ছায়ার অন্তরালে

পলাশ
পলাশ
লেখক
যা বলা হয়নি
মেহরিন সেদিন রাতে ঘুমাতে পারেনি।
পলাশের কণ্ঠটা বারবার কানে বাজছিল—
জানি না।
এই দুইটা শব্দে এত অনিশ্চয়তা লুকানো থাকতে পারে, সে আগে জানত না।
সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। শহরের আলো, দূরের বাসের হর্ন, পাশের বাসার ছাদের টিভির শব্দ—সবকিছু চলছিল স্বাভাবিকভাবে।
কিন্তু তার ভেতরটা অস্বাভাবিক রকম অস্থির।
পলাশ ইদানীং বদলে গেছে।
কম কথা বলে।
চোখে চোখ রেখে কথা বলে না।
মেসেজের রিপ্লাই দিতে দেরি করে।
মেহরিন এসব লক্ষ করেছিল।
কিন্তু সে চাপ দিতে চায়নি।
কারণ সে জানে—
ভালোবাসা মানে জোর করা না।
তবুও, একটা সীমা থাকে।
পরের দিন বিকেলে সে নিজেই নদীর ধারে চলে গেল।
ওরা যেখানে বসত, সেই পুরনো পাকা ঘাটে।
পলাশ সেখানে ছিল না।
মেহরিন মোবাইল বের করল।
— কোথায় আছো?
মেসেজ পাঠাল।
দশ মিনিট পার হলো।
কোনো রিপ্লাই নেই।
আরও দশ মিনিট।
তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত চাপ অনুভব হলো।
শেষে সে কোচিং সেন্টারের দিকে গেল।
পলাশ সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।
হাত পকেটে, চোখ মাটিতে।
মেহরিন তাকে ডাকল না।
সে নিজেই এগিয়ে গেল।
— তুমি ফোন ধরো না কেন?
পলাশ চমকে তাকাল।
— ওহ… আমি… নেট ছিল না।
মেহরিন বুঝল, এটা অজুহাত।
— তুমি ইদানীং আমার থেকে পালাচ্ছো কেন?
তার গলায় রাগ ছিল না, ছিল ক্লান্তি।
পলাশ চুপ।
— কিছু হলে বলো। আমাকে অন্ধকারে রেখো না।
মেহরিনের গলা এবার একটু শক্ত।
— আমি ঠিক নেই, মেহরিন।
— সেটা তো দেখছিই। কেন ঠিক নেই, সেটা বলো।
পলাশ গভীর শ্বাস নিল।
— আমার বাবা খুব অসুস্থ। গ্রামে অনেক ঋণ। পড়াশোনা চালানো সম্ভব হবে না।
— আমাকে শহর ছাড়তে হতে পারে।
এই প্রথম সে কিছুটা সত্য বলল।
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ থাকল।
— তুমি আমাকে এটা এতদিন বলোনি কেন?
— বলতে পারিনি।
— না, বলতে চাওনি।
মেহরিনের কণ্ঠে কষ্ট।
পলাশ মাথা নিচু করল।
— তুমি কি চলে যাচ্ছো?
মেহরিন সরাসরি প্রশ্ন করল।
পলাশ থেমে গেল।
এই প্রশ্নটার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।
— জানি না।
এই একই শব্দ।
মেহরিন হালকা হেসে ফেলল।
— তুমি সবকিছুতেই ‘জানি না’ বলো কেন?
— কারণ আমি নিশ্চিত কিছু না।
— কিন্তু আমি তো নিশ্চিত হতে চাই।
তার গলায় এবার কাঁপুনি।
— পলাশ, আমি খেলনা না। আমি এমন কারো সাথে থাকতে চাই না যে নিজের জীবনেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
এই কথাটা পলাশের বুকে লাগল।
— আমি তোমাকে ভালোবাসি।
সে হঠাৎ বলে ফেলল।
এই প্রথম।
মেহরিন থমকে গেল।
— তাহলে এমন করছো কেন?
পলাশ কিছু বলল না।
কারণ সে বলতে পারছিল না—
আমি তোমাকে আমার অনিশ্চিত জীবনে টানতে চাই না।
আমি জানি না, কাল আমি কোথায় থাকব।
আমি তোমাকে কষ্ট দিতে ভয় পাই।
এই কথাগুলো তার মুখ পর্যন্ত এসেও ফিরে গেল।
মেহরিন চোখের পানি আটকে বলল—
— ভালোবাসা মানে শুধু অনুভব করা না, দায়িত্ব নেওয়া।
পলাশ চুপ থাকল।
এই নীরবতাটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় ভুল।
— তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না?
মেহরিন প্রশ্ন করল।
— করি।
— তাহলে আমাকে সিদ্ধান্তে পাশে রাখো না কেন?
পলাশ কোনো উত্তর দিল না।
মেহরিন একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল।
— ঠিক আছে।
— তুমি যখন নিশ্চিত হবে, তখন কথা বলবে।
সে ঘুরে চলে গেল।
পলাশ দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হচ্ছিল, সে আজ কিছু একটা হারাল।
কিন্তু তখনো সে বুঝতে পারেনি—
এই হারানোটা সাময়িক না, দীর্ঘ।
পরের পর্বে আসবে:
পলাশের গ্রামে ফিরে যাওয়া, হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ, মেহরিনের অপমানবোধ ও সিদ্ধান্ত—
এবং সেই মেসেজটা, যেটা পড়ে পলাশের
পৃথিবী থেমে যাবে।

চলবে,,,,,,,

28 Views
0 Likes
0 Comments
0.0 Rating
Rate this:
(0)

মন্তব্য

কোন মন্তব্য নেই

সকল পর্ব