সূর্য তার নিজের তেজ কমিয়ে দিয়ে শান্ত হয়ে এসেছে। সূর্য জানান দিচ্ছে সন্ধ্যা হবার সময় হল। গোধূলি লগন ও শুরু হয়ে গেছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই সন্ধা নেমে যাবে। সন্ধ্যার যে অপরূপ দৃশ্য তা সবাইকে মুগ্ধ করে।হালকা মৃদু তাস বইছে।আকাশে মেঘের বিচরণ ঘটছে।হয়তো আকাশের বুক চিরে বৃষ্টি নামতে পারে। মাইশা তার চুলগুলো কাঁধের এক পাশে দিয়ে সন্ধ্যার সেই দৃশ্য ছাদে দাঁড়িয়ে উপভোগ করছে।মাইশার খোলা চুল গুলো খোলা বাতাসে উড়ছে।
আরিয়ান এসে মাইশার পাশে দাঁড়ালো। মাইশা আরিয়ানকে দেখেও না দেখার ভান করল। একটা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। আরিয়ান বুঝতে পারল মাইশা ইচ্ছে করে তাকে ইগনোর করছে।
আরিয়ান মাইশার কাছে গিয়ে মাইশার হাতটা টান দিয়ে তার কাছে এনে বলল,
-------- কিরে এমন ভাব করছিস যেন আমাকে দেখতে পাস নি।
--------- এই সবের মানে কি আরিয়ান ভাইয়াআমার হাত ছাড়ো বলছি।
আরিয়ান মাইশা কে আরো কিছুটা কাছে টেনে নিয়ে বলল,
--------- পারলে ছাড়িয়ে দেখা।
মাইশা আরিয়ানের কাছ থেকে ছাড়ার জন্য মুচরা মুচরি করতে লাগলো। হঠাৎ করেই আরিয়ান তার ঠোঁটটা হালকা করে মাইশার ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিলো। মাইশা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আরিয়ানের দিকে। এই আরিয়ানকে বোঝা বড় দায়। তখন মাইশার সঙ্গে কথাই বলল না আর এখন অন্যরকম এক বিহেভ করছে মাইশার সাথে।
মাইশা আস্তে করে আরিয়ানকে বলল,
-------- কি করছো কি কেউ এসে পড়বে ছাড়ো।
-------- আসলে আসুক আমি কাউকে ভয় পাই নাকি।
-------- এটা তোমার বাড়ি। তাই এখানে তুমি যা খুশি করতে পারো কেউ তোমাকে কেউ কিছু বলবে না কিন্তু আমি যা খুশি তাই করতে পারিনা।
--------- শোন এটা আমার বাড়ি মানে তোর ও বাড়ি বুঝেছিস।
মাইশা কিছু বলতে যাবে তখনই আরিয়ান মাইশার ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে বলল,
--------- চুপ কোন কথা বলিস না তোকে একটু মন ভরে দেখতে দে।
--------- কেন আমাকে এর আগে দেখ নি বুঝি।
--------- এই প্রকৃতির মাঝে খোলা চুলে তোকে যে কতোটা অপরূপ লাগছে জানিস তুই সেটা।
--------- হয়েছে হয়েছে আর ঢং করতে হবে না।
-------- ঢং না মাছরাঙ্গা পাখি। আমার বুকে কান পেতে শোন আমার বুকের হৃদ পিণ্ড টা কি বলছে।
কথাটা বলে আরিয়ান মাইশাকে জড়িয়ে ধরল। মাইশা নিজেকে ছুটানোর জন্য আর পাড়াপাড়ি করছে না। চুপচাপ আরিয়ানের বুকে মাথা দিয়ে রেখেছে। আরিয়ানের বুকে যেন এক রকমের প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছে মাইশা। যে প্রশান্তি মাইশা পৃথিবীর আর কোথাও পায় না।
আরিয়ান মাইশা কে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
--------- কিরে কিছু শুনতে পাচ্ছিস আমার হৃদ পিণ্ড কি বলছে।
--------- হুম
--------- কি বলছে বল তো।
--------- জানি না যাও।
কথাটা বলে মাইশা আরিয়ানকে ধাক্কা মেরে ওর কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে গেল। মাইশার লাজুক মুখের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আরিয়ান। হঠাৎ আকাশে মেঘের ডাক দিয়ে উঠলো। পুরো আকাশটা কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। হঠাৎ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করল।
আরিয়ান আকাশে দিকে তাকালো আর মাইশাকে ডাক দিয়ে বলল,
-------- মাইশা দ্রুত নিচে চল বৃষ্টি আসবে।
--------- আমি এখন যাব না তুমি যাও। আমি বৃষ্টিতে ভিজবো।
--------- বৃষ্টিতে ভিজবি মানে। ঠান্ডা জ্বর হলে তখন।
-------- না কিছু হবে না।
--------- কিছু হবে না মানে! তোর যে ঠান্ডা ধাজ আছে এটা তুই ভুলে গেছিস।
মাইশা কিছুতেই ছাদ থেকে নামতে রাজি হচ্ছে না। সে বৃষ্টিতে ভিজবেই। আরিয়ান আর না পেরে মাইশাকে কোলে তুলে নিল।হঠাৎ ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। মাইশা আরিয়ানের টি-শার্ট খামচে ধরে রেখেছে।দুইজন বৃষ্টিতে ভিজে একদম একাকার। আরিয়ান মাইশাকে কোলে নিয়ে রেখেছে। মাইশার ঠোঁট দিয়ে টুপ টুপ করে পানি পড়ছে। বৃষ্টির পানিতে মাইশার সালোয়ার কামিজটা ভিজে তার শরীরের সঙ্গে একদম এঁটে গেছে। আরিয়ান যেন পাগল হয়ে যাচ্ছে মাইশাকে এই অবস্থায় দেখে। তার ভিতরের পুরুষত্ব যেন জেগে উঠতে চাইছে। আরিয়ান কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না।
আরিয়ান নিজেকে অনেক কষ্টে সামলিয়ে নিয়ে নিজেই নিজেকে বলল,
--------- না আরিয়ান না উল্টাপাল্টা কিছু একদম মাথায় আনবি না। মাইশা তোর,তোর প্রেম আর সারাজীবন তোরই হয়ে থাকবে।
ওরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। মাইশার মনের মধ্যেও ঝড় বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ ধরে শব্দ করে বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। মাইশা কিছুটা কেঁপে উঠল। মাইশা নিজের ভাবনা থেকে বের হল। এইভাবে নিজেকে আরিয়ানের কোলে দেখতে খুব লজ্জা লাগছিল মাইশার। মাইশা এবার হাত পা ছড়াছড়ি করতে লাগলো আরিয়ানের কোল থেকে নামার জন্য।
আরিয়ান বিরক্ত হয়ে মাইশা কে একটা ধমক দিয়ে বলল,
--------- এই সমস্যা কি তোর এইভাবে বাচ্চাদের হাত পা ছোড়া ছুড়ি করছিস কেন। আর একবার যদি হাত পা ছোড়াছড়ি করিস তাহলে ঠাস করে কিছু ফেলে দেবো আর ঠুস করে তোর কোমরটা ভেঙ্গে যাবে। যখন সবাই তোকে কোমর ভাঙ্গা মাইশা বলে ডাকবে। সেটা কি ভালো হবে।
আরিয়ানের কথা শুনে মাইশা ভয় পেয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে আরিয়ানের দিকে। মাইশা হাত ছোড়াছড়ি বন্ধ করে চুপ হয়ে গেল। যদি সত্যি সত্যি আরিয়ান ওকে ফেলে দেয়। তাহলে তো মাইশার এতো সাধের কোমরটা ভেঙ্গে যাবে।
আরিয়ান মাইশা কে কোলে নিয়ে নিচে নেমে গেল।
এদিকে বৃষ্টির জন্য অফিস থেকে বের হতে পারছে না সীমা। অফিসে কিছু কাজ থাকায় দেরি হয়ে গেছে।একে একে সবাই মোটামুটি অফিস থেকে বের হয়ে গেছে। রিয়াদ সব কিছু গোছগাছ করে অফিস থেকে বের হতে যাবে তখনই দেখল সীমা একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। রিয়াদ সীমার কাছে কিছু টা এগিয়ে এগিয়ে গিয়ে সীমা কে জিজ্ঞেস করল,
------ কি হল তুমি না এখনো বাসায় যাওনি।
------ না আসলে কিছু কাজ ছিল সেগুলো করতে করতে লেট হয়ে গেছে।এত বৃষ্টি পড়ছে যে কিছুতেই অফিস থেকে বের হতে পারছি না।
------- আচ্ছা দাঁড়াও আমি দেখছি কোন রিক্সা পাওয়া যায় কি না।
রিয়াদ সীমার পাশে বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু অনেক বৃষ্টি পড়ছে বিধায় কোন রিক্সা ও পাওয়া যাচ্ছে না। সীমা কে একা রেখে রিয়াদ যেতেও পারছে না। শেষে আর কোন উপায় না পেয়ে রিয়াদ একটা রেইনকোট সীমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
------- এই নাও এটা পড়ে নাও।
রিয়াদ ও একটা রেইনকোট পড়ে নিল। তারপর সীমা কে বলল তার বাইকের পিছনে উঠতে। সীমার মনে মোটামুটি যেন লাড্ডু ফুটছে। যাক বৃষ্টির উসিলায় রিয়াদের কিছুটা কাছাকাছি আসতে পারছে সে।
সীমা রিয়াদের বাইকের পিছনে বসলো। রিয়াদ বাইক স্টার্ট দেবে তখনই দেখলো সীমা গুটি হয়ে বসে আছে। রিয়াদ সীমাকে বলল,
------- ভালো করে আমাকে ধরে বস তা না হলে পড়ে যাবে। বৃষ্টিতে এমনিতেই রাস্তা অনেক পিচ্ছিল হয়ে গেছে। পড়ে পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে।
সীমার খুশি আর দেখে কে। রিয়াদ যে কোনদিনও সীমাকে তার এতটা কাছাকাছি আসতে দেবে তা কখনো ভাবেনি সীমা। সীমা বাইকে ভালো করে বসে রিয়াদের কাঁধে এক হাত রাখল আরেক হাত দিয়ে বাইকের পিছনে ধরল।
মাইশা রুমে এসে মাথা মুচছে আর আরিয়ানের কথা ভাবছে। ছাদে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো যেন তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে।মাইশা চোখ বন্ধ করে মুচকি একটা হাসি দিল। হঠাৎ কি জন্য ভেবে মাইশার সেই হাসি মাখা মুখটা মুহুর্তের মধ্যেই মলিন হয়ে গেল। মাইশার চোখের কোনে কিছুটা পানি এসে জমা হলো।
মাইশা তার চোখটা বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
------- মানুষের সব চাওয়া সব স্বপ্ন সবসময় পূরণ হয় না। আমরা এমন কিছু চাওয়া আর এমন কিছু স্বপ্ন দেখে ফেলি যেগুলো আমাদের জীবনে পূরণ হবার নয়। আমার এত কিছু ভাবাটা উচিত নয় আরিয়ানকে নিয়ে কারণ আমি হয়তো বা কিছুদিনের অতিথি মাত্র।
কিছুক্ষণ পর রিয়াদ সীমার বাসার সামনে চলে আসলো। সীমা বাইক থেকে নেমে রিয়াদ কে একটা ধন্যবাদ দিল। রিয়াদ একটু মুচকি হেসে ওখান থেকে চলে গেল। রিয়াদের যাবার পানে তাকিয়ে থেকে সীমা বলল,
------- তোমাকে যদি এইভাবে সবসময় এত কাছ থেকে পেতাম। একবার আমার মনের কথাটা তোমাকে বুঝাতে পারতাম।
কথাগুলো বলে সীমা একটু হেসে ভেতরে চলে গেল।
সাব্বির অফিসে বসে সিসি ক্যামেরা গুলো চেক করছিল। হঠাৎ তার চোখ একটা ফুটেজের দেখে আটকে গেল। দেখলো একটা গাড়ি লেকের কাছে এসে থামলো।গাড়ি থেকে কালো হুড্ডি পরা মুখোশে চেহারা আবৃত করা একজন নামলো। সেই মুহূর্তে কিউ সিসি ক্যামেরা থেকে কিছু একটা ছুড়ে মারলো। সঙ্গে সঙ্গে সিসি ক্যামেরাটা অফ হয়ে গেল। সাব্বির বুঝতে পারল কেউ সিসি ক্যামেরা টাকে কেউ ভারী কিছু একটা ছুড়ে মেরে ভেঙে ফেলেছে। ফুটেজের টাইম আর ডেট টা দেখে সাব্বির বুঝতে পারল ফুটেজ টা যে দিন আফজাল মারা গিয়েছিল সেদিন রাত্রের। তারমানে এই হল কিলার।লেকের পাড়ে আশেপাশে ভালো করে খোঁজ নিলে হয়তো বা কোন না কোন কোন ক্লু এখনো পাওয়া যেতে পারে। এটা একটা সাধারন কোন ঘটনা ভেবে তেমন কোন খোঁজাখুঁজি করা হয়নি।আগামীকালকে সেখানে আবার যেয়ে ভালোভাবে তদন্ত করতে হবে। তবে তার আগে মুরাদের সাথে কথা বলে আফজালের সম্পর্কে কিছু ইনফরমেশন নিতে হবে। আর মুরাদ কে ও একটু ভালোভাবে দেখতে হবে। তার আগে তার মাইশার একটা খবর নেয়া দরকার। বিভিন্ন কাজের চাপে মাইশার কোনো খবর নেয়া হয়নি আর।এই সুযোগে মাইশা কেও তার এক নজর দেখা হয়ে যাবে। আসলে মাইশাকে কেন যেন দেখতে তার খুব ইচ্ছা করছে। এতদিন এত ঝামেলার ভিড়ে মাইশার খবরটা নেয়া হয়ে ওঠে নি। এই সুযোগে মাইশা কে দেখাও হবে আর ওর খবর ও নেয়া হবে।
চলবে......
প্রেম আমার (সিজন ২ পর্ব ৪)
অডিও মোড
00:00
00:00
গতি:
ভলিউম:
608
Views
17
Likes
4
Comments
4.3
Rating