শীতকালের সকাল ওর কাছে ভীষণ প্রিয়। শীতকালীন সকাল মানে কুয়াশা ও শিশির:। ঘন কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলো ফোটার সাথে সাথে ঘাস, পাতা ও ফুলের উপর জমে থাকা শিশির বিন্দুগুলো মুক্তা বা সোনার মতো ঝলমল করে। যেনো হেসে সুপ্রভাত বলে ওকে।
সকালের আলোটাও কত মিষ্টি।ভোরের নরম, মিষ্টি রোদের আভা প্রকৃতিকে এক মায়াবী রূপ দেয়, যা কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে আসে। কিরকম একটা রহস্য ময় মনে হয় পৃথিবীটাকে। আলোহীন নয় তবুও মায়াবী অন্ধকার। মায়ের আচলে লোকানোর অনুভূতি থাকে সকাল টায়।
শহরের শীতকালীন শহরের দুষণ জন্য জীবন মজাই পাওয়া যায় না। কুয়াশায় চাদরে ঢাকা শহরে কাছের মানুষকেও অচেনা লাগে। কিন্তু গ্রামীণ জীবনের কথা আলাদা।মাঠে মাঠে ধান কাটা চলে, বাতাসে ভেসে আসে নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ। চাষীরা দল বেঁধে কাজ করে এবং শিশুরা রোদে খেলা করে।
গ্রামের সকাল প্রধান আকর্ষণ খেজুরের রস। ও দীপকে পাঠিয়েছে কোথায় খেজুরের রস পাওয়া যায় তার খোঁজ নিতে। শীতের সকালে খেজুরের গাছ থেকে রস সংগ্রহ এবং সেই রস দিয়ে তৈরি পিঠা ও গুড় খাওয়ার দৃশ্য গ্রাম বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী চিত্র। খেজুরের গাছে থেকে রস সংগ্রহ করা দেখতো ওর ভালো লাগে।
খেজুরের রস সংগ্রহ করার কথা মনে পরতেই মানবের কথা মনে পড়লো। খেজুরের রস সংগ্রহ নিয়ে একটা তথ্য চিত্র তৈরি করতে গিয়ে অনেক পয়সা নষ্ট করেছিলো মানব। এদের জীবনের কথা নিয়ে কার বা আগ্রহ থাকবে কিন্তু ও সব বোঝে না। বলতো এদের দূর্দাশার কথা মানুষের কাছে তুলতেই হবে। তবে এই সময় অনেক কিছু ও জানতে পেরে ছিলো খেজুরের গুড় সম্পর্কে।
শীতকাল মানেই তোপৌষ পার্বণ । পৌষ পার্বণ মানে পিঠে পায়েস। আর পিঠে পায়েস মানেই নলেন গুড়।খেজুর রস থেকে তৈরি গুড়কেই নলেন গুড় বলে বা খেজুর গাছের রস থেকে তৈরি হয় নলেন গুড়। বাংলায় জনপ্রিয় এই গুড়ের ব্যবহার ছিল প্রাচীনকাল থেকেই দক্ষিণ ভারতে । কারণ বাংলা-দ্রাবিড় অভিধানে ‘ণরকু’ শব্দের অর্থ হল কাটা বা ছেদন করা। অবার বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধান মতে নরুন বা নরশনি মানেও কিন্তু কাটা বা ছেদন করা। নরুন হল গ্রাম বাংলার নাপিতের ক্ষৌর অস্ত্র। খেজুর গাছ থেকে রস বের করতে গুড় প্রস্তুতকারীরা প্রথমে দা বা কাটারি দিয়ে চেঁছে দেয় হয়। তারপর নরুনে দিয়ে ফুটো করে সেখান থেকে একটা বাঁশের ছিলা বা নল লাগিয়ে দেওয়া হয় হাঁড়ি পর্যন্ত, এই নল দিয়ে রস চুঁইয়ে হাঁড়িতে আসে। এর থেকেই এই গুড়ের নাম নলেন গুড় হয়।যাঁরা এই খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করেন তাদের বলা হয় শিউলি, কথ্য ভাষায় ‘গাছি’-ও বলা হয়। নলেন গুড় তৈরি করতে শিউলিদের ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত খাটতে হয়৷
নলেন গুড় তৈরি করার অনেক ধাপ আছে৷ প্রথম ধাপ হল ‘গাছ কাটা’৷ হেমন্তের হিমেল হাওয়ায় হাল্কা শীত শুরু হয় , সেই সময় থেকেই গাছ কাটার কাজ শুরু করতে হয় শিউলিদের৷ প্রথমে খেজুর গাছের পাতা কেটে পরিষ্কার করতে হয়৷ কেটে ফেলতে হয় অধিকাংশ পাতা৷ এই কাজকে গ্রাম্য ভাষায় বলে ‘গাছ কাটা’৷
গাছ কাটা’র পর খেজুর গাছের একেবারে উপরের দিকে পাতার ঠিক নিচের কান্ড কেটে পরিষ্কার করতে হয়৷ পরিষ্কার অংশ চেঁছে পরিষ্কার করার পর খেজুর গাছের কান্ডের ওই অংশ কিছুটা নরম হয়ে যায়৷ তখন কান্ডের নরম অংশে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় একটা কাঠি বা নল৷ এই কাঠি বেয়ে টুপটুপ করে বেরিয়ে আসে খেজুর রস৷ এই নল বা কাঠি সাধারণত বাঁশের কঞ্চির একটা অংশ কেটে নিয়ে সেটাকে লম্বালম্বি মাঝখান থেকে চিরে ফেলতে হয়৷ ফলে মাঝখানে একটা সরু পথ তৈরি হয়৷ এই পথ দিয়েই রস বেরিয়ে আসে।
শীতের শুরু থেকে গাছে রস আসতে শুরু করে৷ তখন শুরু হয় নলেন গুড় তৈরির দ্বিতীয় ধাপ৷ সূর্য ডোবার আগে মাটির কলসি গাছে এমন ভাবে ঝুলিয়ে দিতে হয় যাতে কলসির মুখটা কাঠির নিচে থাকে৷ সারারাত ধরে কলসিতে জমা হতে থাকে রস। পরদিন ভোরবেলা, সূর্যের আলো ফোটার আগে গাছ থেকে কলসি নামিয়ে নিতে হয়৷
নলেন গুড় তৈরির তৃতীয় তথা শেষ ধাপ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ৷ ভাল গুণমানের নলেন গুড় তৈরি করতে তৃতীয় ধাপে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার প্রয়োজন৷ মাটির উনুনে কাঠের জ্বালানি ব্যবহার করে রস ফোটাতে হয়৷ রস ফোটার সময় তার মধ্যে বিশেষ ধরনের হাতা দিয়ে সারাক্ষণ নাড়তে হয়৷ মূলত নারকেলের মালার অর্ধেক অংশে লম্বা কাঠ লাগিয়ে এই হাতা তৈরি করা হয়৷ কয়েক ঘণ্টা ধরে রস ফোটাতে হয়৷ যত সময় এগোয়, ততই নলেন গুড়ের গন্ধ পাওয়া যায়৷ গন্ধ যত বাড়বে, বুঝতে হবে গুড়ের মান ততই ভাল হচ্ছে৷
গুড়ের গুণমান রসের উপর নির্ভর করে৷ টানা তিনদিন রস সংগ্রহের পর বন্ধ করে দিতে হয়৷ একে বলে গাছের জিরেন৷ কারণ, প্রতিদিনই গাছে হাঁড়ি ঝোলানোর সময় কান্ডের কিছুটা অংশ চাঁছতে হয়৷ গাছকে জিরেন দিলে ওই তিন দিন, তা চাঁছতে হয় না৷ এর পর চতুর্থদিন বা জিরেনের পর প্রথমদিন যে রস সংগ্রহ করা হয়, তার স্বাদ অন্য রসের তুলনায় একেবারেই আলাদা৷ এই রস জিরেন-কাটের রস নামে পরিচিত৷ জিরেন-কাটের রস থেকে জিরেন-কাটের গুড় তৈরি হয়৷ এই গুড়ের স্বাদ সব থেকে ভাল৷
মানবের কথা মনে করতে চায় না ও কখনো কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি হয়ে ও ফিরে আসে বারবার।অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দের অর্থ হলো যা কাঙ্ক্ষিত নয়, অর্থাৎ অপ্রত্যাশিত, অনভিপ্রেত, অবাঞ্ছিত বা যা ঘটুক বলে কেউ চায়নি। এটি এমন কোনো ঘটনা, পরিস্থিতি বা ফলাফলকে বোঝায় যা পছন্দনীয় নয় বা যা এড়ানো প্রয়োজন। মানব ওর জীবন দূরঘটনার মতো ও ওকে ভুলে যেতে চায়।
ও হয়তো তাই এতো ঘুরাঘুরি করতে ভালো বাসে। আসলে প্রকৃতির রূপে একটা যাদু আছে সব দুঃখ কষ্ট ভুলতে সাহায্য করে। যেমন এই শীতকালের কথা ধরি একদিকে যেমন গাছ থেকে পাতা ঝরে যায়, তেমনি কিছু ফুল যেমন গাঁদা , ডালিয়া , গোলাপ কত ফুলে ভরে ওঠে বাগান, যা প্রকৃতির বৈচিত্র্য তুলে ধরে। আবার জলশয় গুলতে আসে না রঙের নাম অজানা পাখি। প্রকৃতি যেনো পাল্টে যায়। নতুন রূপ রঙচঙ মেখে সেজে ওঠে।
শীতে মানুষের জীবনযাত্রাও তো পালটে যায় । কনকনে শীতের সকালে মানুষ আগুন জ্বালিয়ে উষ্ণতা খোঁজে, কম্বলের নিচে উষ্ণ থাকে এবং পরিবার বা প্রতিবেশীর সাথে সময় কাটায়। অতন্ত দীপক যেমন হোক করে ছুটি জোগাড় করে ঘুরতে বেড়ায় ওর সাথে।
ও মানব লেখায় দেখেছে বাংলায় নানা অজানা অচেনা গ্রাম, মন্দির , নদী নালার কথা। অথচ ওকে তারাপীঠ , আদ্যাপীঠ, দীঘা ছাড়া কোথাও ঘুরতে নিয়ে যায় নি। মানবের ভ্রমণ কাহিনী গুলো খুব খুব নিখুঁত ভাবে লেখা থাকতো। ওকে জিজ্ঞাসা করলে অবলীলায় বলতো " হু গেছি, জোর করে শ্রাবন্তী নিয়ে গেছে। "
ও কষ্ট পেতো শ্রাবন্তী নামটা শুনে। কিন্তু মানব বুঝতে পারতো না। মুখ গোমড়া দেখে বলতো। "একটু পয়সা হোক নিয়ে যাবো"..
কথাটা আরো কষ্ট দিতো ওকে। কারণ মাঝে মাঝে মানব গল্প করতো শ্রাবন্তী আর ও হাতে গনা টাকা নিয়ে কিভাবে এখানে ওখানে ঘুরতে যেতো। ও মানব বলতে চাইতো চল আমিও কম টাকাতে ঘুরতে যাবো। কেন ও মানবের সাথে জয়পুর ঘুরতে গিয়েছিলো একদম খালি হাতেই। হোটেল ভাড়া ছিলো না। তাই রেলস্টেশনে রাত কাটিয়ে ছিলো ওরা। ও মানবের কথা ভাবতে চায় না তবুও মানবের কথা মনে পরে যায় বারবার।
অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি
59
Views
0
Likes
0
Comments
0.0
Rating

কোন মন্তব্য নেই