নর্তকীর মহল

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
মহেন্দ্রপুর গ্রাম, যেখানে সময় থেমে আছে। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত একটি প্রাসাদ, যার নাম "নর্তকীর মহল"। এই প্রাসাদটি ছিল তার সময়ের একটি বিখ্যাত নাচঘর। বহু রাজা-জমিদার এবং ব্রিটিশ সাহেবরা এখানে এসে মনোরঞ্জন করতেন। প্রাসাদের মালিক ছিল জমিদার দীনবন্ধু রায়, যার নর্তকীর প্রতি ছিল অগাধ প্রেম। নর্তকী মাধুরী দেবীর আকর্ষণীয় নাচ এবং সৌন্দর্য ছিল কিংবদন্তী। কিন্তু হঠাৎ একদিন, এক রহস্যময় রাতে, মাধুরী দেবী অদৃশ্য হয়ে যান। সেই রাত থেকে প্রাসাদে শুরু হয় অদ্ভুত ঘটনা। আজও কেউ জানে না সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল।
কাহিনী শুরু হয় বর্তমান সময়ে। গ্রামে আসে এক ভদ্র লোক যার নাম আর্য। তিনি একজন ইতিহাসবিদ এবং প্রাচীন স্থাপত্যবিদ। তিনি মহেন্দ্রপুর গ্রামে আসেন নর্তকীর মহল সম্পর্কে গবেষণা করতে। গ্রামের মানুষ তাকে সতর্ক করে, বলে যে এই প্রাসাদ অভিশপ্ত। আর্য তাদের কথায় কান না দিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করেন এবং সেখানে অদ্ভুত সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে থাকেন ধীরে ধীরে৷ আর্য প্রাসাদে প্রবেশ করার পর একটু ভয় পেয়ে যায়,ছিমছাম পরিবেশ নেই কোনো সারা শব্দ কেমন গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে৷ সবকিছু স্তব্দ,ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই কতো ধুলোবালি জমেছে৷ আর্য মনে মনে চিন্তা করছে সে প্রাসাদের ভেতর জমে থাকা সব ধুলোবালি নিজ হাতে পরিষ্কার করবে৷ আর্য অনুভব করলো,তার শরীরের পাশ দিয়ে শীতল হাওয়া বয়ে গেলো৷
এটা কি ছিলো?
এটা কি আমার মনের ভুল? আদৌ কি সত্যি হতে পারে?
আর্য সাত পাঁচ ভেবে চলে যায়৷ প্রাসাদের আনাচে-কানাচেতে সুন্দর ভাবে সব পরিষ্কার করে৷ অগোছালো প্রাসাদটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে ফেলে৷ প্রাসাদের প্রত্যেকটা কক্ষ খুব সুন্দর ভাবে সে সাজায়৷ প্রাসাদটা যেনো প্রান ফিরে পেলো৷ কয়েক ঘন্টা লাগিয়ে সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে সে যাবে স্নানঘরে তার চোখ পড়ে এক দরজার দিকে যেটার কথা সে কারো কাছে শুনেনি৷ দরজাটা খুবই সুন্দর। যে দেখবে তার চোখ পড়বে এই দরজার উপর,দরজাটা কেমন অদ্ভুত সুন্দর যা বলে বুঝানো সম্ভব না৷ আমার কি যাওয়া উচিৎ এখন এই দরজার কাছে? কি এমন আছে এর পেছনে যে এতো সুন্দর করে বানানো হয়েছে৷ যাইহোক পরে এসে দেখবো কি আছে এতে৷ আর্য চলে যায় স্নানে৷ বিকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে৷ আশেপাশে সব নিরব হয়ে আছে৷ আর্য বেরিয়ে এসেছে স্নান থেকে৷ পেটে এতো খিদে তার কিছু যে রান্না করে খাবে সেই উপায় ও নেই৷ তার শরীর ও আর চলছে না৷ কি ধকলটা না গেলো সারাদিন৷ হয়তো আজ না খেয়েই থাকতে হবে আমায় সমস্যা নেই, কাল সকাল চলে যাবো কোনো এক দোকানে তারপর কিছু খেয়ে নিবো৷
সন্ধ্যা ও প্রায় শেষ এর দিকে৷ আর্য বসে যায় এক ইতিহাস এর বই নিয়ে৷ সে খুব মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে থাকে৷ কিন্ত কি একটা যেনো তাকে ভাবতে খুব বাধ্য করছে৷
প্রাসাদটা অনেক বিশাল৷ কিন্তু কক্ষ মাত্র চারটা৷ এই প্রাসাদের আনাচে কানাচে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে৷ লুকিয়ে আছে সেই অদৃশ্য হওয়া মাধুরী দেবীর কাহিনি৷
যাক এসব পরে ভেবে নিবো৷ রাততো কম হলোনা আর বিছানায় যেয়ে শুয়ে পড়ি সেটাই ভালো হবে৷
আর্যর যেই ভাবা সেই কাজ৷ সে বিছানায় শুয়ে পড়ে কিন্তু কোনোভাবেই তার ঘুম আসছে না৷ এপাশ ওপাশ করতে করতে ঘুম আর হয় না তার৷
আর্য নিজের মোবাইল টা বের করে ব্যাগ থেকে৷ মোবাইলে নেই নেটওয়ার্ক৷
কি এক জ্বালা৷ এই প্রাসাদে না আছে নেটওয়ার্ক,আশেপাশে না আছে কোনো খাবারের দোকান৷ কি মহাবিপদে পড়লাম রে বাবা৷
রাত যতো গভীর হচ্ছে মনে ততো ভয় বাড়ছে৷ কেনো এমন হচ্ছে আমার সাথে৷ এর আগে আমি অনেক বাঁধা পেড়িয়ে এসেছি৷ তখন এমন কিছুই আমি অনুভব করিনি৷
ঠিক তখনি আর্য শুনতে পায় এক কান্নার অওয়াজ৷ খুব করুন স্বরে কান্না করছে৷ আর্য পা বাড়ায়,ক্রমশ কান্নার আওয়াজ বাড়ছে৷ মনে হচ্ছে কেউ যেনো এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে আর কান্না করছে৷ পায়ের নূপুর বাজছে,ফ্লোরে দেখা যাচ্ছে রক্ত মাখা পায়ের ছাপ৷
আর্য অনেক খোঁজাখুঁজি করে ও পেলো না কিছু৷ প্রাসাদের উপর এর ঘর গুলোতে তালা দেওয়া৷ এই চাবি কোথায় রাখা সে জানে না৷ সেই কোনো এক ঘর থেকে ভেসে আসে কারো কন্ঠস্বর৷ কন্ঠ শুনে তার মনে হচ্ছে কোনো মধ্য বয়সি এক লোক কথা বলছে সাথে রয়েছে এক মেয়ে ও৷ মেয়েটা কান্না করছে অনেক৷ তার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে আর্য৷
কিন্তু প্রাসাদে আমি একা৷ এটা কিভাবে হতে পারে? এই প্রাসাদে কি আর ও মানুষের আত্মা ঘুরছে? আমিতো জানতাম শুধু মাধুরী দেবির কথা৷ এর কিছুক্ষন পর শুনতে পায় সেই ঘর থেকেই কারো গানের আওয়াজ ভেসে আসছে৷ কি মধুর কন্ঠ, কি সুর তার৷ এতো সুন্দর আওয়াজ সে আগে কখনো শুনেনি৷ ধীরে ধীরে গানের সাথে সাথে নাচের ও শব্দ পাওয়া যাচ্ছে৷ সেই পরিচিত পায়ের নূপুর এর শব্দ৷
আর্য সেই কক্ষটির সামনে যেতে থাকে৷ এতো আস্তে আস্তে সে ফ্লোরে পা ফেলছে,মনে হচ্ছে সে চুরি করতে এসেছে৷ চুপিচুপি এসে কক্ষের সামনে দাঁড়ায়৷
আর্য মুগ্ধ হতে লাগলো গানের আওয়াজে৷ কিন্তু তার দুঃখ হচ্ছে সে নাচ দেখতে পারছে না বলে আর মেয়েটিকে দেখতে পারছে না বলে৷ দরজা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও সে সুগন্ধির ঘ্রাণ পাচ্ছে৷ এতো মিষ্টি এই ঘ্রান৷
কৌতূহলবশত আর্যর খুব জানতে ইচ্ছা করছে কি হচ্ছে এই কক্ষের ভেতর৷
তখনই, দরজার ওপাশ থেকে ভয়ংকর চিৎকার ভেসে আসে।"কে ওখানে? তাড়াতাড়ি চলে যাও!" মেয়েটির গলা ভেতর থেকে প্রচণ্ড রাগে থরথর করে কাঁপছিল।চমকে গিয়ে আর্য এক পা পিছিয়ে যায়। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে যায়। সে বুঝতে পারে যে মেয়েটি খুবই ক্রুদ্ধ হয়েছেন।"আমি আর্য... আমি কোনো ক্ষতি করতে চাইনি," কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দেয় আর্য।"চলে যাও বলেছি!" মেয়েটির গলা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। "এটা তোমার জায়গা নয়।"আর্য ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে থাকে, মেয়েটির ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর এখনও তার কানে বাজছে। সে দ্রুত সেই জায়গা ছেড়ে চলে আসে এবং বিছানায় শুয়ে পড়ে এবং তার মনে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে।
693 Views
10 Likes
4 Comments
4.3 Rating
Rate this: