা করে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপর তলা থেকে নিচ তলায় নেমে এলো এক পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সী মেয়ে।

ভদ্রলোক: নাও এসে গেছে তোমার গুণবতী কন্যা। তা বলি মহারানী, আপনার এতক্ষণে ঘুম ভাঙল।

মহিলাটি: ওকে এভাবে বলছো কেন! জানোই তো আমার বাবুটা একটু ঘুমোতে ভালোবাসে। আর তাছাড়া আমার বাবুটার এখন নাকি অফিসে খুব চাপ। তার উপর আজ আবার অফিসে ইন্টারভিউ আছে। ঠিকমতো না ঘুমোলে ইন্টারভিউ নিতে নিতে আমার বাবুটা ক্লান্ত হয়ে পড়বে না।

ভদ্রলোক: ইন্টারভিউ নেওয়া কি খুব পরিশ্রমের কাজ নাকি যে তোমার মেয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। আর তাছাড়া আমি যে এত বছর ধরে অফিসে ইন্টারভিউ নিলাম,, কই আমি তো কখনো ক্লান্ত বোধ করিনি।

মহিলাটি: এই শোনো,, তোমাদের যুগের ওই ফালতু বর্ণনা আমার বাবুদের যুগে দিও না তো। এটা হলো ডিজিটাল যুগ। আমার বাবু তোমাদের যুগে বাস করে না যে তাকে তোমাদের যুগের নিয়ম নীতি মেনে চলতে হবে। আমার বাবু মেনে চলবে এই ডিজিটাল যুগের নিয়ম নীতি। বুঝতে পেরেছো....

ভদ্রলোক নিজের স্ত্রীর কাছে এমন উল্টোপাল্টা উত্তর শুনে বলার মতো কোন ভাষা খুঁজে না পেয়ে হাতের পত্রিকা'টা নিয়ে রেগেমেগে ড্রয়িং রুমের দিকে চলে গেলেন। ভদ্রলোক সেখান থেকে চলে যেতেই মহিলাটি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এরপর ওনার বাবু অর্থাৎ ওনার মেয়েকে বললেন-

মহিলাটি: বাবু,, তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়। সেই কখন থেকে আমি তোর জন্য ভাত বেড়ে বসে আছি।

মেয়েটি: ঠিক আছে মা। আর দশ মিনিট অপেক্ষা করো,, আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।

এই বলে মেয়েটি ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে গেল।

********************************

কিছুক্ষণ পর ডাইনিং রুমে এসে হাজির হলো মেয়েটি। ডাইনিং রুমে এসে মেয়েটি দেখল সেই ভদ্রলোক এবং একটি কমবয়সী ছেলে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। কেউ এখনো খাওয়া শুরু করেন নি। মেয়েটিকে দেখে কমবয়সী ছেলেটি ম্লান হেসে তাকে বলল-

কমবয়সী ছেলেটি: কিরে রাধা,, আসতে এত দেরি হলো কেন তোর! সারা রাত কি কানাই এর সাথেই কথা বলেছিলি নাকি যে এত সকালেও তোর ঘুম*ই ভাঙছিল না।

মেয়েটি: কি বললি তুই,, কানাই! এই শোন- আমি রাত জেগে কোন কানাই টানাই এর সাথে কথা বলি না। কাল রাতে অফিসের কয়েকটি ফাইলের হিসেব মিলাতে মিলাতে একটু বেশি রাত হয়ে গিয়েছিল। এজন্য উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল,, বুঝেছিস।

বলতে বলতে একটা চেয়ারে বসে পড়লো মেয়েটি। সে চেয়ারে বসতেই সেই মহিলাটি তার দিকে খাবার এগিয়ে দিলেন। মেয়েটিও খেতে আরম্ভ করল। কমবয়সী ছেলেটি আর কিছু না বলে সেও খেতে আরম্ভ করলো। সাথে ভদ্রলোকটিও খেতে আরম্ভ করে দিলেন।

সবাই খেয়ে নিক,, ততক্ষণে চলুন পরিচয়টা সেড়ে ফেলি।
যেই মেয়েটিকে মধ্য বয়স্কা মহিলাটি বারবার বাবু বলে সম্বোধন করছেন সেই মেয়েটি হলো আমাদের গল্পের নায়িকা মিস. রাধিকা সেন। রাধিকা পড়ালেখা শেষ করে এখন বাবার গড়া অফিস সামলাচ্ছে। তার মা মিস. আশালতা দেবী একজন গৃহবধূ এবং তার বাবা মি. সুব্রত সেন কর্মজীবন ছেড়ে এবার অবসর গ্ৰহণ করেছেন। আর এই কমবয়সী ছেলেটি হলো রাধিকার দাদা মি. আর্য সেন। আর্য বছর দুয়েক আগে এক্সিডেন্ট করে বিছানা শয্যা নিয়েছে। সে আর হাঁটতে পারে না,, শুধুমাত্র হুইল চেয়ারে বসিয়ে মাঝে মাঝে তাকে বাইরে নিয়ে আসা হয়। আর্য'র এই অসুস্থতার কারণে এখনো তার বিয়ে হয় নি। তাকে নাকি সারাজীবন এই অসুস্থতার ভার বয়ে বেড়াতে হবে।

যাই হোক,, রাধিকা নিজের ব্রেকফাস্ট শেষ করে তার বাবা-মা আর দাদার কাছ থেকে বিদায় জানিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিল।




এবার চলুন আরেক দিকে যাই,, কোথায় বলুন তো?
আরে আমাদের নায়কের বাড়িতে। চলুন তাড়াতাড়ি।

একজন ভদ্রমহিলা: কিরে হিয়ান বাবা,, হলো তোর। এখনো আসছিস না কেন! সাড়ে দশটার মধ্যে যে ঢাকায় গিয়ে পৌঁছোতে হবে সে খেয়াল কি আছে তোর!

একজন কমবয়সী মেয়ে: মা, আপনি আয়ান আর আরুকে খেতে দিন,, আমি গিয়ে হিয়ানকে ডেকে নিয়ে আসছি।

একটি বাচ্চা মেয়ে: আর কাউকে কোথাও যেতে হবে না! ওই যে দেখো কাকাই আসছে।

বাচ্চা মেয়েটির মিষ্টি মিষ্টি কথাগুলো শুনে মুচকি হেসে খাবার টেবিলে এসে বসলো এক বছর সাতাশ-আঠাশের ছেলে। তাকে দেখে ভদ্রমহিলাটি তার দিকে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বললেন-

ভদ্রমহিলা: "হ্যাঁ রে হিয়ান" আজ বেলা এগারোটার সময় যে তোর চাকরির ইন্টারভিউ,, সে খেয়াল কি আছে তোর!

একজন কমবয়সী ছেলে: "মা, তুমি ওকে এভাবে বলছো কেন! এমনিতেই ভাইটা আমার কাল সারারাত জেগে পড়াশোনা করেছে। তার উপর তুমি ওকে এভাবে বকলে ও তো সব গুলিয়ে ফেলবে।

ভদ্রমহিলা: হয়েছে হয়েছে,, ভাইকে নিয়ে এত সর্দারি করতে হবে না তোমায়। তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে অফিসের দিকে রওনা দাও তো বাপু!

ভদ্রমহিলার কথা শুনে দুই ভাই ও সাথের বাচ্চা মেয়েটিও খেতে আরম্ভ করে দিল। তাদের তিনজনকে খেতে আরম্ভ করতে দেখে ভদ্রমহিলা কমবয়সী মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন-

ভদ্রমহিলা: "বৌমা, এক কাজ করো" তুমিও ওদের সাথে খেতে বসে পড়ো। আমি না হয় পরে খেয়ে নেব।

কমবয়সী মেয়েটি: না মা,, আপনিই বসে পড়ুন। আমিই না হয় সবার খাওয়া শেষ হলে খেয়ে নেব।

ভদ্রমহিলা: আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি না হয় সবার খাওয়া শেষ হলেই খেয়ে নিও।

এই বলে ডাইনিং টেবিলের সামনের একটি চেয়ারে বসে পড়লেন ভদ্রমহিলাটি। ভদ্রমহিলা চেয়ারে বসতেই ওনাকে খাবার বেড়ে দিতে লাগলো কমবয়সী মেয়েটি।


এবার চলুন এদের সাথেও পরিচয় করিয়ে দিই। যেই ছেলেটা পরে ডাইনিং টেবিলে এসে বসলো সেই হলো আমাদের গল্পের নায়ক হিয়ান দেব রায়। হিয়ানের বাবা হিয়ান ছোট থাকতেই হার্ড-অ্যাটাক করে মারা যান,, তারপর থেকে হিয়ান তার মা আর দাদার কাছে থেকে বড় হয়েছে। হিয়ানের মা আরোহী রানী একজন গৃহবধূ। হিয়ানের দাদা আয়ান দেব রায় ঢাকার একটি সরকারি অফিসে মোটা স্যালারির চাকরি করেন। হিয়ানের বৌদি পূর্ণা মিত্র'ও একজন গৃহবধূ। আর তার ভাইঝি কথাকলি দেব রায়। সে গ্ৰামের'ই একটি প্রাইমারি বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ছে।

সবার ব্রেকফাস্ট শেষে আয়ান আর হিয়ান বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে বাস স্টেশনের দিকে রওনা দিল। বাস স্টেশনে গিয়ে তারা দু'জন দেখল বাস এসে হাজির হয়ে গেছে। তা দেখে দু'জন বাসে গিয়ে উঠে বসলো। তারা বাসে ওঠার কিছুক্ষণ পর বাস ছেড়ে দিল। এখন সাড়ে আটটা বাজে। বাস সেখান থেকে মোটামুটি দশটার দিকেই ঢাকায় গিয়ে পৌঁছোবে।




(হাই বন্ধুরা,, আবারো আপনাদের মাঝে ফিরে এলাম নতুন একটি ধারাবাহিক গল্প কি করে বলবো তোমায় নিয়ে। আজ এ পর্যন্তই থাক। পরবর্তী পর্ব খুব শীঘ্রই পাবেন আশা করি। এই পর্বটা কেমন হয়েছে অবশ্যই আপনাদের মূল্যবান মতামত দ্বারা আমায় জানাবেন। আর লাইক রেটিং দিতে আর আমায় ফলো করতে তো একদমই ভুলবেন না। আপনার আমার পাশে থাকলে আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে আপনাদের মনের মতন গল্প লেখার চেষ্টা করব।)
297 Views
29 Likes
5 Comments
5.0 Rating
Rate this:
(22)

মন্তব্য

সকল মন্তব্যগুলো (5)

Reader photo
নন্দিনী
19-Sep-2024, 10:16 PM

darun hoiche

মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
20-Sep-2024, 10:55 PM

ধন্যবাদ

Reader photo
রাজশ্রী
18-Sep-2024, 10:41 PM

অসাধারণ

Reader photo
রাজশ্রী
18-Sep-2024, 10:41 PM

চমৎকার

Reader photo
ফাতেমা আক্তার
20-Aug-2024, 01:49 PM

দারুন লিখেছেন,,,

মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
20-Aug-2024, 02:24 PM

ধন্যবাদ

Reader photo
আইয়ূব আলী
18-Aug-2024, 06:09 PM

খুব সুন্দর হয়েছে প্রথম পর্ব

মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
মোঃ আলমগীর হোসেন (আতিক)
18-Aug-2024, 10:27 PM

ধন্যবাদ