ছায়ার অন্তরালে

পলাশ
পলাশ
লেখক
ছায়ার অন্তরালে
নদীর ধারে নীরবতা
পলাশ নদীর ধারে বসে ছিল।
শীতের শেষ বিকেল। বাতাসে হালকা ঠান্ডা, নদীর পানি ধূসর রঙের, আকাশে কোনো নাটকীয় রঙ নেই—সব কিছু যেন খুব সাধারণ, খুব নির্লিপ্ত।
কিন্তু পলাশের ভেতরটা আজ অস্বাভাবিক রকম ভারী।
সে মোবাইলটা বারবার হাতে নিচ্ছে, আবার রেখে দিচ্ছে। স্ক্রিনে একটাই নাম ভাসছে—
মেহরিন।
ডাক দেবে কি দেবে না—এই দ্বিধাটাই গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত হয়ে উঠেছে।
পলাশ কথা বলতে পারে না এমন না।
কিন্তু তার অনুভূতিগুলো কথায় রূপ নিতে গেলেই কেমন যেন ভেঙে পড়ে।
সে গ্রাম থেকে শহরে পড়তে এসেছে দুই বছর আগে। ঢাকার পাশের এই ছোট শহরটাতে একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিল। সেখানেই প্রথম মেহরিনকে দেখে।
মেহরিন—
নামটার মতোই নরম, কিন্তু ভেতরে শক্ত।
সে খুব বেশি হাসে না, কিন্তু হাসলে চোখের কোণায় একটা গভীরতা তৈরি হয়। কথা কম বলে, কিন্তু যা বলে তাতে নিজের অবস্থান পরিষ্কার রাখে।
পলাশ প্রথম দিনই বুঝেছিল—
এই মেয়েটা শুধু সুন্দর না, সে নিজের মতো করেই দাঁড়াতে জানে।
কিন্তু ভালোবাসা তো যুক্তি মানে না।
একদিন ক্লাস শেষে মেহরিন তার খাতা ফেলেছিল। পলাশ তুলে দিয়েছিল।
এইটুকুই ছিল তাদের প্রথম কথা।
— ধন্যবাদ।
— সমস্যা না।
এই দুটো শব্দের ভেতর দিয়ে শুরু হয়েছিল এমন একটা সম্পর্ক, যেটা দুজনই প্রথমে নাম দিতে চায়নি।
তারপর ধীরে ধীরে—
একসাথে চা খাওয়া
একই রিকশায় বাড়ি ফেরা
একই বেঞ্চে বসে নোট মিলিয়ে নেওয়া
পলাশ কখন যে মেহরিনকে নিজের জীবনের অংশ করে ফেলেছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
কিন্তু জীবনের বাস্তবতা খুব নিষ্ঠুরভাবে ঢুকে পড়ে মাঝখানে।
পলাশের বাবার অসুস্থতা।
গ্রামের ঋণ।
পড়াশোনার খরচ।
ঢাকার বাসা ভাড়া।
সবকিছু একসাথে এসে তাকে চেপে ধরে।
মেহরিন তখনো পাশে ছিল।
চুপচাপ পাশে।
— তুমি খুব চুপ হয়ে গেছো ইদানীং।
একদিন বিকেলে সে বলেছিল।
পলাশ তাকিয়েছিল, কিছু বলার চেষ্টা করেও পারেনি।
— কিছু হলে বলবে তো?
মেহরিনের গলায় কোনো অভিযোগ ছিল না। শুধু উদ্বেগ।
পলাশ মাথা নেড়েছিল।
মিথ্যে আশ্বাস।
সে জানত, তার জীবনে এমন একটা সময় আসছে যখন তাকে শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরতেই হবে।
পড়াশোনা হয়তো থেমে যাবে।
মেহরিনের সাথে এই নীরব সম্পর্কও।
কিন্তু সে বলতেও পারেনি।
কারণ বললেই সব ভেঙে যাবে।
আজ নদীর ধারে বসে সে সেই ভাঙনের আগের শেষ নীরবতাটা অনুভব করছিল।
মোবাইলটা আবার কানে তুলল।
রিং বাজল।
একবার।
দুইবার।
— হ্যালো?
মেহরিনের গলা।
পলাশ কিছুক্ষণ চুপ থাকল।
— পলাশ? তুমি?
গলায় হালকা হাসি।
— হ্যাঁ… আমি।
— কোথায় আছো?
— নদীর ধারে।
— একা?
— হ্যাঁ।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
— তুমি কি ঠিক আছো?
এই একটা প্রশ্নেই পলাশের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
— জানি না।
মেহরিন আর কিছু বলল না।
কিন্তু পলাশ জানত—সে বুঝে গেছে, কিছু একটা ভাঙতে যাচ্ছে।
— আমি আসি?
মেহরিন শান্ত গলায় বলল।
পলাশ চোখ বন্ধ করল।
— না। আজ না।
— ঠিক আছে।
ফোনটা কেটে গেল।
নদীর ওপর সূর্যটা ডুবে যাচ্ছিল।
পলাশ মনে মনে ভাবল—
কিছু সম্পর্ক ভাঙে না একদিনে।
ধীরে ধীরে চুপ হয়ে যায়।
সে জানত, খুব শিগগিরই তাকে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যেটা শুধু তার জীবন না—মেহরিনের জীবনও বদলে দেবে।
আর সে জানত—
সে প্রস্তুত না।

চলবে,,,,,,,
লেখক পলাশ
31 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব