সিজন_২
পর্ব_৮
মাইশা আরিয়ানকে দেখা মাত্রই আরিয়ানের আড়ালে তার গুছিয়ে রাখা ব্যাগটা কে লুকিয়ে ফেলল। আরিয়ান মাইশার এরূপ কাণ্ড দেখে মুচকি একটু হাসলো।
মাইশা প্রচন্ড অভিমানের স্বরে আরিয়ান কে বলল,
------- কেন এসেছ তুমি আমার রুমে।
আরিয়ান মাইশার কাছে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ওর ঘাড়ে আরিয়ানের থুতনি রেখে আস্তে করে বলল,
-------- আমার বউয়ের ঘরে আমি এসেছি তাতে তোর কি।
-------- তোমার বউয়ের ঘর মানে। এখানে তোমার বউ থাকে না এখানে আমি থাকি।
আরিয়ান মাইশাকে পিছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে বলল
--------ঐ একই তো হল। তুই তো আমার বউ আর আমি তো আমার বউয়ের ঘরে এসেছি।
মাইশা নিজেকে আরিয়ানের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
-------- আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলতো একটা ছেলের ঠিক কয়েকটা মেয়ে প্রয়োজন।
--------- কার কয়টা মেয়ের প্রয়োজন তা আমি জানি না আমার শুধু তোকে প্রয়োজন।
মাইশা এবার আর চুপ থাকতে পারল না কিছুটা চেঁচিয়ে আরিয়ানকে বলল,
-------- ব্যাস অনেক হয়েছে আরিয়ান ভাইয়া প্লিজ আর কোনরকম মিথ্যা কথা বলো না।
-------- মিথ্যা কথা মানে।
-------- আর কোনরকম ভনিতা করো না আরিয়ান ভাইয়া তোমার তো গার্লফ্রেন্ড আছে তার পরেও কেন তুমি আমার পিছনে পড়ে আছো।
মাইশার কথা শুনে কিছুটা অবাক হলো আরিয়ান। আরিয়ান বুঝতে পারছে না মাইশা এই সব কি বলছে। যে আরিয়ান আজ পর্যন্ত মাইশা ছাড়া অন্য কোন মেয়ের দিকে ভুলেও তাকায় নি।তাকে কি না মাইশা এই রকম কথা বলছে। আরিয়ান মাইশার এই কথাটা একদম সহ্য করতে পারল না।
মাইশা কে কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলল,
--------- দেখ একদম উল্টাপাল্টা কোন কথা বলবি না। আমার জীবনে তুই ছাড়া অন্য কোন মেয়ে নেই।
-------- অন্য কোন মেয়ে যদি নাই থাকে তাহলে ওদিন তোমার ঠোঁট কিভাবে ফুলল তোমার গলায় আর ঘাড়ে কিভাবে নখের আঁচড় এলো।
মাইশার কথা শুনে আরিয়ান এবার সবটা বুঝতে পারল। সে দিন রাতে তো মাইশাই আরিয়ানের ঠোঁটে কামড় দিয়ে তারপর ফুলিয়ে দিয়েছিল আর মাইশার ই নখের আঁচড় লেগেছিল তার গলায় আর ঘাড়ে মাইশার হয়তোবা মনে নেই কারণ ও একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। এইজন্য হয়তো বা লোকে বলে যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর। মাইশার জন্য ওর ওই অবস্থা হলো এখন মাইশা ই ওকে দোষারোপ করছে।
আরিয়ানকে চুপ করে থাকতে দেখে মাইশা একটু হেসে বলল,
--------আমি জানি এর কোন উত্তর তোমার কাছে নেই। প্লিজ তুমি আমার রুম থেকে চলে যাও।
আরিয়ান হঠাৎ করে রুমের দরজা বন্ধ করে দিল। এইভাবে হঠাৎ রুমে দরজা বন্ধ করে দেওয়াতে মাইশা একটু ভয় পেয়ে গেল। আরিয়ান একটু একটু করে মাইশার কাছে আগাচ্ছে আর মাইশা একটু একটু করে পিছাচ্ছে। মাইশা পিছাতে পিছাতে দেয়ালের সাথে মিশে গেল।
আরিয়ান ওর দুই হাত ওয়ালের সাথে ভর দিয়ে মাইশার খুব কাছে এসে মাইশা কে বলল,
-------- তুই কি বলতো মাইশা, তুই কি সব ভুলে গেলি।
------- সব ভুলে গেলাম মানে।
-------- তোর মনে নেই সেদিন রাত্রে তুই কি করে ছিলি আমার সাথে।
-------- দেখো একদম কোন বাজে কথা বলবে না আমি কি করেছি তোমার সাথে? যে তুমি আমাকে এই সব কথা বলছো।
--------- ও তুই কিছুই করিস নি। আচ্ছা আমি দেখাচ্ছি তুই ঠিক কি করে ছিলি।
আরিয়ান মাইশার ঠোঁটের দিকে তাকালো।মাইশার ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। মাইশা একটা শুকনো ঢোক গিলে আরিয়ানকে বলল,
------- তু----তুমি এইভাবে তা----
কথাটা শেষ করার আগেই আরিয়ান তার ঠোঁট দুটো মাইশার ঠোঁটে ডুবিয়ে দিল। মাইশা তার হাত দিয়ে আরিয়ানের পিঠে কিল ঘুষি মারতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পর আরিয়ান মাইশা কে ছেড়ে দিয়ে মাইশার কানের কাছে মুখ এনে আস্তে করে বলল,
-------- সেদিন ঠিক এই ভাবেই তুই আমার কাছে এসে ছিলি। পার্টিতে ড্রিংকস করে তুই নেশা গ্রস্ত অবস্থায় ছিলি তাই তোর কিছু মনে নেই।
মাইশা খুব অধীর মনোনিবেশ করে ভাবতে লাগলো সেই দিনকার কথাগুলো। মাইশার কিছু কিছু কথা মনে পড়ল। মাইশা মাথা নিচু করে চুপ করে আছে।
আরিয়ান মাইশার থুতনি ধরে মাইশার মুখটা উঁচু করল। মাইশাকে একটা চোখ টিপ মেরে বলল,
-------- হে মাই হট বেবি। এখন চুপ করে আছো কেন।আসলে আমি ভাবতেই পারি নি আমার এই পিচ্চি বউ টা এতো টা রোমান্টিক। তাইতো তোকে বিয়ে করার জন্য এতটা পাগল হয়ে উঠেছি।
মাইশা কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেল আরিয়ানের মুখে এমন কথা শুনে।
-------- দেখো আরিয়ান ভাইয়া আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই না। সেদিন রাত্রে যা হয়েছিল সম্পূর্ণ টা আমার অনিচ্ছায় আমার নেশার ঘোরে।
আরিয়ান মাইশার ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে বলল,
--------- না আর কোন কথা বলবি না তুই।আমি তোর মুখ থেকে না শব্দটা শুনতে চাই না। আমি তোকে খুব ভালোবাসি মাছরাঙ্গা পাখি। আমার নিজের জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসি। কেন বুঝতে চাস না তুই বলতো।
তারপর আরিয়ান তার পকেট থেকে আংটি টা বের করে মাইশার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।মাইশার হাতটা আচমকা টান দিয়ে ওর অনামিকায় আংটি পরিয়ে দিল।মাইশা ফ্যালফ্যাল করে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। মাইশা ও জানে আরিয়ান তাকে সত্যিই অনেক বেশি ভালোবাসে। কিন্তু মাইশার কিছুই করার নেই। ছেলেদের এরকম ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মেয়েরা সব সময় আকুলতার সাথে অপেক্ষা করে। মাইশা সেই ভালোবাসা পেয়েও গ্রহণ করতে পারছে না। কারণ তার নিয়তি তাকে এটা গ্রহণ করার মত ভাগ্য দেই নি।
মাইশা কে চুপ করে থাকতে দেখে আরিয়ান মাইশার দু'হাত ধরে বলল,
------- কি হল আমার মাছরাঙ্গা পাখিটা কথা বলছে না কেন।
আরিয়ানের কথায় মাইশার ভাবনার ছেদ ঘটলো। মাইশা আরিয়ানের হাত থেকে নিজের হাত দুটো টান দিয়ে নিয়ে বলল,
------ আমার পক্ষে এই বিয়েটা কিছুতেই করা সম্ভব নয়। তুমি তোমার আংটি ফেরত নিয়ে যাও।
মাইশা আংটি খুলতে যাবে তখনই আরিয়ান মাইশার হাত চেপে ধরল।
-------- সাবধান আমি যে আংটি আমার বউয়ের হাতে পরিয়ে দিয়েছি সেটা ভুলেও খুলবি না।
------- কি খালি বউ বউ করছে তোমার সাথে কিন্তু আমার এখনো বিয়ে হয়নি সুতরাং আমি কিন্তু তোমার বউ নই।
আরিয়ান হো হো শব্দ হেসে উঠলো। আরিয়ানকে হঠাৎ হাসতে দেখে মাইশা অবাক হয়ে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে,
'''' এই গরমে আরিয়ান ভাইয়া কি পাগল হয়ে গেল নাকি এভাবে হাসছে কেন।
-------- এই তুমি এই ভাবে হাসছো কেন।
-------- কারণ তোর ভাবনা যেখান থেকে শেষ আমার ভাবনা সেখান থেকে শুরু।
-------- মানে!
-------- মানে, কাগজে কলমে অনেক আগেই তুই আমার বউ হয়ে গেছিস।
আরিয়ানের কথা শুনে মাইশা যেন আকাশ থেকে পড়লো। মাইশা হা করে তাকিয়ে আছে আরিয়ানের দিকে।
-------- কিরে এই ভাবে হা করে আছিস কেন। মুখে তো মাছি ঢুকে পড়বে।
মাইশা স্বাভাবিক হয়ে বলল,
------- তুমি কি বললে আমি বুঝলাম না।
-------- তোকে আমি একদিন কতগুলো কাগজ সিগনেচার করতে দিয়েছিলাম মনে আছে তোর।
-------- হুম
-------- তোকে বলেছিলাম কাগজ গুলো ভালো করে দেখে সিগনেচার করতে কিন্তু তুই তা করিস নি।সেই কাগজ গুলোর মধ্যেই তোর আর আমার কাবিন নামা ছিল।
-------- কি!
-------- জি। সুতরাং আইন মোতাবেক তুই আমার স্ত্রী।
------- মানি না আমি এই বিয়ে।
আরিয়ান মাইশার কোমর জড়িয়ে ধরে মাইসাকে কাছে এনে বলল,
-------- ওহ্ মাই সুইট হার্ট তুমি না মানলে ও তুমি আমার বউ। তুই আমার ছিলি , আমার আছিস আর সারা জীবন আমারই থাকবি। যদি এই বিয়েতে কোনরকম অমত করিস তাহলে কিন্তু এই বন্ধ ঘরে তুই আর আমি একা আমি কিন্তু এই মুহূর্তে তিন কবুল বলে আর তোকে দিয়ে তিন কবুল বলিয়ে আমার স্বামীর অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারি। কিন্তু আমি তা করতে চাই না সামাজিকভাবে ধুমধাম করে সবাইকে জানিয়ে এই আরিয়ান চৌধুরীর বউ করে তোকে আমার জীবনে সারা জীবনের জন্য আনতে চাই।
হঠাৎ আরিয়ানের ফোনটা বেজে উঠলো। আরিয়ান ফোনটা হাতে নিয়ে মাইশার রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরিয়ানের যাওয়ার পানে তাকিয়ে মাইশা ভাবছে,
""" এত বড় একটা ভুল আমি কি করে করলাম। আমার কাগজ গুলো ভালো করে দেখে পড়ে নিয়ে তারপরে সাইন করা উচিত ছিল। এখন আমি কি করবো। না না সকালের অপেক্ষা করলে চলবে না আজকে রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাবার পর সবার চোখের আড়ালে আমাকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।
আরিয়ান মাইশার রুম থেকে বেরিয়ে আড়ালে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করার সাথে সাথে ওই প্রান্ত থেকে আরিয়ানের এক লোক তারেক বলে উঠলো,
-------- স্যার আমাদের কাজ হয়ে গেছে এখন কি করবো।
-------- গুড ভেরি গুড। ওকে একটু ভালো করে আপ্যায়ন কর দেখো ওর আপ্যায়নে যেন এতো টুকু কমতি না থাকে।
কথা শেষে আরিয়ান ফোনটা রেখে দিয়ে নিজে নিজে বলল,
-------- তোর খুব শখ কফি খাওয়ার তাইনা দেখব আজকে তুই কত কফি খেতে পারিস।
************
রিয়াদ নিজেকে হাতমুখ আর চোখ বাধা অবস্থায় একটা ঘরে আবিষ্কার করল। কেউ একজন এসে রিয়াদের চোখের আর মুখের বাঁধন খুলে দিল। রিয়াদ সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
------- এই কারা তোমরা। আমাকে কেন এই ভাবে এখানে ধরে নিয়ে এসেছো।আর কেন আমাকে এখানে বন্দী করে রেখেছো।
তারেক রিয়াদের সামনে বসে তিনটা কফির ফ্লাক্স রেখে রিয়াদকে বলল,
-------- আমি শুনেছি আপনি আমাকে খুব কফি খেতে পছন্দ করেন তাই আপনাকে আজকে এখানে কফি খাবার জন্য তুলে নিয়ে আসা হয়েছে।
-------- মানে! তোমরা কি আমার সাথে মজা করছো। ভালোয় ভালোয় আমাকে এখান থেকে ছেড়ে দাও তা না হলে কিন্তু।
রিয়াদ কথাটা শেষ করার আগেই তারেক রিয়াদের দলে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল।
-------- তোর সাহস তো কম নয় তুই একজনের হবু বউয়ের উপর নজর দিয়েছিস আবার আমার সামনে বসে এত জোর গলায় কথা বলছিস।
-------- একদম কোন আজেবাজে কথা বলবে না আমার নামে।আমি কারো হবু বউয়ের দিকে নজর দেইনি তোমরা ভুল করছ।
-------- এই চুপ তোর লেকচার শোনার জন্য তোকে এখানে নিয়ে আসা হয়নি। চুপচাপ এই তিনটা ফ্লাক্সের কফি যত দ্রুত শেষ করতে পারবি তত দ্রুত তোকে এখান থেকে ছেড়ে দেয়া হবে।
রিয়াদ তাকিয়ে দেখল তার সামনে অনেক বড় বড় তিনটা কফির ফ্লাক্স। একটা কফির অর্ধেক ফ্লাক্স খেলেই তাকে আর আজকে খুঁজে পাওয়া যাবে না আর তিনটা ফ্লাক্স খেতে গেলে তো তার জীবনটাই বেরিয়ে যাবে। কিন্তু কে তার সাথে এমন করছে কি শত্রুতা তার সাথে রিয়াদের। তারেক একজনকে ডেকে আনলো রিয়াদের হাত দুটো পিছন থেকে এনে সামনে বাঁধতে। সে তারেকের কথামতো রিয়াদের হাত দুটো পিছন দিকে খুলে সামনে এনে বাঁধলো।
তারপর রিয়াদের সামনে ফ্লাক্স থেকে কফি নিয়ে কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,
-------- নিন দ্রুত শুরু করুন।
রিয়াদ কিছুতেই খেতে চাচ্ছিল না। তারেক রিয়াদকে পরপর কয়েকটা থাপ্পর মারলো। রিয়াদ বাধ্য হয়ে কফি খাওয়া শুরু করল।
*************
রাতের বেলা,
সবাই ঘুমিয়ে যাবার পর মাইশা তার ব্যাগটা নিয়ে চুপিচুপি রুম থেকে বেরিয়ে গেল। দরজার সামনে গিয়ে তার কাছে থাকা এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজার লক খুলতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু কিছুতেই দরজার লক খুলছে না। কয়েকবার চেষ্টা করার পরও দরজার লক খুলো না। মাইশা তার মোবাইলের ফ্লাশ লাইট জ্বালিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো সিকিউরিটি লক লাগানো। কিন্তু এই বাসায় কখনো তো কেউ সিকিউরিটি লক লাগায় না। তবে আজকে কেন লাগালো। সিকিউরিটি লকের কোন এক্সট্রা চাবি মাইশার কাছে নেই। তাই মাইশা দরজা খুলতে পারছে না। অন্ধকারে কেউ হঠাৎ মাইশার হাত টাকে এক ঝটকা টান দিয়ে মাইশাকে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।
মাইশা চিৎকার করতে যাবে সঙ্গে সঙ্গে মাইশার মুখ চেপে ধরে বলল,
------- কি!কি ভেবেছিলি তুই তুই আমাকে ফাঁকি দিয়ে এই বাড়ি থেকে চলে যাবি আর আমি কিছুই বুঝতেও পারবো না।
কন্ঠস্বর টা শুনে মাইশা একদম চমকে গেল। কিন্তু মাইশা বুঝতে পারছে না আরিয়ান কি করে জানল যে সে এই বাড়ি থেকে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে কি আরিয়ান বুঝে ফেললো সবটা।
আরিয়ান মাইশা কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে মাইশার ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে বলল,
------- যাকে এত ভালবাসি। যে কাবিন নামায় আমার অর্ধাঙ্গিনী। তাকে এই বাড়ি থেকে আমি এক চলে যেতে দেবো সেটা তুই কি করে ভাবলি মাইশা।
মাইশা আরিয়ানের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য পীড়াপীড়ি করছে। আরিয়ান মাইশাকে একটা ধমক দিয়ে বলল,
-------- এমন করছিস কেন মনে হয় যেন অন্য কেউ তোকে ধরেছে। আরে তোর স্বামী তোকে ধরেছে অন্য কেউ ধরে নি আর অন্য কারো এত সাহস নেই যে আমার বউয়ের গায়ে হাত দিবে।
-------- দেখো আমাকে ছাড়ো। আমাকে যেতে দাও বলছি।
আরিয়ান মাইশার কোনো কথা না শুনে মাইশা কে কোলে তুলে নিল।
--------- আরে কি করছো কি ছাড়ো কেউ এসে পড়লে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
------- আমার বউকে আমি কোলে নিয়েছি কেউ আসলে আসুক তাতে আমার কি।
আরিয়ান মাইশা কে কোলে নিয়ে আরিয়ানের রুমের দিকে হাঁটা শুরু করলো। মাইশা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,
------- একি তুমি আমাকে তোমার রুমের দিকে কেন নিয়ে যাচ্ছো।
আরিয়ান মাইশার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
--------- তোকে খুব ভালোবাসি ইচ্ছে করছে আজকে তোকে মন ভরে ভালোবাসবো তাই।
কথাটা শুনে মাইশার যেন কলিজা শুকিয়ে গেল। মাইশা কিছুটা তোতলিয়ে বললো,
-------মা--- মা-----মানে!
------- মানেটা হল সিম্পল। তোর সাথে যেহেতু আমার কাগজে কলমে কাবিন হয়েই গেছে তাহলে আর বাঁধা কিসের আজ রাতে তোকে আমি আমার করে নেব।
-------- এই না না না প্লিজ প্লিজ তুমি এরকম কিছু করো না।
আরিয়ান মাইশার কোন কথা না শুনে মাইশা কে নিজের ঘরে নিয়ে বিছানার উপর ফেলে দিল। ভয়ে মাইশার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হলো। রুমে এসি চলা সত্ত্বেও মাইশা ঘামতে লাগলো। আরিয়ান রুমের দরজা বন্ধ করে দিল। আরিয়ান শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে এক পা দু পা করে মাইশার দিকে আগাচ্ছে। মাইশা বিছানা থেকে উঠতে যাবে তখনই আরিয়ান মাইশা কে চেপে ধরল।
মাইশা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
--------- প্লিজ ছেড়ে দাও আমাকে বিয়ের আগে এইসব করোনা আমার সম্মানটা আমাকে ভিক্ষা দাও।
আরিয়ান হেসে উঠলো। আরিয়ান মাইশার মুখে তার আঙ্গুল দিয়ে ছুঁইয়ে দিয়ে দিতে দিতে বলল,
--------- তোকে তো আমি আগেই বলেছিলাম যদি বেশি বাড়াবাড়ি করিস তাহলে আমি কিন্তু আমার অধিকার ছিনিয়ে নেব। তুই আমার কথা শুনিস নি এখন তোকে কে বাঁচাবে এখান থেকে।
মাইশা আর কোন উপায় না পেয়ে বলে উঠলো,
------- তুমি যা বলবে আমি তাই করবো।আমাকে ছেড়ে দাও প্লিজ।
-------- ঠিক তো ।
-------- হুম।
-------- তিন সত্যি বল।
--------- কেনো আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তোমার।
--------- বলবি না কি আমি শুরু করবো।
-------- ব---বলছি। সত্যি সত্যি তিন সত্যি।
আরিয়ান মাইশার কপালে একটা ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল। মাইশা দরজা খুলে আরিয়ানের রুম থেকে চলে গেল।
পরদিন সকালে,
সীমা অফিসে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিল। আজকাল তার আর অফিসে যেতে ভালো লাগেনা। আগে রিয়াদের টানে অফিসে যেতে ইচ্ছে করত সারাদিন ইচ্ছে করতো অফিস শেষ করার পরেও অফিসে আরও কিছুক্ষণ সময় কাটাতে কারন সে রিয়াদের কাছাকাছি থাকতে চাই তো। কিন্তু সেই রিয়াদ নামক মানুষটা যে তার নয় সে এতদিন মরীচিকার পিছনে দৌড়ে ছিল। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে তার চোখ জোড়া ভিজে এলো। সীমা আলতো করে চোখের পানিটা মুছে নিল। হঠাৎ তার ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো রিয়াদের নাম্বার থেকে কল এসেছে। সীমার মনটা এমন ভাবে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙ্গে গেছে যে রিয়াদের নাম্বার দেখেও তার ফোন রিসিভ করতে ইচ্ছে করছিল না। কোন এক সময় এই রিয়াদের নাম্বার থেকে ফোন আসলে সে আকাশ পরিমাণ খুশি হতো এক মুহূর্ত দেরি না করে রিয়াদের ফোন রিসিভ করতো। কিন্তু আজ রিয়াদের ফোনটা রিসিভ করতে তার মন সাঁয় দিচ্ছে না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সীমা রিয়াদের ফোনটা রিসিভ করল।
সিমা ফোন রিসিভ করতে ও প্রান্ত থেকে একজন বলে উঠলো,
-------- আপনি কি মিস সিমা বলছেন।
গলার কন্ঠ টা সীমার অপরিচিত মনে হচ্ছে। সীমা বুঝতে পারল এটা রিয়াদের কন্ঠ নয়। কিন্তু রিয়াদের ফোন অন্য কারো কাছে কি করে গেল। আরো অনেক কথা ভাবছে সীমা।
ওই প্রান্ত থেকে লোকটা হ্যালো হ্যালো বলে যাচ্ছে। লোকটার কথায় সীমার ভাবনার ছেদ ঘটলো। সীমা উত্তর দিয়ে বলল,
-------- জি আমি সীমা বলছি আপনি কে।
-------- আপনি কি রিয়াদ নামে কাউকে চিনেন।
--------- যে উনি আর আমি একই অফিসে জব করি।
-------- তাহলে আর কোন কথা না বলে দ্রুত আপনি সেন্টার মেমোরিয়াল হাসপাতালে চলে আসুন। উনি এক্সিডেন্ট করেছেন।
কথাটা শোনা মাত্র সীমার যেন পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সীমার হাত-পা কাঁপা শুরু করল। সীমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। রিয়াদ সিমা কে ভালো না বাসলে ও সীমা যে তাকে মন প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছে কি করে তার এইরকম এক্সিডেন্টের কথা শুনে নিজেকে শান্ত রাখবে। সীমা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। সীমাকে এইভাবে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে দেখে তার মা কয়েকবার ডাকে পিছন থেকে ডাকলো। কিন্তু সীমা তার মায়ের কোন কথা শুনলো না।
****************
আরিয়ান আজ খুব ফুরফুরে মেজাজ আছে। কারণ তার মনের ভিতর এতদিন যে কথাগুলো পুষে রেখেছিল তার সবটাই সে মাইশা কে বলে দিয়েছে। কিন্তু মাইশার মনে কোন আনন্দ নেই। তার মনের ভেতর দুশ্চিন্তার এক পাহাড়। মাথায় তার অনেক দায়িত্বের বোঝা। এত কিছু নিয়ে কারো পক্ষে আনন্দে থাকাটা সম্ভব নয়। রেহানা বেগম গতকাল রাত থেকে কিছু খাইনি। অনেক চেষ্টা করেও তাকে গতকাল রাত থেকে কিছু খাওয়ানো যায় নি। সে এক জেদ ধরে বসে আছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না আরিয়ার নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টাবে রেহানা বেগম কিছু খাবেন না। আরিয়ান অনেকক্ষণ যাবৎ নাস্তার টেবিলে অপেক্ষা করে থেকে মায়ের রুমের দিকে চলে গেল। আরিয়ান তার মায়ের রুমে এসে দেখল তার বাবা তার মাকে অনেক বোঝাচ্ছে কিন্তু তার মা এক জেদ ধরে এখনো বসে আছে।
আরিয়ান তার মার কাছে এসে তার মায়ের পাশে বসলো। আরিয়ানকে দেখেই রেহানা বেগম অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
-------- কেন এসেছিস তুই আমার রুমে। আমি কে তোর তোর কাছে তো সবকিছুই হলো মাইশা যা না ওর কাছে যা।মায়ের তো কোন দরকার আর তোর জীবনে নেই এখন বড় হয়ে গেছিস না।
আরিয়ান ছোটবেলার মতো মাকে পিছন থেকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে আবেগ মাখা কন্ঠে বলল,
-------- ওমা তুমি এমন করছ কেন বলতো। মাইশা তো বাচ্চা মেয়ে একটা ভুল না হয় করেই ফেলেছে মাফ করে দাও না ওকে। আমি যতদূর জানি মাইশা কেও তো তুমি অনেক ভালোবাসো ছোটবেলা থেকে তো মায়ের আদর দিয়ে ওকে বড় করেছে তাহলে কেন এইভাবে ওর উপর রেগে আছো বলো তো।
রেহানা বেগম অভিমানী স্বরে বলল,
-------- আমার সেই ছোট্ট মাইশা আর আগের মাইশা নেই আরিয়ান।
আরিয়ান খানিকটা অবাক হয়ে তার মাকে জিজ্ঞেস করল,
-------এমন কথা বলছো কেন মা।
------- কারন মাইশা অনেক পাল্টে গেছে। আগে যদি কোনো কারণে মাইশা কে আমি রাগারাগি করতাম যদি ওর সাথে কথা না বলতাম ও নিজে এসে আমার রাগ ভাঙ্গা তো আমাকে জড়িয়ে ধরতো। আমার রাগ ভাঙা না পর্যন্ত ও আমার পিছু ছাড়তো না আমার পিছে পিছে ঘুরতো। আর সেই মেয়ে আমি কয়েক দিন থেকে রাগ করে আছি একবারও আমার রুমে আসার প্রয়োজন পর্যন্ত মনে করেনি।
আরিয়ান তার মায়ের কথাটা কিছুক্ষণ ভাবলো। তার মা অবশ্য ভুল কিছু বলেনি। মাইশা আসলো এমন ছিল না মাইশার ভিতর অনেক পরিবর্তন। হয়তো সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যেতে পারে এই ভেবে নিজের মনকে বৃথা একটা সান্তনা দিয়ে আরিয়ান তার মাকে বলল,
------- মা ও হয়তো সাহস পাচ্ছে না তোমার কাছে আসার তাই হয়তো আসছে না। তুমি আর ওর প্রতি রাগ করে থেকো না। আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে মা নাস্তা দেবে চলো আমার অফিসের লেট হয়ে যাচ্ছে।
আরিয়ান তার মাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ডাইনিং এ নিয়ে গেল।আলিয়া তোর মাকে ডাইনিং এ দেখে দুষ্টামির ছলে হেসে বলল,
------- ওমা তুমি না অনশন করছিলে তোমার অনশন ভঙ্গ হয়ে গেল।
আরিয়ান আলিয়াকে একটা ধমক দিয়ে বলল,
------- আলিয়া তুই কিন্তু দিন দিন খুব দুষ্টু হয়ে যাচ্ছিস।
আলিয়া কিছু বলল না শুধু একটু হাসলো। রেহানা বেগম আড় চোখে মাইশাকে দেখে নিল। মাইশা মাথা নিচু করে বসে আছে। আগে মাইশা এমন ছিল না। তার মামী তার সাথে রাগ করলে নিজে প্লেটটা তার মামীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলতো মামী আমাকে খাইয়ে দাও না খাওয়ানো পর্যন্ত সে খেত না। কিন্তু আজ মাইশা একদম নিশ্চুপ। কোথাও একটা এই মাইশার সাথে আগের মাইশার যেন আকাশ আর পাতাল ব্যবধান। দিন দিন মাইশা কেমন জানি অনেকটা শান্ত হয়ে গেছে। মাইশার মধ্যে আগে যে চাঞ্চল্যতা ছটফটানি ছিল সেটা এখন আর নেই। যে মাইশা আগে এই পুরো বাড়িটা হাসি খুশিতে মাতিয়ে রাখত সে এখন নিজেই যেন হাসতে ভুলে গেছে। এর ভিতরে কোথাও যেন একটা গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে যা কারো চোখে পড়েও যেন পড়ছে না।
চলবে.....
প্রেম আমার (সিজন ২ পর্ব ৮)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
645
Views
13
Likes
6
Comments
4.4
Rating