স্বপ্ননীলা

স্বপ্ননীলা
পনেরো বছরের একটা পুরোনো ছবি ফিরে দিলো google  ফোটো। কলেজ জীবন চটপটে মেয়েটা আজ কত পরিনত। কতো আত্মবিশ্বাসী। আয়নার সামনে নিজে দেখে চিনতেই পারছে না। তবে পনেরো বছর পুরনো কোন কথাই আজকাল ওর মনে পড়ে না।
ও দীপক সাথে বেশ সুখেই আছে।
মানবের সাথে ও সুখে ছিলোনা এমন নয়। কিন্তু শেষ দিকটায় ওর সম্পর্ক চিড় ধরেছিলো। ওর সাথে কেয়া একটা সম্পর্ক আছে জেনেই ও মানবের সাথে সম্পর্ক ভেঙে ছিলো। যদিও মানব কেয়াকে বিয়ে করে নি।
মানব ওকে ডিভোর্স ও দিতে চায় নি।  সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট করে বোঝাতে চেয়েছে মানব শুধু ওকে ই ভালোবাসে। এক প্রকার জোর করেই ও ডিভোর্স নিয়েছে। হয়তো ওর মনের পাগলামি এটা।
না ওদের বিচ্ছেদ পর। ও ভীষণ ভাবে ঘৃণা করছিলো মানবকে। মানবে ও সত্যিই ভালোবাসতো একটা সময়। ওরা প্রেম করেছে পাঁচ বছর, বিয়ে করে সংসার করেছে পাঁচ বছর। এই দশটা বছর মানব ছিলো জীবন নিয়ে উদাসীন।
অথচ ও যেই ওর জীবন থেকে সেরে গেলো। ও বিদেশে চাকরি নিলো। বাড়ি করলো গাড়ি করলো। হু ওর ভাইপোর মুখে ভাতের অনুষ্ঠানের সময় ওকে ও বাড়িতে ফিরে নিতে এসছিলো ওর মা। কিন্তু ও যায় নি। ও সারা জীবন ওর দুঃখের সঙ্গী ছিলো ঠিকই কিন্তু মানব যখন  সফল হবার পর ওকে ফিরতে চাইলো । তখন ওর কাছে ফিরে যাওয়ার অর্থ প্রমানিত হয় ও লোভি। তাই ও ফিরে যায় নি। বরং এক মাসের মধ্যেই দীপককে বিয়ে করে প্রমাণ দিয়েছে ওর কোন ছিটেফোঁটাও দূর্বলতা, অনুভূতি বেঁচে নেই মানবের জন্য।
সত্যিই প্রদীপের দেখানো স্বপ্নকে বিশ্বাস করে ও সেইদিন মানবের ঘর ছেড়ে ছিলো মা বাবার মতের বিরুদ্ধে। সেইদিন ওর পাশে কেউ ছিলোনা। প্রদীপ কিছু দিন টাইম পাশ করলো বললো আগে ডিভোর্স হোক তারপর বিয়ে করলো। বাবা আত্মহত্যা করলো। তবুও ও ভেঙে পরে নি। এই সময় দীপকের সাথে বন্ধুত্ব। মানব প্রদীপ, অভি কারো কথা ওর কাছে গোপন রাখিনি ও। তবুও দীপক ওকে বিয়ে করে নিলো ভালোই আছে ওরা। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড ভীষণ ব্যাস্ততার মধ্যে ওদের জীবনটা শুধু একটা অভ্যাসের মতো  যাতে না হয়ে যায় তার জন্য ওরা ওইক এন্ড ঘুরতে যায় এখানে ওখানে। আজ যেমন ওরা এসেছে বীরভূম এই অচেনা গ্রামে এটা কঙ্কালীতলা কাছে খুবই সুন্দর গ্রাম।
যারা শান্তিনিকেতন গিয়েছেন অথচ কঙ্কালীতলার দর্শন করেননি  এমন মানুষ খুব কমই আছেন। বোলপুর স্টেশন থেকে  ৭-৮ কিমি দূরে কোপাই নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির। এখনে ওর আসতে খুবই ভালো লাগে। কারণ এখানকার মন্দির প্রাঙ্গণে রিতী মতো এখন মেলা বসে।
তবে  ধর্মীয় ভাবেও এর গুরুত্ব অনেক খানি।
বীরভূম জেলায় অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিপীঠ ও গ্রাম। এটা একান্ন সতীপীঠের মধ্যে অন্যতম; এখানে দেবী সতীর কোমর বা কাঁকাল পড়েছিলো  হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়।  তাই তান্ত্রিক সাধনার জন্য প্রসিদ্ধ এই জয়গাটা এবং এখানে একটি পবিত্র কুন্ড আছে যার জল কখনও শুকায় না।
তাই এখানকার প্রধান আকর্ষণ মন্দিরের পাশে পাড় বাঁধানো ছোট পুকুর।এই পুকুরটি সতীকুন্ড নামে পরিচিত।পুরাণ মতে, সতীর অস্থি এখানে এসে পড়ার ফলে একটি কুণ্ডের সৃষ্টি হয়।
পুরাণ মতে, সতীর অস্থি এখানে এসে পড়ার ফলে একটি কুণ্ডের সৃষ্টি হয়।
দীপক এখানে ওকে নিয়ে এসেছে অন্য কারণে। ওরা একটা সন্তান চায়। তাই কোন তান্ত্রিক বাবার কাছে এসছে ওরা। কিন্তু কঙ্কালীতলা বা বোলপুরে কোন হোটেলে না উঠে একটা বাগান বাড়িতে ওঠেছে। ঐ তান্ত্রিক কথায় কোপাই নদীর তীরে একটা অজানা অচেনা জায়গায় এসেছে ওরা। বাড়িটার নাম "স্বপ্ন নীলা"। কি অদ্ভুত নাম। তবে রাতে বাড়িটা কে ও ভালোভাবে দেখতে পাই নি। যদিও ওর এখানে আসার ইচ্ছাই ছিলো না এবার। কারণ কঙ্কালীতলা তোর ওর দেখা।
ওর ইচ্ছা ছিলো দুর্গাপুরের কাছে রনডিহা ড্যামে নির্জনে একটা দিন কাটাতে। এখানে থাকার জন্য ও কাঠ খড় পুড়িয়ে অনুমতি জোগাড় করেছিলো ও এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার, দামোদর হেড ওয়ার্কস ডিভিশন থেকে। কারণ  রনডিহা ড্যামে থাকার জন্য  সবচেয়ে ভালো অপসানহেরিটেজ। ১৯১৯ সালে অ্যান্ডারসন সাহেব নির্মিত সেচ দপ্তরের বাংলো। এটি নদীর ধারে ছায়াঘন অসাধারন পরিবেশে।
না ও রনডিহা ডাম কোন দিন যায়নি। কিন্তু ও  কোথাও ঘুরতে যাওয়া আগে অনেক হোম ওয়ার্ক করে। অনেক লেখা পড়ে। সাম্প্রতিক ও রনডিহা  ডামের ওপর লেখা পড়েছে।
"শীতের কুয়াশা পথে, সূর্য ডুবে যায় মাঠে
বাঁকা চাঁদের হাসি মিঠে, নীল আকাশের সাথে "

শীতের অপেক্ষা আমরা ভ্রমণ প্রিয় মানুষরা মনে হয় সারা বছর ধরেই করি। সুন্দর হিমেল আমেজ ভ্রমণকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর করে তোলে। চারিদিক কুয়াশা মাখা পরিবেশ, পাখি আর প্রজাপতিদের সমাগম, সাথে খেজুর গুড়ের আঘ্রাণ।

এরকমই এক শীতের দিনে প্রিয়জনের হাতটি ধরে গ্রামের পথে হেঁটে বেড়ানোর অনুভূতিটাই আলাদা। শীতের আগে থেকেই অনেকে প্ল্যান করে প্রিয়জন, পরিবার-পরিজন বা বন্ধু-বান্ধবদের সাথে নিরিবিলিতে একটা রাত কাটানোর। শুধুই আড্ডা আর অনেক আনন্দ।
রানভিহা ভাম একরাত্রি দুদিন কাটানোর উৎকৃষ্ট জায়গা। তবে সকালে গিয়ে বিকালেও ফিরতে পারেন অর্থাৎ এক বেলা ট্যুরেও জায়গাটিতে আসতে পারা যায়।

দামোদর নদ - এ যেন সীমানা নির্ধারক। কখনো সে ভাগ করেছে বর্ধমান-বাঁকুড়া জেলাকে, কখনো সে বর্ধমান থেকে পৃথক করেছে হুগলিকে। আবার সেই পশ্চিমবঙ্গকে ঝাড়খন্ড থেকেও পৃথক করেছে। এর দীর্ঘ প্রায় ৬০০ কিলোমিটার গতিপথে গঠিত হয়েছে বিভিন্ন ড্যাম। আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি ঠিক সেরকমই এক ড্যামের সামনে -  রনডিহা ।

সেচ বিভাগের বহু দেশি-বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার ও সচিবের তত্ত্বাবধানে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় এটির নির্মাণ কার্য। পাঁচটি লকগেট বিশিষ্ট। ড্যামটির নির্মাণকার্য শেষ হয় ১৯৩৩ সালে এবং সেই বছরেই ২রা সেপ্টেম্বর বাংলার গভর্নর জন অ্যান্ডারসন এটির উদ্বোধন করেন, যে লিপি আপনারা গেটের গায়ে দেখতে পাবেন। এই জায়গাটির বিশেষত্ব এখান থেকে সূর্যাস্ত। অসাধারণ সেই রূপ। শীত হোক বা গ্রীষ্ম এই দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখির সমাগম হয় এখানে। পিকনিক করার একটা উৎকৃষ্ট জায়গা। শীতে নদীতে জল খুব কম থাকে, এপার ওপার হওয়া যায়। একটা নৌকা ভাড়া করে চলে যেতে পারেন অপর পারে বাঁকুড়ায়। জায়গাটি পূর্ব বর্ধমান জেলায় অবস্থিত ।



ও চুপচাপ বসে থাকাতে পচ্ছন্দ করে তাই ওর জন্যই এ জয়গাটা খুব আদর্শ ছিলো। তবে নিতান্তই ঘুরতে চাইলে  আশেপাশে অনেক কিছু  দেখতে পারতো দীপক। পাশেই আছে লালটু সাধকের শ্মশান, এটি ঘুরে আসতে পারতোও। এছাড়া এর অনতি দূরের কসবা। যেখানে আছে চাঁদ সওদাগরের ভিটে, তাঁর পূজিত শিবলিঙ্গ, বেহুলা লক্ষিন্দরের বাসর ঘরের স্থল, মাটির তলা থেকে উদ্ধার হওয়া ভরতপুর- প্রাচীন বৌদ্ধ স্তুপা। যেটি পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র অক্ষত এবং বৃহৎ বৌদ্ধস্তুপ।


যাওয়া ও সহজ ছি্লো হাওড়া - আসানসোলগামী ট্রেনে চেপে নামতে হবে  পানাগর স্টেশনে। সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে রনডিহা। বাস অথবা টোটো তে পৌঁছে যেতে পারবেন।

কিন্তু  দীপকের জেদ জন্য আসতে হলো এখানে। যদিও এ জায়গা টা নির্জনে। স্বপ্ননীলা নাকি এক বাঙালি ভদ্রলোক এর স্বপ্ন।ইকো ট্যুরিজমের বলতে পারেন।এক বেলার জন্য গেলে এখানে খাওয়া-দাওয়া সারতে পারেন। আদিবাসী গ্রামের মধ্যে অনেকটা জায়গা কিনে। একটা আশ্রম মতো করতে চেয়েছে। আশ্রম নামটা শুনলেই ওর এখন গায়ে জ্বর আসে। কারণ মানবকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যেতে বললেই ওক নিয়ে যেতো ওর মাসির গোবর্ধন আশ্রমে। ও ওর যুবতী বয়সে অন্তত পচিশ বার বৃন্দাবন ঘুরে নিয়েছে ঐ আশ্রমে ভক্ত নিয়ে যাওয়া আসা করতে।

70 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই