ওমা, আজ এতো তাড়াতাড়ি এলে যে? তোমার না ইফতারের দাওয়াত আছে?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল নেহা।
“আসলে, তোমার সাথে ইফতার করতে খুব ইচ্ছা করছিল। তাই আসা আরকি।” আদ্রিয়ান বলল। কিন্তু ওর উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। হঠাৎ কিছু লোক দরজায় কড়া নাড়ল। নেহা আর আদ্রিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ল তারা। আর গুলি করল নেহাকে।
হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায় আদ্রিয়ানের। দরদর করে ঘামছে সে। নেহার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করে নিজেকে। এক গ্লাস পানি খেয়ে নেহাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল আদ্রিয়ান। কিন্তু ঘুমাতে পারল না সারারাত। স্বপ্নটাই বারবার ঘুরে ফিরে আসছে।
সময়ের সাথে পাল্টে যায় সবকিছু। পাল্টায় মন, বিশ্বাস আর ভালোবাসা। তৈরি হয় অবিশ্বাস, বাড়ে বিশ্বাসঘাতকতা, অপরাধ। পাল্টে যায় পশু। ভালোবাসা কি পারে সবকিছু পাল্টাতে?
আমার গল্পের নায়িকা নেহা যেমন শান্ত আর চুপচাপ স্বভাবের, ভালোবাসে বই পড়তে, আর কবিতা ও গল্প লিখতে। ডায়েরি লিখতে ভীষণ ভালোবাসে। কতকিছুই তো থাকে ডায়েরিতে। কবিতা ও গল্প লেখার খসড়াগুলোই তার ডায়েরিতে পাওয়া যায়। প্রতিটা চরিত্রই খুব প্রিয়। নেহার লেখা কবিতার মধ্যে একটা ঠিক এরকম:
আমি সত্য, আমি বিদ্রোহ
যাকে থামাতে কেউ সাহস পায়নি
তাকে থামানোও যায় না।
আমি শান্ত, আমি ক্লান্ত
কেউ জানে না এর কারণ
জানাতেও আমি চাই না।
আমি রাগী, আমি জেদী
কাউকে বোঝাতে গেলে আমি
হয়ে যাই অপরাধী।
আমি পড়ুয়া, আমি পাঠক
কথা দিয়ে কেউ যুদ্ধ করতে এলে
ছিন্না করে দিই আস্তে, ধীরে।
আমি চুপচাপ,
আমার নীরবতাই আমার কথার সমান।
আমি হাসিখুশি,
নেশা আমার বন্ধু বানানো
মিশে যাওয়াই আমার কাজ।
আমি আবেগী,
কিন্তু তা কেউ বুঝতে চায় না
তাই বোঝাই না কাউকে।
আমার মন কীসের তৈরি,
তা আমি জানি না।
ধোঁকা পেতে পেতে,
তা এমন শক্ত হয়েছে সে
কারো কষ্টে মনটাকে গলাতে পারি না।
আমি হেরে যাচ্ছি বলে,
তারা আমাকে অপমান করে
তাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমি হেরে যাচ্ছি বলে,
কথা দিয়ে মনোবল ভেঙে দিতে চাইছে।
কিছু বললেই বলে,
সে বেয়াদপ, শিক্ষা ভালো পায়নি।
সময় ছাড় দেয়, ছেড়ে দেয় না।।
আমার সুযোগ আসবে যখন,
দেখাবো আমার রূপ।
আমার কাছে তাদের ক্ষমা চাইতেই হবে,
যখন জবাব দেওয়ার সময় আমার আসবে।
রূপ, রং, চেহারা দিয়ে
কাউকে বিচার করা যায় না।
কর্ম আর আচার দিয়ে,
বিশ্ব আর মানবমন, -
দুটোকেই জয় করা যায়।
আমি যা করি,
তা একান্তই আমার।
আমার উপর কেন তারা অধিকার ফলায়?
যে অধিকার তাদের নেই।
যারা এখন অপমান করছে,
এই অপমান তাদের জন্য অভিশাপ
হয়ে দাঁড়াবে
তা কি তারা জানে না?
আমাকে নিয়ে কথা বলতে এসো না।
আমার ব্যক্তিত্বের সামনে কিছুই না তোমরা,
বরং শুধু শুধু অভিশাপ ডেকে আনবে
নিজেদের জীবনে।
নেহার এই ডায়েরি লেখার নেশাটাই আদ্রিয়ানকে অনেকটা কাছে এনেছে।
নেহা তার বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। নেহারা দুই বোন, এক ভাই। ছোট ভাই নাফি ক্লাস সেভেনে পড়ে আর বড় বোন ডাক্তার। বোনের বিয়ের সময় নেহা ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ত। বড় বোন আদিতার বিয়ের সময়ই বৌভাতের অনুষ্ঠানে পরিচিত হয় এই আদ্রিয়ানের সাথে। তখন আদ্রিয়ান ভার্সিটিতে অপরাধবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ত। প্রথম দেখাতেই নেহাকে দেখে ভালো লেগে যায় আদ্রিয়ানের।
নেহাকে দেখে আদ্রিয়ান প্রথম দিন ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিল দেখে। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে তার প্রথম প্রেমিকা তার ভার্সিটিতে। নেহা বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। তখন আদ্রিয়ান চাকরির পাশাপাশি মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েছিল। নিজের ক্লাসমেট অনি, ফয়সাল, শহীদ, রানা, রাজ সবাইকে বলেছিল সে একটা স্কুলে চাকরি পেয়েছে। কিন্তু নেহা কখনোই জানতে পারেনি আদ্রিয়ান ওকে ভালোবেসেছিল। একদিন নেহা জানতে পারে ওর বান্ধবী কলি ও সাফিয়ার কাছে যে, কেউ একজন নেহাকে ফলো করে। কলি হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী, আর সাফিয়া মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্ট।
বেশ কিছুদিন খেয়াল রাখতেই নেহার সিনিয়ার উমা আপু আদ্রিয়ানকে ধরে ফেলল হাতেনাতে। উমা আপু, সিনথিয়া আপু আর প্রমি আপু আদ্রিয়ানের ক্লাসমেটদের সহ হাজির করল নেহার কাছে। নেহার সেদিন ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল কোনো এক অজ্ঞাত কারণে। ওটা জানার পর নেহা একেবারেই অবাক। ও কিন্তু আদ্রিয়ানকে চিনতে পারেনি। আদ্রিয়ানও ওকে ইচ্ছে করেই বলেনি। যা হোক, প্রমি আপু বলল, "দেখ নেহা, আমাদের এই হ্যান্ডসাম ক্লাসমেট তোমাকে দেখার জন্য বার বার এখানে আসত। এখন তুমি ওকে শাস্তি দাও।"
নেহা বলল, "আপু, তুমিই বলো কি শাস্তি দেব। এখানকার নিয়মগুলো আমি ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারিনি। তাই তুমিই বলো।"
প্রমি বিজ্ঞের মতো বলল, "ঠিক আছে, আমিই বলছি।" আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, "আদ্রিয়ান, তুই তাই অন্যায় করেছিস, এখন তোকে শাস্তি পেতেই হবে। আর শাস্তিটা হচ্ছে কান ধরে দশবার উঠবস। নে নে শুরু কর।"
নীল প্রজাপতি
37
Views
1
Likes
0
Comments
5.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই