জীবনের এক সন্ধ্যা বেলা

অডিও মোড

00:00 00:00
গতি:
ভলিউম:
সিডর, মহসিন,আইলা এক এক করে আরো কতো নাম না জানা বন্যা বয়ে গেছে। এখন গ্রামের মানুষগুলো খুব বেশি ভিতু সন্ত্রস্ত হয়ে আছে। সবাই ডানা ভাঙ্গা নীড় হারা পাখির মতো। ঘরপোড়া গরু তো সিঁদুর মেঘ দেখলেই ভয় পায়।
কারো ঘর নেই,কারো আবার ঘর আছে কাট, খড় কুটো নেই।এই বন্যায় কারো মা, কারো মেয়ে কারো আবার স্ত্রী কেড়ে নিয়েছে।সারা গ্রামে দূর্ভিক্ষ আর হাহাকার শুরু হয় গেছে।

সাগর রাতের খাবার খেয়ে পড়তে বসেছে। আজকে অনেক বেশি পড়তে হবে।রাত মাত্র ৭ বাজে গ্রামে নতুন বিদ্যুৎ এসেছে। ছেলে মেয়েরা সবাই পড়ছে সেই শব্দে গ্রাম মুখরিত। বাড়ির বুড়ো মানুষগুলো উঠানে বসে গল্প করছে। হঠাৎ করে চার দিকে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়েছে।কি হলো সবাই আতংকে শিউরে উঠলো।চার দিকে মানুষ দৌড়াদৌড়ি শুরু করছে। শুধু একটা মাত্র শব্দ সবখানে বন্যা বন্যা"পানি বন্যা" শুরু হয়েছে। সব কিছুই ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। বাজার থেকে করিম চাচা বাড়িতে এসে, স্ত্রী মেয়ে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল সাইক্লোন শেল্টারে । সবাই রাস্তা দিয়ে দৌড়ে চলছে .করিম মাস্টারের বাড়িতে দোতলায় পাকা ঘর তাই। কেউ দৌড়ে ছোট বাজারে ইস্কুলের ছাদে উঠেছে। সবাই আতংকে কাঁপতে লাগলো। নিজের জীবন বাঁচাতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো।কেউ তো পরিবার ছেড়ে নিজেকে বাঁচাতে দৌড়ে চলছে।

সাগর ব‌ই বন্ধ করে এক সেকেন্ড নিশ্চুপ হয়ে অনুভব করতে লাগলো। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। মনে হয় জীবনে এখানেই সমাপ্তি হয়ে যাবে।যাই হোক নিজেকে বাঁচাতে হবে। মাকে বলল- মা পানি বন্যা হবে তোমরা কোথায় যাবা না?
মা:- তুই যা,আমরা পরিস্থিতি বুঝে যাবো।দেখি কি হয়।
সাগর দৌড় দিল দরজা দিকে। সাইক্লোন শেল্টারে যেতে সময় লাগবে অনেক ,আর ইস্কুলে যেতে হলেও বিশ মিনিট লাগবে। তাই পাশের বাড়ি করিম মাস্টারের বাড়ির দিকে দৌড় দিল।
একটুখানি যেতেই দেখলো রেজার দাদী ।একা দরজা কাছে,সে অনেক বৃদ্ধ গুজো হয়ে গেছে। চোখে দেখতে পায় না,কানেও শোনে না। দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়ে চিৎকার দিয়ে চেঁচিয়ে বলছে।কেউ আমাকে বাঁচাও, আমাকে একটু সাথে নিয়ে যাও! সবাই নিজেকে বাঁচাতে দৌড়ে চলছে কেউ তার কথা কানে তুললো না। সাগর কষ্ট পেলেও তাকে নিয়ে যেতে চাইলো না। ভাবছে সে হাঁটতে পারে না,অন্ধ মানুষ। তাকে নিয়ে যেতে যেতে যদি পানি এসে আমি ডুবে মরি। তাই তাকে ছেড়ে দৌড়ে চলে গেল।

সাগর করিম মাস্টারের বাড়িতে ঢুকে দেখলো। অনেক মানুষ বাড়ি ভর্তি হয়ে আছে। পুরুষ মানুষ বাহিরে উঠানে দাঁড়িয়ে সব জায়গায় ফোন করে খোঁজ খবর নেয়। মহিলারা ঘরে এবং উপরে মাচায় দোলাতে উঠছে। মাচায় উঠতে কাঠের তৈরি সিয়ারী/থাক দিয়ে অনেক মানুষ উঠতে গিয়ে ভেঙ্গে গেছে। তাই একটা গিঁট ওয়ালা বাঁশ দিয়ে দুই জন পুরুষ নিচ থেকে ধরে উপরে তুলছে।আর উপর থেকে দুই জন পুরুষ হাত ধরে তুলছে। সাগর দেখলো চারটা লুচ্ছা দাঁড়িয়ে সুন্দরী মহিলা এবং মেয়েদের তুলছে। এটাই মনে তাদের স্পর্শ করার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। সাগর মাচায় উঠে সবাই কে দেখলো। সমস্ত বাগানের গোলাপ এখানে এক সাথে আছে। সাগরের চোখ পড়ল মিম এর দিকে, সাথে লামিয়া, রিয়া আরো অনেক মেয়ে।

সাগর ইন্টারের পড়ে মিম টেনে উঠেছে। সাগর ক্লাস নাইনের শেষ দিকে মিম কে দেখে।মিম অনেক সুন্দরী, অনেক বেশি মেধাবী। লম্বা,চোখ টানা টানা ভাসা ভাসা, লম্বা চুল, লম্বা নাক গোলাপের মত ঠোঁট। হাসিটা অনেক বেশি মিষ্টি। সাগর হাসি দেখেই পাগল হয়ে গেল। তখন সাগরের উর্তি বয়স। শৈশব থেকে কৈশোরে পা দেয়া নতুন যুবকের, নতুন আবেগ অনুভূতি কতটা চরম হয় তা বলে বুঝানো যায় না। সাগরের সমস্ত আবেগ, সমস্ত অনুভূতি জুড়ে শুধু মিম জড়িয়ে আছে। সাগরের হৃদয়ে সমস্ত ভালোবাসা মিম কে ঘিরে শুরু এবং শেষ হয়।

সাগর ভাবছে কত দিন তোমাকে দেখার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। আজকে দুইটা বছর তোমাকে দেখে আমার রাত হয়। তোমাকে দেখেই আবার নতুন দিন শুরু হয়।
প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে মিমের বাড়ির চারপাশে ঘুরে একটুখানি দেখার জন্য। আবার দেখার জন্য ইস্কুলের পথে দাঁড়িয়ে থাকে। দেখে ক্লাসে যায় আবার ছুটি হলে মিমের বাড়ির চারপাশে ঘুরে একটুখানি দেখার জন্য। আজ কতটা ভাগ্য তার সেই মেয়েটি সামনে বসে আছে।
যাকে দেখার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে কতো কথা শুনতে হয়েছে।কেউ লুচ্চা,কেউ লম্পট আবার কেউ চরিত্রহীন, খারাপ ছেলে ভেবেছে।আজ সে আমার সামনে। ভাবতেই সাগর আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল।

শুধু তাকিয়ে আছে মিমের দিকে,কত সুন্দর কতটা মিষ্টি, চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল সে। আজকে মন ভরে দেখতে ইচ্ছে করছে।যতো দেখছে দেখার স্বাদ মিটছে না।তার রুপের আগুনে চোখ জ্বলসে যায়।
হৃদয় পুড়ে ছাই হয়ে যায় কিন্তু তার পড়ো তাকে দেখার ইচ্ছা মিটে না। ইচ্ছে করে এভাবেই সারা জীবন তাকিয়ে কাটিয়ে দিতে। যদি সময় এখানেই থমকে যেত। যদি আর কখনো সে আমার সামনে থেকে পালিয়ে না যেত। তাকে দেখে দেখে যদি আমার জীবনটা শেষ হয়ে যেতো।
সে দিন মিমের দিকে তাকিয়ে ছিলাম বলে আমাকে কতটা খারাপ ভাষায় গালি দিল। আজকে কিছু বলছে না,কেউ কিছু বলছে না।

সাগর দেখলো সবাই কান্না করছে। মৃত্যুর ভয়ে সবাই ভিতু হয়ে আছে। মিমের চোখ দিয়ে জল পড়ছে। সাগর কাছে গিয়ে বললো কেউ কান্না করবেন না। সবাই আল্লাহ কে ডাকুন। সাগর একটু দূরে দাঁড়িয়ে মিম কে দেখছে, আর ভাবছে হে বন্যা! তুমি আমাকে ধন্য করেছো। স্বার্থক আমার জীবন, আমি তাকে দেখে দেখে হাসি মুখে জীবন বিলিয়ে দিতে পারি।হে বন্যা তুমি পৃথিবী ধ্বংস করে নাও।সব কিছু তছনছ করে দাও কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মিম কে দেখের সৌভাগ্য দাও। আমি তাকে দেখে দেখে মরতে চাই, আমার শেষ দৃষ্টিতে তাকেই যেন পাই।

মিম ভাবছে- সাগর আমাকে ভালোবাসে। আমি ওর সাথে কতো খারাপ ব্যবহার করেছি। অনেক কষ্ট দিয়েছি, কিন্তু ও তো শুধু নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে গেছে। সারাটা জীবন উপকার করেছে।কিন্তু কখনো তো প্রতিশোধ নিতে আসে নি। অনেক খারাপ কথা বলেছি যদি এখন মারা যাই।ও আমাকে আরো বেশি অভিশাপ দিবে।তার কাছে মাফ চেয়ে নেওয়া উচিত। তাই সাগরের কাছে এসে বললো সাগর তোর সাথে খারাপ আচরণ করেছি।মাফ করে দিস, জানি না এটা হয়তো আমাদের শেষ দিন হতে পারে।

হঠাৎ করে পিছন থেকে সাগর বলে কেউ ডাক ডাক দিল। পিছনে ফিরে দেখল রেজা। ওর প্রতিবেশী ভাই তবে, দুজনেই বন্ধু থেকে কম নয়।
রেজা -নিচে চল? সবাই কলা গাছ কেটে ভেলা তৈরি করছে। তাতে বিশাল দাড়ি বেঁধে রাখছে। সাগর:- দড়ি কেন?
রেজা:- পানি তে যদি সবকিছু তলিয়েনিয়ে যায়। তখন দড়িতে ভেলা থাকলে নিতে পারবে।
সাগর:- রেজার কানের কাছে গিয়ে বললো -মিমকে আমি ভালবাসি।ও এখন কথা বলতে চায়, পড়ে নিচে যাবো।
রেজা:-আমি নিচে যাই তুই আসিস কিন্তু।
সাগর:- ঠিক আছে।

সাগর মিমের দিকে তাকিয়ে আছে মিম সেও তাকিয়ে আছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। সাগর আজকে পৃথিবী সব চেয়ে খুশি মানুষ।তার প্রিয়তমা!আজ তার কাছে। সাগর বলল- আজকে আমার আর কোন কষ্ট নেই। আজকে আমার জীবন ধন্য হয়েছে।
মিম শুধু তাকিয়ে আবার নিচে চোখ সরিয়ে নিল।
সাগর বলল- তোমাকে খুব কাছ থেকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। আজকে মনের স্বাদ মিটিয়ে দেখবো।
যদি বন্যা হতো কতটা ভাল হতো?
মিমের গলা শুকিয়ে আছে বন্যার ভয়ে। এমন কথা শুনে বলল- আপনি কি মানুষ? সবাই কান্না করছে আর আপনি বন্যা চাইছেন?
সাগর:- আমি জানি বন্যা শেষ হলে তুমি আমার থেকে দূরে চলে যাবা। কিন্তু আমি তা চাই না।
আজকে যদি প্রচন্ড বন্যা হয়। ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে হলেও দুজনে কাছে আসবো। তখন আমার জীবনের শেষ আশ্রয় স্থল হবে তুমি। তোমাকে আক্রে ধরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাইছি আমি। তোমার বুকে মাথা রেখে যদি মরণ হতো তবে সেই মরণ আমার স্বার্থক হতো।
মিম:- সাগরের দিকে তাকিয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু ছেড়ে দিয়ে বলল-তুমি আমাকে খুব ভালবাসো তাই না?
সাগর:- খুব বেশি নিজের থেকেও বেশি।
মিম:- তোমার ভালবাসা গ্রহণ করার ভাগ্য আমার হয়নি। আমি একজন কে কথা দিয়ে ফেলেছি।
সাগর আস্তে আস্তে ফ্লোরে বসে পড়লো। একটা হাসি দিয়ে বলল- সব চাওয়া যে পূর্ণ হবে, ভালো বাসলেই যে পেতে হবে এমটা তো কোথাও লেখা নেই।
মিম সাগরের সামনে বসে বলল- তোমার ভালবাসার মতো যদি সুন্দর হতো তোমার ভাগ্য কত‌ই না ভালো হতো।
সাগর - একটা ইচ্ছা পূরণ করবে? তোমার হাতটা একটু ধরতে ইচ্ছা করছে।
মিম:- সম্ভব না কেউ দেখলে সমস্যা।
সাগর একটা হাসি দিয়ে বলল- তোমাকে অনেক বিরক্ত করেছি তাই না?
সমস্যা নাই তোমাকে যতটুকু সময় কাছে পেয়েছি।এই সামান্য সময়ের স্মৃতি নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিব। তুমি কি জানো প্রতিদিন মোনাজাতে তোমাকে চাইতাম। এখন থেকে শুধু একটা কথাই বলবো -তোমার জীবনের সমস্ত কষ্ট আমাকে দিতে আর আমার জীবনের সব টুকু সুখ তোমাকে দিতে।
তুমি ভালো থেকো সারাটা জীবন। তোমার সুখ দুঃখ গুলো আমার জীবনের বসন্ত।

রাত বারোটা বেজে গেছে কোন বন্যা,বৃষ্টি, কিছু হয়নি শুধু মিথ্যা খবর সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ সবাই কে পিটিয়ে পিটিয়ে ঘরে পৌছে দিচ্ছে। এখন সবাই হাসাহাসি করে,আর বলে কে কিভাবে ভয়ে কেঁদেছিলো। গ্রামের কলা গাছ কেটে শেষ।কেউ খাবার মাটির নিচে পুঁতে রেখেছে। সবাই বলে শুকনো বন্যায় যে ভয় পাইছি সিডরে তেমন ভয় হয়নি।
👉ভালো লাগলে ফলো করুন 👈
প্রতি মাসে মাত্র একটি করে গল্প পাবেন।
355 Views
7 Likes
1 Comments
3.8 Rating
Rate this: