আলীগড় রাজ্য। সীমান্ত ঘেরা গর্বিত এক জনপদ। পাহাড়, নদী আর উর্বর জমিনে ভরপুর এই রাজ্য ছিল সমৃদ্ধি আর শক্তির প্রতীক। আর এই শক্তির সর্বোচ্চ শিখরে বসে ছিলেন বাদশাহ সিরাজ আলী চৌধুরী। তিনি কঠোর, বিচক্ষণ এবং রহস্যময় এক শাসক, যিনি যেমন যুদ্ধ জানতেন, তেমনি জানতেন প্রতিপক্ষকে কিভাবে চুপিসারে চূর্ণ করতে হয়।
সিরাজ আলীর একমাত্র কন্যা শাহজাদী আয়েশা সিদ্দিকা, ছিলেন তাঁর চোখের মণি। রাজদরবারের লোকেরা বলত— শাহজাদী যেমন রূপে অনন্য, তেমনি তার চোখে ছিল বুদ্ধির দীপ্তি। সিংহাসনের উত্তরাধিকার না হলেও, তিনি রাজ্যের বহু সিদ্ধান্তেই প্রভাব ফেলতেন। আয়েশা জানতেন, আলীগড় কেবল বাহ্যিক শত্রু দ্বারা নয়, বরং অন্দরেই ঘাপটি মেরে থাকা বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারা আক্রান্ত।
সাম্প্রতিক কয়েক মাসে রাজ্যের সীমান্তে বেড়ে চলা গুপ্ত হামলা, দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা, এবং সেনাপতির নিখোঁজ হওয়া—সবই ইঙ্গিত দিচ্ছিল, রাজ্যের ভেতরেই কেউ আছে, যে ছায়ার মতো কাজ করছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বাদশাহ ঘোষণা করলেন এক ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিযোগিতা— “বাঘ বন্দী খেলা”। এই খেলার আড়ালে ছিল এক জটিল উদ্দেশ্য: রাজ্যের ভেতরের ষড়যন্ত্রকারীকে চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতের উত্তরসূরির উপযুক্ত কাণ্ডারিকে খুঁজে বের করা।
প্রতিযোগিতার নিয়ম ছিল— বিশাল এক লোহার খাঁচায় রাখা হবে একটি রাজবাঘ। প্রতিযোগীর কাজ হবে, সেই বাঘটিকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে নিজের বুদ্ধি ও কৌশলে তাকে আবার বন্দী করা—কোনও রকম অস্ত্র বা সহিংসতা ছাড়াই। বিজয়ী পাবে বাদশাহর বিশেষ পুরস্কার, আর… হয়তো কিছু আরও গভীর পুরস্কার, যার খবর কেবল বাদশাহ আর শাহজাদী জানতেন।
সকাল থেকে রাজপ্রাসাদের প্রাঙ্গণে ভিড় জমে উঠল। কেউ এসেছে মজার জন্য, কেউ নিজের ভাগ্য বদলাতে, কেউ গোপন উদ্দেশ্যে। প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাদশাহ সিরাজ আলী, পাশে আয়েশা। আয়েশা নিচের ভিড় লক্ষ্য করছিলেন—খুঁজে চলেছেন এক অপরিচিত চেহারা, এক অচেনা চোখ, যার দৃষ্টিতে থাকবে চাতুর্য, সংযম আর কিছু না বলা কথা।
ঠিক তখনই, ভিড় চিরে এগিয়ে এল এক তরুণ। ধুলোয় মাখা সাদা কুর্তা, কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ, চোখে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি আত্মবিশ্বাস।
“আপনারা আমাকে চেনেন না,” ছেলেটি বলল দৃঢ় কণ্ঠে, “আমি এসেছি গ্রাম থেকে, নাম সালিম। আমি এই খেলায় অংশ নিতে চাই।”
ভিড়ে হাসির গুঞ্জন। কেউ বলল, “কৃষক এসে বাঘের সঙ্গে খেলতে এসেছে!”
কিন্তু আয়েশার চোখ স্থির হয়ে গেল সালিমের চোখে। এই চাহনি... কোথায় যেন দেখা...
বাদশাহ গম্ভীর গলায় বললেন, “তোমার সাহস প্রশংসনীয়। কিন্তু জানো তো, এই খেলায় জীবন ও মৃত্যু খুব কাছাকাছি?”
সালিম মাথা নত করে বলল, “আমি জানি, মহারাজ। তবে সবকিছুই বুদ্ধি দিয়ে জয় করা যায়, শক্তি দিয়ে নয়।”
পরদিন সকালে শুরু হল খেলা। বিশাল আয়তনের লোহার খাঁচায় ছিল বাঘটি—ধূসর-কালো ডোরা, শাণিত নখ, ভয়ঙ্কর এক দৃষ্টি। যারা প্রথমে খেলায় অংশ নিয়েছিল, কেউই টিকতে পারেনি এক মিনিট। কেউ ভয় পেয়ে পালিয়েছে, কেউ বাঘের গর্জনে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।
শুধু সালিম, ঠাণ্ডা মাথায় খাঁচার সামনে বসে রইল ঘণ্টাখানেক। বাঘের দিকে তাকিয়ে যেন সে তার মন বোঝার চেষ্টা করছিল। কেউ বুঝল না, সে কী করছে।
দুপুর নাগাদ সালিম উঠে দাঁড়াল। সে ধীরে ধীরে খাঁচার দরজার তালা খুলে দিল। সবাই থ মেরে তাকিয়ে আছে। বাঘ বেরিয়ে এল, কিন্তু বিস্ময়করভাবে, সালিমের উপর একটুও আক্রমণ করল না। সে জঙ্গলের দিকে হাঁটা দিল।
তিন ঘণ্টা পর, দূরে একটা বাঁশি বাজল। মুহূর্তের মধ্যে বাঘটি আবার ফিরে এল, সালিমের পেছনে পেছনে। সালিম তার হাতে রাখা কিছু খাবার ছুঁড়ে দিল খাঁচার ভেতরে, বাঘ ঢুকে পড়ল, আর তালা পড়ে গেল বন্ধ।
জনতা স্তব্ধ। রাজসভায় নিস্তব্ধতা। এমন কৌশল কেউ কল্পনাও করেনি।
বাদশাহ দাঁড়িয়ে গেলেন।
“এই খেলা ছিল কেবল বাঘকে নিয়ে নয়,” তাঁর গলা ছিল ভারী, “এই খেলা ছিল আমাদের ভেতরের শত্রুকে বুঝে নেওয়ার খেলা। এই তরুণ—সালিম—জয়ী শুধু খেলায় নয়, আমাদের আস্থাতেও।”
আয়েশা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এসে সালিমকে বললেন, “তুমি কীভাবে জানলে বাঘ ফিরে আসবে?”
সালিম মুচকি হাসল। “বিশ্বাস ছিল, রাজকুমারী। যেমন কেউ কেউ নিজের হৃদয়ের পথ ফেরে... সময় হলেই।”
আয়েশা স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলেন তার চোখে। যেন সে ঠিক বুঝে গিয়েছেন—এই খেলার শুরু আজ, শেষ এখনও আসেনি।
চলবে..............................
বাঘ বন্দী খেলা (০১)
78
Views
1
Likes
0
Comments
5.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই